–মেয়ে বড় হয়েছে। রাতে রাতে ঘুম হয় না আমার। বিজয়াকে কলেজ যাবার পথে সেদিন আটকাল না ছেলেরা?
–সে তো মুসলমান মেয়ে হলেও আটকায়। মুসলমান মেয়েরা রেপড হচ্ছে না? তাদের কিডনাপ করা হয় না?
—তা হয়। তবু।
কিরণময়ী বুঝতে পারতেন সুধাময় কিছুতে সায় দেবেন না। বাপের ভিটে না থাক, দেশের মাটি তো আছে পায়ের নীচে। এই তাঁর সান্ত্বনা। মায়ার অবশ্য কলকাতা যাবার কোনও আগ্রহ ছিল ন কখনও। কলকাতা বেড়াতে গিয়েছে সে একবার, মাসির বাড়িতে। ভাল লাগেনি। মাসতুতো বোনগুলো কেমন যেন নাকউঁচু স্বভাবের। তাকে গল্প আড্ডায় কিছুতে নেয় না। সারাদিন একলা বসে সে বাড়ির কথা ভাবত। পুজোর ছুটিতে যাওয়া, অথচ ছুটি শেষ হবার আগেই সে মেসোমশাইকে ধরল—দেশে ফিরব।
মাসি বললেন—সে কি রে, দিদি তো তোকে দশ দিনের জন্য পাঠালেন।
—বাড়ির জন্য মন কাঁদছে।
মায়ার চোখে জল চলে এসেছিল বলতে গিয়ে। কলকাতার পুজোয় অত হৈ হুল্লোড় তার ভালও লাগেনি। সারা শহর ঝকমক করছিল, তবু কী যে এক লাগছিল তার। তা না হলে দশ দিনের জায়গায় সাত দিনের মাথায় সে চলে আসে! কিরণময়ীর ইচ্ছে ছিল ভূভাল লাগলে মায়া থেকে যাবে ওখানে।
সুধাময়ের শিয়রের কাছে বসে মায়া জাহাঙ্গীরের কথা ভাবে। পারুলের বাড়ি থেকে ফোনে ওর সঙ্গে কথাও হয়েছে দু’বার। জাহাঙ্গীরের কণ্ঠে আগের সেই আবেগ ছিল না। তার চাচা আমেরিকা থাকেন। ওখানে যাবার কথা লিখেছেন তিনি, সে চলে যাবার চেষ্টা করছে। শুনে মায়া প্রায় আর্তনাদ করে উঠল—তুমি চলে যাবে?
—বাহ, আমেরিকার মত জায়গা। যাব না?
—গিয়ে কি করবে?
—আপাতত অড জব করতে হবে। সিটিজেনশিপ পেয়ে যাব একসময়।
—ফিরিবে না দেশে?
–দেশে ফিরে কী করব। এই বাজে দেশে মানুষ থাকতে পারে?
—কবে যাবে ঠিক করেছ?
–সামনের মাসেই। চাচা তাড়া দিচ্ছেন ৷ ভাবছেন এখানে রাজনীতিতে জড়িয়ে আমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছি।
–ও।
জাহাজীর একবারও বলেনি সে চলে গেলে মায়ার কী হবে–মায়া কি তার সঙ্গে যাবে, নাকি দেশে বসে তার জন্য অপেক্ষা করবে! আমেরিকার স্বপ্ন তার দীর্ঘ চার বছরের প্রেম, রেস্তোরাঁয় ক্রিসেন্ট লেকের ধারে টি এস সি-তে বসে বিয়ের কথা বলা সব একেবারে ভুলিয়ে দিল? প্রাচুর্য আর জৌলুসের মোহ মানুষের এত যে জলজ্যান্ত এক মায়া, তাকে ছেড়ে চলে যাবে জাহাঙ্গীর! সুধাময়ের শিয়রের কাছে বসে মায়ার বারবারই জাহাঙ্গীরের কথা মনে পড়ে। ভুলতে চায় সে, পারে না। সুধাময়ের এই নিথর পড়ে থাকার কষ্টও মায়া একই সঙ্গে ধারণ করছে। কিরণময়ীর কষ্ট বোঝা যায় না। তিনি হঠাৎ হঠাৎ মধ্যরাতে কেঁদে ওঠেন। কেন কাঁদেন, কার জন্য কাঁদেন কিছুই বলেন না। সারাদিন নিঃশব্দে কাজ করেন; রান্না করা, স্বামীর মল মুত্র পরিষ্কার করা সবই নিঃশব্দে।
কিরণময়ী সিঁদুর পরেন না। লোহা শাঁখা কিছুই না। সুধাময় খুলে রাখতে বলেছিলেন একাত্তরে। পঁচাত্তরের পর কিরুণময়ী নিজেই খুলে রাখলেন। পঁচাত্তরের পর সুধাময় নিজেও ধুতি ছেড়েছেন। সাদা লংক্ৰন্থ কিনে তারু খলিফার দোকানে পাজামার মাপ দিয়ে এলেন যেদিন, বাড়ি ফিরে কিরণময়ীকে বলেছিলেন—দেখ তো কিরণ, গা-টা গরম হচ্ছে কি না। জ্বর-জ্বর লাগছে।
কিরণময়ী কথা বলেননি। তিনি জানতেন। সুধাময়ের মন খারাপ হলেই গায়ে জ্বর-জ্বর লাগে।
মায়ার অবাক লাগে, সুরঞ্জন। এ সময়ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকছে। সারাদিন ঘরে গুম হয়ে পড়ে থাকে, খাবে কী খাবে না কিছুই বলে না, বাবা তার আছেন কী মরে গেছেন সে খোঁজও কি নেবার প্রয়োজন নেই তার? ঘরে তার বন্ধুরা আসছে, আড্ডা দিচ্ছে, সে বাইরে থেকে ঘর তালা দিয়ে চলে যাচ্ছে, কখন যাচ্ছে, ফিরবে। কখন কিছুই বলছে না-কিছুই কি দায়িত্ব নেই তার? তার কাছে কেউ তো টাকা পয়সা চাইছে না, ছেলে হিসেবে খোঁজ-খবরটুকু করা, ডাক্তার ডাকা, ওষুধ কেনা, পাশে এসে একটু বসলেও তো মনে জোর পাওয়া যায়। অন্তত সুধাময় তো দাবি করতে পারুেন ছেলের কাছে যে তার বাম হাতখানা একবার এসে স্পর্শ করুক সুরঞ্জন। ডান হাত না হয় অচল, বাম হাতে এখনও তো অনুভবের শক্তি আছে।
হরিপদ ডাক্তারের ওষুধে সুধাময় অনেকটা সুস্থ হচ্ছেন। জড়ানো কথা কমে আসছে। তবে হাত পায়ের চেতন ফেরেনি। ডাক্তার বলেছেন-নিয়মিত ব্যায়াম করলে শিগরি ভাল হয়ে যাকেন। মায়ার তো আর কোনও কাজ নেই। টিউশনিতে যেতে হচ্ছে না। মিনতি নামের এক মেয়ে পড়ত, ওর মা বলে দিয়েছে আর পড়াতে হবে না, ওরা ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছে।
-ইন্ডিয়া কেন? মায়া জিজ্ঞেস করেছিল।
ওর মা বিষণ্ণ হেসেছিল শুধু কিছু বলেনি।
মিনতি ভিখারুন্নেসা স্কুলে পড়ত। একদিন সে মিনতিকে অঙ্ক করাতে গিয়ে লক্ষ করল মিনতি পেন্সিল নাড়ছে আর বলছে আলহামদুলিল্লাহির রাহমানির রাহিম, আর রাহমানির রাহিম।
মায়া অবাক হয়ে বলেছিল—এসব কি বলছি তুমি?
মিনতি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিয়েছিল—আমাদের এসেম্বলিতে সূরা পড়া হয়।
–তাই নাকি? এসেম্বলিতে সূরা পড়ে ভিখারুন্নেসায়?
—দুটো সূরা পড়া হয়। তারপর জাতীয় সঙ্গীত।
—সূরা যখন পড়ে, কী কর তুমি?
— আমিও পড়ি। মাথায় ওড়না দিই।
—স্কুলে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টানদের জন্য কোনও প্রেয়ার নেই?
