সাতকানিয়ার নলুয়ার বুড়া কালীবাড়ি, জগরিয়ার সার্বজনীন কালীবাড়ি ও দুগামণ্ডপ, দক্ষিণ কাঞ্চনার চণ্ডীমণ্ডপ, মগধেশ্বরী মন্দির, দক্ষিণ চরতির মধ্যপাড়া কালীবাড়ি, মধ্যনলুয়ার সার্বজনীন কালীবাড়ি, চরতির মন্দির, দক্ষিণ চরতির বাণাকপাড়া রূপ কালীবাড়ি ও ধরমন্দির, পশ্চিম মাটিয়াডাঙার জ্বালাকুমারী মন্দির, বাদোনা ডেপুটি হাটের কৃষ্ণহরি মন্দির, বাঙ্গালিয়া দূরনিগড়ের দুরনিগড় মহাবোধি বিহার, বোয়ালখালি কফুল্লখিলের ঐতিহ্যবাহী মিলনমন্দির ও কৃষ্ণ মন্দির, আবুরুদণ্ডীর জগদানন্দ মিশন, পশ্চিম শাকপুরার সার্বজনীন মগধেশ্বরী মন্দির, মধ্য শাকপুরার মোহিনীবাবুর আশ্রম, ধোেরল কালাইয়া হাটের কালীমন্দির, কখুল্লখিলের সার্বজনীন জগদ্ধাত্রী মন্দির, কোক দণ্ডীয় ঋষিধাম অধিপতি, কণুৱলি শাশ্বত চৌধুরীর বিগ্ৰহ মন্দির, মগধেশ্বরী, ধনপােতা, সেবাখেলা, পটিয়ার সার্বজনীন কালীবাড়ি, সাতকানিয়ার নলুয়ার দ্বিজেন্দ্র দাশ, হরিমন্দির ও জগন্নাথ বাড়ি, সাতকানিয়া দক্ষিণ চরতির দক্ষিণপাড়া সার্বজনীন কালীবাড়ি, দক্ষিণ ব্ৰাহ্মণডাঙার সাৰ্বজনীন কালীবাড়ি ভেঙে, লুট করে আগুন জ্বলিয়ে দিয়েছে।
হাটহাজারি উপজেলার মিজাপুর জগন্নাথ আশ্রমে একত্ৰিশে অক্টোবর রাত এগারেটার দিকে একশ সাম্প্রদায়িক লোক চড়াও হয়। আশ্রমের মূর্তিগুলো ওরা আছড়ে ভেঙে ফেলে। জগন্নাথ ঠাকুরের সব অলঙ্কার লুটপাট করে নিয়ে যায়, পরদিন একশ লোক আশ্রমের টিনের ওপর সাদা পাউডার ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরদিন যখন ওরা আসে, পুলিশ দাঁড়িয়েছিল, মিছিল আসতে দেখে পুলিশ সরে যায়। পরে নিরাপত্তার জন্য পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পুলিশ জ্বদের সীমাবদ্ধতার কথা জানায়। সে রাতেই চল্লিশ পায়তাল্লিশ জন লোক অস্ত্রশস্ত্ৰ নিয়ে মেখল গ্রামে নিরস্ত্র গ্রামবাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা প্রথম এসে কমান্ডো কায়দায় ককটেল ফাটিয়ে হিন্দুদের ভয় ধরিয়ে দেয়। লোকজন ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেলে ঘরের দরজা জানোলা ভেঙে লুটপাট শুরু করে, ঘরের মূর্তিগুলো ভেঙে চুরমার করে দেয়। পার্বতী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাস্টার মদীননাথের মন্দির এবং মগধেশ্বরী বাড়ির সবগুলো মূর্তি ভেঙে ফেলে।
চন্দনাইশ উপজেলার ধাইরহাট হরিমন্দিরের মূর্তি ভেঙে ফেলে দেয়, জগন্নাথের রথ ভেঙে ফেলে। বড় কল ইউনিয়নের পাঠানদণ্ডীগ্রামে মাতৃ মন্দির এবং রাধাগোবিন্দ মন্দির আক্রমণ করে। বোয়ালখালির চারশ লোক রাত বারোটায় কথুরখিল ইউনিয়নের মিলনমন্দির, হিমাংশু চৌধুরী, পরেশ বিশ্বাস, ভূপাল চৌধুরী, ফণীন্দ্ৰ চৌধুরী, অনুকুল চৌধুরীর বাড়ির মন্দির ভাঙচুর করে। বাঁশখালি উপজেলার প্রাচীন ঋষিধাম আশ্রম ধ্বংস করে দেয়। প্রতিটি ঘর পুড়িয়ে দেয়, বইপত্রে আগুন ধরিয়ে দেয়।
সীতাকুণ্ডের জগন্নাথ আশ্রমে মুসলমান মৌলবাদীরা লাঠি দা খন্তা নিয়ে হামলা চালায় একত্ৰিশে অক্টোবর রাতে। ১২০৮ সালে স্থাপিত বটতলা শ্ৰী শ্ৰী কালীমন্দিরে ঢুকে কালী মুর্তির মাথা ভেঙে ফেলে দিয়ে রূপার মুকুট আর বিগ্রহের সোনার অলঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। চরশরৎ একটি হিন্দুপ্রধান গ্রাম। দুশ তিনশ লোক পয়লা নভেম্বর রাত দশটায় মিছিল করে এসে পুরো গ্ৰাম লুট করে নেয়। যা নিতে পারেনি, পুড়িয়ে দিয়ে গেছে, স্তৃপ ভূপ ছাই ভস্মের বাড়িঘর আর আধাপোড়া নিবাক বৃক্ষরাজি। ওরা যাওয়ার সময় বলে গেছে দশ তারিখের মধ্যে চলে না গেলে সবাইকে মেরে লাশ বানিয়ে দেবে। গ্রাম থেকে যে গরু ছাগল বের হচ্ছিল না সেগুলোকে কুপিয়ে মারা হয়েছে। আগুন দেওয়া হয়েছে ধানের গোলায়। প্রায় ৪০০০ হিন্দু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পঁচাত্তর ভাগ ঘরবাড়ি পুড়ে গেছে, একজন মরেছে, অসংখ্য গরু ছাগল আগুনে পুড়ে গেছে। অনেক নারী ধর্ষিতা হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা। সাতবাড়িয়া গ্রামে রাত সোয়া নটায় প্রায় দুশ লোক লাঠি দা কিরিস লোহার রড নিয়ে জয়রাম মন্দির আক্রমণ করে মন্দিরের প্রতিটি বিগ্ৰহ ভেঙে চুৰ্ণ করে দেয়। হামলার খবর পেয়ে আশেপাশের লোক প্রাণভয়ে চারদিকে ভয়ে পালিয়ে যায়, সে রাতে প্রতিটি পরিবার কাটিয়েছে জঙ্গলে, নয়। ধানক্ষেতে। তারা প্রতিটি বাড়ি লুট করে। সাতবাড়িয়া সার্বজনীন দুৰ্গর্বিাড়ির কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। খেজুরিয়া গ্রামের মন্দির আর বাড়িঘরেও আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। চাষী পরিবারগুলো সর্বস্বাস্ত এখন। শৈলেন্দ্ৰ কুমারের স্ত্রীর গায়ে আগুন লাগিয়েছে, আগুনে ঝলসে গেছে তার শরীর। শিব মন্দিরে যখন ভক্তরা প্রার্থনারত ছিল, তখন কয়েকজন লোক এসে অশ্রাব্য গালাগাল করে, মূর্তি ও আসন ভেঙে দিয়ে তাতে প্রস্রাব করে চলে যায়।
সুরঞ্জনের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ওদের প্রস্রাব যেন সুরঞ্জনের গায়ে এসে লাগে। সে চটি বইটি ছুড়ে ফেলে দেয়।
৪গ.
হরিপদ ডাক্তার শিখিয়ে দিয়েছেন হাত পায়ের শক্তি ফিরিয়ে আনতে গেলে কী করে এক্সারসাইজ করতে হবে। মায়া কিরুণাময়ী দুজনই দুবেলা সুধাময়ের হাত পায়ের এক্সারসাইজ করাচ্ছে। সময় করে ওষুধ খাওয়াচ্ছে। মায়ার সেই চঞ্চল স্বভাব হঠাৎ চুপসে গেছে। বাবাকে দেখেছে সে প্রাণবান পুরুষ। আর এখন নিথর শুয়ে আছেন মানুষটি। মায়া মায়া’ বলে যখন জড়ানো কণ্ঠে ডাকেন, বুক ভেঙে যায় মায়ার। অসহায় বোবা দুটো চোেখ কী যেন বলতে চায়। বাবা তাকে মানুষ হতে বলতেন, শুদ্ধ মানুষ। নিজে সৎ ও সাহসী মানুষ ছিলেন। কিরণময়ী মাঝে মধ্যেই বলতেন, মেয়ে বড় হয়েছে, বিয়ে দিয়ে দিই। সুধাময় রুখে উঠতেন শুনে। বলতেন-’পড়াশুনা করবে, চাকরি-বাকরি করবে, তারপর যদি বিয়ে করতে মন চায়, করবে।’ কিরণময়ী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন–নাকি কলকাতায় ওর মামার কাছে পাঠিয়ে দেব! অঞ্জলি, নীলিমা, স্বাভা, শিবানী, মায়ার বয়সী মেয়েগুলো কলকাতায় পড়াশুনো করতে চলে গেছে। ‘ সুখময় বলতেন—’তাতে কী। এখানে কি পড়ালেখা করবার নিয়ম নেই। স্কুল কলেজ উড়ে গেছে?’
