হায়দার চলে গেছে, যাক। সুরঞ্জন যাবে না। কেন সে মানব-বন্ধনে যাবে? মানব-বন্ধন তার বিচ্ছিন্নতা বোধ থেকে মুক্তি দেবে তাঁকে? বিশ্বাস হয় না। সুরঞ্জনের আজকাল এরকম হচ্ছে, সব কিছুতে সে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। এই হায়দার, অনেক দিনের বন্ধু তার, দিনের পর দিন যুক্তি বুদ্ধি বিবেকের চর্চা করেছে তারা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানিয়েছে দেশের মানুষকে, সভ্যতাকে রক্ষণ কক্সবার জন্য, মানবিক মূল্যবোধকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য তারা কতগুলো বছর পার করেছে। আজ সুরঞ্জনের মনে হচ্ছে কোনও প্রয়োজন ছিল লা। এসবের, তার চেয়ে পেট ভরে মদ খেত, ভি সি আর-এ ছবি দেখাত, ব্লু ফিল্ম দেখাত, ইভ টিজিং-এ মেতে থাকত, অথবা বিয়ে-থা করে প্রচণ্ড বৈষয়িক লোক হয়ে যেত, পিঁয়াজ রসূনের হিসেব কষত, মাছের শরীর টিপে টিপে ভদ্রলোকের মত মাছ কিনে আনত, তাতেই বোধহয় ভাল হত, এত কষ্ট-টষ্ট হত না। সিগারেট ধরায় সুরঞ্জন। টেবিল থেকে চুটি একটি বই টেনে চোখ বুলোয়। নব্বইয়ের সাম্প্রদায়িক সম্রাসের খবর আছে। বইটি কোনওদিন খুলেও দেখেনি সে। আগ্রহ বোধ করেনি। আঙ্গ গভীর মনোযোগ আসে সুরঞ্জনের। তিরিশে অক্টোবর রাত একটা তখন। হঠাত মিছিলের শব্দ শুনে পঞ্চাননধাম আশ্রমের মানুষ জেগে ওঠে। মিছিলকারীরা গেট আর দেওয়াল ভেঙে ঢুকে পড়ে, ঢুকেই গালাগাল করল আশ্রমবাসীদের, কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় পাশের টিনের ছাউনি ঘরে। আশ্রমের লোক ভয়ে এদিক ওদিক পালিয়ে যায়। এক এক করে সব বিগ্ৰহ মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলে। সাধুবাবার সমাধিমন্দিরের চুড়া ভেঙে ফেলে, ধর্মের বইয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আশ্রমের মধ্যেই ছিল সংস্কৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের আলমারি ভেঙে সব বইপত্রে আগুন দেয় এবং টাকা পয়সা সব লুট করে নিয়ে যায়। সদরঘাট কালীবাড়িতে তিরিশে অক্টোবর রাত বারোটায় প্রায় আড়াই হাজার লোক ইট ছুঁড়তে ছুঁড়তে মন্দির প্রধান ফটক ভেঙে সশস্ত্র ভেতরে ঢুকে পড়ে। মূল মন্দিরের ভেক্তর ঢুকে তারা বিগ্রহ ভাঙে, ভারি লোহার রড, খন্তা দিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। চট্টেশ্বরী মায়ের মন্দিরে উঠবার সিঁড়ির দুপাশের দোকান এবং বাড়িঘর ভেঙে লুট করে আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করে দেয়। গোলপাহাড় শ্মশানের সব জিনিস লুট করে নিয়ে যায় রাত সাড়ে এগারোটায়, শ্মশানে আগুন লাগিয়ে দেয়। শ্মশান কালীমূর্তি ধ্বংস হয়ে যায়। তিরিশে অক্টোবর রাতে ভয়েস অব আমেরিকার খবরের পর সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী নগ্ন হামলা চালায় কৈবল্যধাম আশ্রমে। আশ্রমের প্রতিটি দেবপ্রতিকৃতি ভেঙে, প্রতিটি ঘরের জিনিসপত্রে আগুন লাগিয়ে দেয়। আশ্রমের লোক ভয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। তাদের নাগাল পেলেই মার দেওয়া হয়। কয়েক হাজার লোক মন্দিরের ওপর কয়েকবার আক্রমণ চালায়। লোহার রদ, খন্তা দিয়ে মন্দিরের কাঠামো নষ্ট করে ফেলে। হরগৌরী মন্দিরের ভেতর মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলে, টাকা পয়সা, মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। ধর্মগ্রন্থগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হয় আগুনে। মন্দিরের আশেপাশের প্রতিটা এলাকা, মালিপাড়ার প্রতিটি পরিবার আকাশের নীচে দিনযাপন করতে বাধ্য হয়, তাদের কিছুই ছিল না সম্বল। চট্টেশ্বরী রোড়ের কৃষ্ণ গোপালজীর মন্দিরে সশস্ত্ৰ লোকেরা আক্রমণ করে রাত নটার দিকে। তারা দুশ ভরি রূপা, পঁচিশ ভরি স্বৰ্ণলঙ্কার সহ বহু মূল্যবান জিনিস লুট করে বিগ্রহ সহ মূল ঘরটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। মন্দিরে ঢুকবার পথে তোরণের ওপর গাড়ীমূর্তিটি ভেঙে ফেলে তাদের শাবলের আঘাতে মন্দিরের পাইনগাছগুলো ভুলুষ্ঠিত হয়। রাস উপলক্ষে বানানো মুর্তিগুলোও রেহাই পায়নি। বদ্দরহাট ইলিয়াস কলোনির প্রতিটি হিন্দু ঘরে লুটতরাজ, ভাঙচুর, নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবার ওপর অকথ্য শারীরিক নির্যাতন চালায়। সিলিংফ্যানের শাখাগুলো ঘটিকা করে অকেজো করে দেয়।
চট্টগ্রাম শহরের কলেজ রোডের দশভুজা সুগৰ্বিাড়ি, কোরবনিগঞ্জের বরদেশ্বরী কালীমন্দির, চকবাজারের পরমহংস মহাত্মা নরসিংহ মন্দির, উত্তর চান্দগাঁয় বর্ষা কালীবাড়ি, দুর্গা কালীবাড়ি, সদরঘাটের সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, দেওয়ানহাটের দেওয়ানেশ্বরী কালীবাড়ি, কাটঘরের উত্তর পতেংগা শ্মশান কালীবাড়ি, পূর্ব মাদারবাড়ির মগধেশ্বরী বিগ্ৰহ, রক্ষাকালী মন্দির, মোগলটুলির মিলন পরিষদ মন্দির, টাইগার পাসের দুর্গ মন্দির,শিব বাড়ি ও হরিমন্দির, সদরঘাটের রাজ-রাজেশ্বরী ঠাকুরবাড়ি, জালালাবাদের কালীমন্দির, দুৰ্গাবাড়ি, কুল গাঁওর নাপিতপাড়া শ্মশান মন্দির, কাতালগঞ্জের করুণাময়ী কালীমন্দির, চান্দগাঁওর নাথপাড়া জয়কালী মন্দির, নাজিরপাড়ার দয়াময়ী কালীবাড়ি ও মগধেশ্বরী কালীমন্দির, পশ্চিম বাকলিয়ার কালীবাড়ি, কাতালগঞ্জের ব্ৰহ্মময়ী কালীবাড়ি, পশ্চিম বাকলিয়ার বড় বাজার শ্ৰীকৃষ্ণ মন্দির, হিমাংশু দাস, সতীন্দ্র দাশ, রামমােহন দাশ, চণ্ডীচরণ দাশের শিবমন্দির, মনোমোহন দাশের কৃষ্ণমন্দির, নন্দন কাননের তুলসীধাম মন্দির, বন্দর এলাকার দক্ষিণ হালিশহর মন্দির, পাঁচলাইশের গোলপাহাড় মহাশ্মশান ও কালীবাড়ি, আমান আলী রোডের জেলেপাড়া কালীমন্দির, মেডিকেল কলেজ রোডের আনন্দময়ী কালীমন্দিরে লুটপাট, ভাঙচুর আর আগুন ধরানো হয়।
