–আচ্ছা হায়দার, সুরঞ্জন তার বিছানায় আধশোয়া হয়ে প্রশ্ন করে–তোমাদের রাষ্ট্রের বা সংসদের কি অধিকার আছে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করবার?
হায়দার চেয়ারে বসে টেবিলে পা তুলে দিয়ে সুরঞ্জনের লাল মলাটের বইগুলোর পাতা ওল্টাচ্ছিল, শুনে ঠা ঠা করে হেসে ওঠে। বলে–তোমাদের রাষ্ট্রের মানে? রাষ্ট্র কি তোমারও নয়?
সুরঞ্জন ঠোঁট চেপে হাসে। সে ইচ্ছে করেই আজ ‘তোমাদের’ শব্দটি হায়দারকে উপহার দিয়েছে। সে হেসেই বলে–আমি কিছু প্রশ্ন করব, প্রশ্নগুলোর জবাব তোমার কাছে চাইছি।
হায়দার সোজা হয়ে বসে বলে—তোমার প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে–না। অর্থাৎ রাষ্ট্রের কোনও অধিকার নেই বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করবার।
সুরঞ্জন সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে প্রশ্ন করে–রাষ্ট্রের বা সংসদের কি অধিকার আছে কোনও ধর্মকে অন্য ধর্মের চেয়ে প্রাধান্য বা বিশেষ আনুকুল্য দেখাবার?
হায়দার সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দেয়–না।
সুরঞ্জন তৃতীয় প্রশ্ন করে—রাষ্ট্রের বা সংসদের কি অধিকার আছে পক্ষপাতিত্বের?
হায়দার মাথা নাড়ে।
—সংসদের কি অধিকার আছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধানে বর্ণিত অন্যতম মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পরিবর্তনের?
হায়দার মন দিয়ে কথা কটি শোনে। বলে–নিশ্চয়ই না।
সুরঞ্জন আবার প্রশ্ন করে—দেশের সার্বভৌমত্ব সকল মানুষের সমান অধিকারের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। সংবিধান সংশোধনের নামে সেই-ভিত্তিমূলেই কি কুঠারাঘাত করা হচ্ছে না?
হায়দার এবার চোখ ছোট করে তাকায় সুরঞ্জনের দিকে। ও ঠাট্টা করছে না তো! এসব পুরনো প্রশ্ন ও আবার নতুন করে টানছে কেন।
সুরঞ্জন তার ষষ্ঠ প্রশ্ন করে–রাষ্ট্ৰীয় ধর্ম ইসলাম ঘোষণার মাধ্যমে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্ৰীয় আনুকুল্য বা স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত করা হয় না কি?
হায়দার কপাল কুঁচকে বলে—হয়। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সব জানা সুরঞ্জনের, হায়দারেরও। সুরঞ্জনও জানে হায়দার আর সে এসবের উত্তরের ব্যাপারে একমত। তবু প্রশ্ন করবার অর্থ কি এই যে, হায়দার ভাবে, সুরঞ্জন হায়দারকে একটি বিশেষ সময়ে প্রশ্ন করে পরীক্ষা করছে হায়দার ভেতরে ভেতরে সামান্যও সাম্প্রদায়িক কি না, তাই অষ্টম সংশোধনীর প্রসঙ্গ ওঠায় সে এই প্রশ্নগুলো করে।
সুরঞ্জন তার সিগারেটের শেষ অংশটুকু এসট্রেতে চেপে বলে-আমার শেষ প্রশ্ন ব্রিটিশ ভারতে ভারতবর্ষ থেকে আলাদা হয়ে ভিন্ন রাষ্ট্র সৃষ্টির কারণে প্রবর্তিত দ্বিজাতিতত্ত্বের জটিল আবর্তে বাংলাদেশকে আবার জড়িয়ে ফেলার এ অপচেষ্টা কেন এবং কাদের স্বার্থে?
হায়দার এবার কোনও উত্তর না দিয়ে একটি সিগারেট ধরায়। ধোঁয়া ছেড়ে বলে-জিন্নাহ নিজেও কিন্তু দ্বিজাতিতত্ত্বকে রাষ্ট্ৰীয় কাঠামো হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন ‘আজ থেকে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, বীেন্ধ রাষ্ট্ৰীয় জীবনে নিজের নিজের ধর্ম পরিচয়ে পরিচিত থাকবে না। তারা সকলেই শুধু জাতি ধর্ম নির্বিশেষে এক জাতি পাকিস্তানের নাগরিক পাকিস্তানি এবং তারা শুধু পাকিস্তানি হিসেবেই পরিচিত হবে। ‘
সুরঞ্জন আধশোয়া থেকে সোজা হয়ে বসে বলে–পাকিস্তানই বোধহয় ভাল ছিল, কি বল?
উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে যায় হায়দার। বলে–আসলে পাকিস্তান ভাল ছিল না মোটেও, পাকিস্তানে তোমাদের আশা করবার কিছু ছিল না। বাংলাদেশ হবার পর তোমরা ভেবেছ এই দেশে তোমাদের সবরকম অধিকার থাকবে, এ হচ্ছে সেকুলার রাষ্ট্র, কিন্তু এই দেশ যখন তোমাদের স্বপ্ন পূরণে বাধা হল, তখন বুকে তোমাদের লাগল বেশি।
সুরঞ্জন জোরে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে বলে—শেষ পর্যন্ত তুমিও বেশ তোমাদের আশা তোমাদের স্বপ্ন-টল্প বলে গেলে গেলে? এই তোমরা কারা? হিন্দুরা তো? তুমি আমাকেও হিন্দুর দলে ফেললে? এতকাল নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাস করে এই লাভ হল আমার?
সুরঞ্জন ঘর জুড়ে অস্থির পায়চারি করে। ভারতে মৃতের সংখ্যা সাড়ে ছশ ছাড়িয়ে গেছে। পুলিশ আটজন মৌলবাদী নেতাকে গ্রেফতার করেছে। এদের মধ্যে বি জে পি-র সভাপতি মুকুলী মনোহর যোশী। আর এল কে আদভানিও রয়েছেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদে সারা ভারতে বন্ধ পালিত হয়। বোম্বে, রাঁচি, কণাটক, মহারাষ্ট্রে দাঙ্গা হচ্ছে, মানুষ মরছে। উগ্ৰ হিন্দু মৌলবাদীদের প্রতি ঘূণীয় সুরঞ্জন হাত মুষ্টিবদ্ধ করে। তার যদি শক্তি থাকত, জগতের সব মৌলবাদীকে সে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করত। এ দেশের সাম্প্রদায়িক দলটি মুখে বলছে ‘বাবরি মসজিদ ধ্বংসের জন্য ভারত সরকার দায়ী। ভারত সরকারের এই দোষের জন্য বাংলাদেশের হিন্দুরা দায়ী নয়। বাংলাদেশের হিন্দু ও মন্দিরের বিরুদ্ধে আমাদের কোনও ক্ষোভ নেই। ইসলামিক চেতনায় উদ্ধৃদ্ধ হয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্ৰীতি রক্ষা করতে হবে।’ সাম্প্রদায়িক দলটির কক্তব্য রেডিও টেলিভিশনে, সংবাদপত্রে প্রচার হচ্ছে। কিন্তু মুখে এ কথা বললেও সারাদেশে হরতালের দিন মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদ করবার নামে যে তাণ্ডব, যে সন্ত্রাস চালিয়েছে তা না দেখলে বিশ্বাস হবার নয়। প্রতিবাদের ছুতোয় একাত্তরের ঘাতকের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অফিস এমনকি কমিউনিস্ট পাটির অফিসও ভাঙচুর করছে আগুন লাগাচ্ছে, কেন? জামাতে ইসলামির একটি প্রতিনিধি দল বি জে পি-র নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছে। কঁী কথা হয়েছে তাদের? কী আলোচনা, কী ষড়যন্ত্র সুরঞ্জন তা অনুমান করে। পুরো উপমহাদেশে ধর্মের নামে যে দাঙ্গা শুরু হয়েছে, সংখ্যালঘুদের ওপর যে নৃশংস নির্যাতন, সুরঞ্জন নিজে সংখ্যালঘু হয়ে টের পায় এই নৃশংসতা। কত ভয়াবহ। বসনিয়া হারজেগোভেনিয়ার ঘটনার জন্য যেমন বাংলাদেশের কোনও খ্রিস্টান নাগরিক দায়ী নয় তেমনি ভারতের কোনও দুর্ঘটনার জন্য বাংলাদেশের হিন্দু নাগরিক দায়ী নয়। এ কথা সুরঞ্জন কাকে বোঝাবে!
