রাত বেশি হয়ে গেলে, সুরঞ্জন সদর দরজায় ডাকাডাকি না করে বাইরে থেকে অলা দিয়ে যাওয়া নিজের ঘরটিতে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই পাশের ঘর থেকে ভগবান ভগবান বলে করুণ একটি ক্ৰন্দন শোনে সুরঞ্জন। বাড়িতে কোনও হিন্দু অতিথি বা আল্পীয় এসেছে কিনা একবার ভাবে সে। হতেও পারে। এরকম ভেবেই সে যখন সুধাময়ের ঘরে ঢুকতে যাবে, দেখে সে অবাক হয়, কিরণময়ী ঘরের কোণে একটি জলচৌকিতে মাটির এক মূর্তি নিয়ে বসেছেন। মূর্তিটির ব্ল্যামনে গলায় আঁচল পেঁচিয়ে উবু হয়ে ‘ভগবান ভগৱােন বলে ৰুদ্রিছেন। এরকম দৃশ্য এই বাড়িতে দেখা যায় না। অদ্ভুত অচেনা একটি দৃশ্য সুরঞ্জনকে এত স্তম্ভিত করে, সে কিছুক্ষণ বুঝে পায় না তার কী করা উচিত। সে কি মুর্তিটিকে আছাড় মেরে ভেঙে ফেলবে, নাকি কিরণময়ীকে নতমস্তক সে নিজে হাতে টেনে সরিয়ে আনবে। নতমস্তক দেখিলে তার গা ঘিনঘিন করে।
কাছে এসে কিরুণাময়ীর দু বাহু ধরে দাঁড় করায়। বলে–হয়েছে কি তোমার। মূর্তি নিয়ে বসেছ কেন? মূর্তি তোমাকে বাঁচাবে?
কিরুণাময়ী ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন। বলেন—তোর বাবার হাত পা অবশ হয়ে গেছে। কথা জড়িয়ে আসছে।
সঙ্গে সঙ্গে সুধাময়ের দিকে চোখ পড়ে তার। শুয়ে আছেন। বিড়বিড় করে কথা বলছেন। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না। কী বলছেন। বাবার গা ঘেঁষে বসে সে ডান হাতটি নগ্নড়ে, হাতে কোনও চেতন নেই, শক্তি নেই। বুকের ঝোপে কুড়োলের কোপ পড়ে সুরঞ্জনের। তার ঠাকুরুদ্রার ঠিক এরকম শরীরের একদিক অবশ হয়ে গিয়েছিল, ডাক্তার বলেছিলেন-ষ্ট্রেক! মুড়ির মত ওষুধ খেতে হত শুয়ে শুয়ে। আর ফ্রিািজওথেরাপিস্ট এসে হাত পায়ের এক্সক্লসাইজ কন্নতেন। বোঝা চোখে একবার কিরণময়ীর দিকে একবার সূরঞ্জনের দিকে তাকান সুধাময়।
আত্মীয়স্বজনও ধারে কাছে কেউ নেই। কার কাছে যাবে সে? ঘনিষ্ঠ কোনও আত্মীয়াই অবশ্য নেই তাদের। এক এক করে সবাই দেশ ছেড়েছে। খুব একা, অসচ্ছল, অসহায় বোধ করে সুরঞ্জন। ছেলে হিসেবে এখন সব দায়িত্ব তার কাঁধেই বর্তাবে। সংসারের অপদাৰ্থ ছেলে সে। আজও তার ঘুরে ঘুরে জীবন কাটে। কোনও চাকরিতে সে স্থায়ী হয়নি। ব্যবসাও করতে চেয়েছিল, সম্ভব হয়নি। সুধাময় অসুস্থ পড়ে থাকলে বাড়ির চুলো বন্ধ হবে, বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হরে সবাইকে।
—কামাল-টামাল কেউ আসেনি? সুরঞ্জন জিজ্ঞেস করে।
—না। কিরণময়ী মাথা নাড়েন।
কেউ একবার খোঁজ নিতে আসেনি। সুরঞ্জন কেমন আছে। অথচ শহরে ঘুরে কতজনের খবৰ নিয়ে এল সে ৷ সকলে ভাল আছে, কেবল সে ছাড়া। এত দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা আর কোনও সংসারে বোধহয় নেই। সুধাময়ের অচেতন হাতটি চেপে ধরে সুরঞ্জনের বড় মায় হয়। এই বিরুদ্ধ-জগতে তিনি কি ইচ্ছে করেই অচল হয়ে গেলেন কিনা কে জানে।
–মায়া ফেরেনি? হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় সুরঞ্জন।
–না।
—কোন ফেরেনি সে? আচমকা চিৎকার করে ওঠে সুরঞ্জন। কিরণময়ীও অবাক হন নম্র স্বভাবের ছেলেটি কখনও এমন মাথা গরম করে কথা বলে না। আজ হঠাৎ চেঁসিয়ে কথা বলছে কোন! মায়া যে পাক্রিলের ব্রাড়ি গিয়েছে। এ এমন কোনও অন্যায় ঘটনা নয়, বরং এ অনেকটা নিশ্চিম্ভের। হিন্দু বাড়ি লুট করতে এলে মায়া ছাড়া আর কোনও সম্পদ নেই তো ঘরে। মেয়েদের তো মানুষ সোনাদোনর মত সম্পদই মনে করে।
সুরঞ্জন সারাঘর জুড়ে অস্থির হাঁটে আর বলে–মুসলমানদের এত বিশ্বাস কেন ওর? ক’দিন বাঁচাবে ওরা?
কিরণময়ী বুঝে পান না। সুধাময় অসুস্থ, এখন ডাক্তার ডাকতে হবে। এই মুহুর্তে মায়া কেন মুসলমানের বাড়ি গেল, এ নিয়ে রাগারগি করছে কেন ছেলে?
সুরঞ্জন বিভূবিভু করে-ডাক্তার ডাকতে হবে, চিকিৎসার খরচাটা কোথায় পাবে, শুনি? পাড়ার দুটো-পিচ্চি ছেলে ভয় দেখিয়েছিল, সেই ভয়ে দশ লাখ টাকার বাড়ি দু লাখ টাকায় বিক্রি করে এলে, এখন ভিক্ষুকের মত বাঁচতে লজ্জা করে না।
–কেবল কি ছেলে-ছোকরাদের ভয়ে, বাড়ি নিয়ে মামলার ঝামেলাও তো কম ছিল না। কিরণময়ী উত্তর দেন।
বারান্দায় একটি চেয়ার ছিল, সুরঞ্জন সেটিকে লাথি মেরে সরিয়ে দেয়।
—আর মেয়ে গেছে মুসলমানকে রিয়ে করতে। ভেবেছে মুসলমানরা তাকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে। মেয়ে বড়লোক হতে চায়।
বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় সে। পাড়ায় দুজন ডাক্তার আছেন। হরিপদ সরকার টিকাটুলির মোড়ে, আর দু বাড়ি পরে আছেন। আমজাদ হোসেন। কাকে ডাকবে সে? সুরঞ্জিল এলোমেলো হাঁটতে থাকে। মায়া বাড়ি ফেরেনি বলে এই যে কেঁচালো সে, সেকি মায়া ফেরেনি বলে, নাকি মুসলমানদের ওপর মায়ার নির্ভরতা দেখে? সুরঞ্জন কি অল্প অল্প কমুনীল হয়ে উঠছে? নিজেকে সন্দেহ হয় তার। সে হেঁটে টিকাটুলির মোড়ের দিকে যায়।
লজ্জা (০৪) হায়দার এসেছে সুরঞ্জনের বাড়িতে
৪ক.
হায়দার এসেছে সুরঞ্জনের বাড়িতে। কেমন আছে জানতে নয়, স্রেফ আড্ডা দিতে। হায়দার আওয়ামি লিগ করে। একসময় সুরঞ্জন তার সঙ্গে ছোটখাটো বাণিজ্য করতে সেমেছিল, পরে উন্নতির সম্ভাবনা নেই বলে বাদ দিতে হয়েছে পরিকল্পনাটি। হায়দারের প্রিয় বিষয় রাজনীতি। সুরঞ্জনেরও বিষয় ছিল এটি, আজকাল অবশ্য রাজনীতি প্রসঙ্গ সে একেবারেই পছন্দ করে না। এরশাদ কি করেছিল, খালেদা কি করছে, হাসিনা কি করবে: এসব চিন্তায় মাথা নষ্ট না করে চুপচাপ শুয়ে থাকাই ঢের ভাল। হায়দার এক-একই কথা বলে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নিয়ে সে লম্বা একটি বক্তৃতা দেয়।
