হায়দার বলে—’চল চল, তৈরি হও। মানব-বন্ধনে যাব। মানব-বন্ধন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণে জাতীয় ঐক্য ও একাত্তরের ঘাতক যুদ্ধাপরাধীসহ সকল সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আঞ্চলিক সৌহার্দ ও বিশ্ব শান্তির লক্ষে বিশ্ব মানবতার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে জাতীয় সমন্বয় কমিটির ডাকে সারাদেশে মানক-বন্ধন।
—তাতে আমার কী? সুরঞ্জন প্রশ্ন করে।
–তোমার কি মানে? তোমার কিছুই না? হায়দার অবাক হয়ে প্রশ্ন করে।
সুরঞ্জন শান্ত, স্থির। বলে–না!
হায়দার এত বিস্মিত হয়। সে দাঁড়িয়েছিল। বসে পড়ে। আবার একটি সিগারেট ধরায় সে। বলে—এক কাপ চা খাওয়াতে পারো?
সুরঞ্জন বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে বলে—ঘরে চিনি নেই।
বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে জাতীয় সংসদ ভবন পর্যন্ত মানব-বন্ধনের রুট। সকাল এগারোটা থেকে দুপুর একটা অবধি এই ক্লটে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। হায়দার মানব-বন্ধন সম্পর্কে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, সুরঞ্জন থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করে–কাল আওয়ামি লিগের মিটিং-এ হাসিনা কি বলল?
–শান্তি সমাবেশে।
—হ্যাঁ।
–সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখবার জন্য প্রত্যেক মহল্লায় ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে শান্তি ব্রিগেড গড়ে তুলতে হবে।
—এতে কি হিন্দুরা অর্থাৎ আমরা রক্ষা পাবো? মানে প্ৰাণে বাঁচব?
হায়দার উত্তর না দিয়ে তাকায় সুরঞ্জনের দিকে। শেভ না করা মুখ। চুল উড়োথুড়ো। হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টায় সে। জিজ্ঞেস করে–মায়া কোথায়?
–ও জাহান্নামে গেছে। সুরঞ্জনের মুখে জাহান্নাম শব্দটি হায়দারকে চমকিত করে। সে হোসে বলে-জাহান্নামটা কিরকম শুনি?
—সাপ কামড়ায়, বিচ্ছু ধরে, আগুন জ্বলে শরীরে, পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তবুও মরে না।
—বাহ্ তুমি তো আমার চেয়ে বেশি খবর রাখো জাহান্নামের।
—রাখতেই হয়। আগুন আমাদেরই পোড়ায় কি না।
–বাড়ি এত নিস্তব্ধ কেন? মেসো মাসিমা কোথায়? অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিয়েছ?
–না।
—আচ্ছা সুরঞ্জন, একটা ব্যাপার লক্ষ করেছ গোলাম আজমের বিচারের দাবিকে জামাতিরা বাবরি মসজিদের ছুতোয় ভিন্ন খাতে নিয়ে যাচ্ছে?
–তা হয়ত নিচ্ছে। কিন্তু গোলাম আজমকে নিয়েও বিশ্বাস কর তুমি যেভাবে ফিল করছ, আমি সেভাবে করছি না। তার জেল ফাঁসি হলে আমার কী আর না হলেই বা আমার কী?
—তুমি খুব বদলে যাচ্ছ।
—হায়দার, খালেদা জিয়াও বললেন বাবরি মসজিদ পুননির্মাণ করতে হবে। আচ্ছা! তিনি কেন মন্দির পুনর্নির্মাণের কথা বলছেন না?
—তুমি কি মন্দির নির্মাণ চাও?
–খুব ভাল করেই জানো মন্দির মসজিদ কিছুই চাই না আমি। কিন্তু নির্মাণের কথা যখন উঠছেই, তখন কেবল মসজিদ নির্মাণ কেন?
হায়দার আরেকটি সিগারেট ধরায়। সে ভেবে পায় না মানক বন্ধনের দিন সুরঞ্জন এক একা ঘরে বসে থাকবে কেন। গণআদালত যেদিন হল, এ বছরের ছাবিবশে মার্চ, সুরঞ্জনই হায়দারকে ঘুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে। গণসমাবেশের দিন ঝড়বৃষ্টি ছিল, হায়দার একটি কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়েছিল, হাই তুলে বলেছিল-’আজি বরং না। যাই, ঘরে বসে মুড়ি ভাজা খাই চল।’ সুরঞ্জন রাজি হয়নি, উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিল—’যেতে তোমাকে হবেই। এক্ষুণি তৈরি হও। আমরাই যদি পিছিয়ে যাই তবে উপায় কী হবে? ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ওরা বেরিয়েছিল। সেই সুরঞ্জন কি না। আজ বলছে তার এই সব সভা-সমিতি ভাল লাগে না। মানব-বন্ধন-স্টন্ধন সব ফাঁকি মনে হয় তার।
হায়দার সকাল নটা থেকে এগারোটা অবধি বসে থেকেও সুরঞ্জনকে মানব-বন্ধনে নিতে পারে না।
৪খ.
পারুলের বাড়ি থেকে মায়াকে নিয়ে এসেছেন কিরণময়ী। এসেই মায়া অক্ষম, আচল, অকল, অকর বাবার বুকের ওপর পড়ে হাউমাউ করে কাঁদছে। কান্নার শব্দ শুনলে বড় রাগ ধরে সুরঞ্জনের। চোখের জল ফেলে জগতে কিছু হয়? তার চেয়ে চিকিৎসা করা জরুরি। হরিপদ ডাক্তারের লেখা ওষুধ সুরঞ্জন কিনেছে মোটে তিন দিনের ডোজ। কিরণময়ীর আলমারি খুললে। এরপর আর কত বেরোবে? আদৌ বেরোবে কি না কে জানে!
সে নিজেও কোনও চাকরি বাকরি করল না। আসলে পরের ‘গোলামি করা ধাতে সইবে না তার। হায়দারের সঙ্গে পুরনো ব্যবসায় সে আবার জড়াবে কি না ভাবতে ভাবতে সুরঞ্জনের বড় ক্ষিদে পায়। কিন্তু কাকে সে এই অসময়ে ক্ষিদের কথা বলবো? মায়া কিরশময়ী কেউ তো এ ঘরে আসছে না। সে বেকার বলে, অকৰ্মণ্য বলে তাকে কেউ গোণায় নিচ্ছে না। বাড়িতে কি রান্না হচ্ছে নাকি হচ্ছে না, এসবের খবর নিতে তার ইচ্ছে করে না। সেও আজ সুধাময়ের ঘরের দিকে যায়নি। সুরঞ্জনের ঘরের দরজা আজ বাইরে থেকে খোলা, বন্ধুবান্ধব এলে বাইরের দরজা দিয়েই সোজা তার ঘরে ঢেকে। আজ অন্দরের দরজা সে ভেজিয়ে রেখেছে, তাই কি কেউ টোকা দিচ্ছে না ঘরে, ভাবছে বন্ধুবান্ধব নিয়ে গভীর আড্ডায় মগ্ন সে! আর সুরঞ্জন এত আশাই বা করে কেন? কি করেছে সে এই সংসারের জন্য? কেবল বাইরে বাইরে ঘুরেছে বন্ধুবান্ধব নিয়ে, বাড়ির সবার সঙ্গে যে কোনও কিছু নিয়ে চিৎকার করেছে নয়। উদাসীন থেকেছে। কেবল আন্দোলনে ঝাঁপিয়েছে। পার্টির যে কোনও নির্দেশ বশংবাদ ভূত্যের মত পালন করেছে। গভীর রাতে বাড়ি ফিরে মার্কস লেনিনের বই মুখস্থ করেছে। কী লাভ হয়েছে। এতে তার? তার পরিবারের?
