—সুরঞ্জন।
—ও তো ঢাকার বাইরে গেছে।
—কবে? কোথায়? সুরঞ্জন নিজেই তার কণ্ঠস্বরে আবেগ বা আকুলতা টের পেয়ে সামান্য লজা পায়।
—সিলেট।
–কবে ফিরবে জানেন কিছু?
—না।
সিলেটে কি অফিসের কাজে গেছে রত্না নাকি বেড়াতে, নাকি পালিয়েছে? নাকি আদৌ সিলেট যায়নি, বলা হচ্ছে সিলেট। কিন্তু সুরঞ্জন নাম শুনে, যেহেতু এটি ‘হিন্দু নাম’, লুকোবার তো কিছু নেই—এরকম ভাবতে ভাবতে সুরঞ্জন আজিমপুরের রাস্তায় হাঁটতে থাকে। এখানে কেউ তাকে হিন্দু বলে চিনতে পারছে না। টুপি মাথার পথচারী, গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উত্তপ্ত যুবকেরা, রাস্তার টোকাই কিশোরেরা কেউ যে তাকে চিনতে পারছে না। এ বেশ মজার ব্যাপার বটে। যদি ওরা চিনতে পারে, যদি ওদের ইচ্ছে করে চ্যাংদোলা করে কবরস্থানে ফেলে আসবে তাকে, সুরঞ্জনের কি একার শক্তি হবে নিজেকে বাঁচায়! তার বুকের ভেতর ঢিপিটিপ শব্দটি আবার শুরু হয়। হাঁটতে হাঁটতে দেখে সে ঘািমছে। পরনে কোনও গরম জামা নেই তার, পাতলা একটি শার্ট, শার্টের ভেতর সূচের মত হাওয়া ঢুকছে, অথচ তার কপালে জমছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। হাঁটতে হাঁটতে পলাশি পৌঁছে যায় সুরঞ্জন। পলাশি যখন এসেছেই, একবার নির্মলেন্দু গুণের খবর নেওয়া যায়। ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির ফোর্থ ক্লাস এমপ্লয়িদের জন্য কলোনি আছে পলাশিতে। কলোনির মালির ঘরটি ভাড়া নিয়ে থাকেন নির্মলেন্দু গুণ। সত্যভাষী এই মানুষটির প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা সুরঞ্জনের। দরজায় টোকা পড়লেই পাল্লা হাট করে খুলে দেয় দশ-বারো বছরের একটি মেয়ে। নির্মলেন্দু গুণ বিছানায় পা তুলে বসে মন দিয়ে টেলিভিশন দেখছিলেন। সুরঞ্জনকে দেখেই সুর করে বলে উঠলেন—‘এস এস এস আমার ঘরে এস, আমার ঘরে…।‘
—টিভিতে দেখার কি আছে?
—বিজ্ঞাপন দেখি। সানলাইট ব্যাটারি, জিয়া সিল্ক শাড়ি, পেপসি জেল টুথপেস্ট-এর বিজ্ঞাপন। হামদ নাত দেখি। কোরানের বাণী দেখি।
সুরঞ্জন হেসে ওঠে। বলে—সারাদিন এই করেই কাটে আপনার? বাইরে বের-টের হননি নিশ্চয়?
—আমার বাড়িতে চার বছরের এক মুসলমান ছেলে থাকে। ওর ভরসায় তো বেঁচে আছি। কাল অসীমের বাড়ি গেলাম, ও আগে আগে গেল, আমি পেছন পেছন।
সুরঞ্জন হেসে ওঠে আবার। বলে—এই যে না দেখে দরজা খুলে দিলেন। যদি অন্য কেউ হত?
গুণ হেসে বলেন–কাল রাত দুটোর সময় ফুটপাতে দাঁড়িয়ে কিছু ছেলে মিছিল করবার প্ল্যান করছিল, হিন্দুদের গাল দিয়ে কী কী শ্লোগান দেওয়া যায়, আলোচনা চলছিল। হঠাৎ হাঁক দিলাম, ‘কে ওখানে, গেলি?’ ওরা সরে গেল। আর আমার চুল দাড়ি দেখে অনেকে তো ভাবে আমি মুসলমান, মৌলভি।
—কবিতা লেখেন না?
—না। ওসব লিখে কি হবে। ছেড়ে দিয়েছি।
–রাতে নাকি আজিমপুর বাজারে জুয়ো খেলেন?
–হ্যাঁ। সময় কাটাই। তবে ক’দিন তো যাচ্ছি না।
–কেন?
–বিছানা থেকেই নামি না, ভয়ে। মনে হয় নামলেই বুঝি ওরা ধরে ফেলবে।
—টিভিতে কিছু বলছে, মন্দির ভাঙা-টাঙা কিছু দেখাচ্ছে?
—আরে না। টিভি দেখলে মনে হবে এ দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ দেশে দাঙ্গা-টাঙ্গা কিছু ঘটছে না। যা কিছু ঘটছে ভারতে।
—সেদিন একজন বলল, ভারতে এ পর্যন্ত চার হাজার দাঙ্গা হয়েছে। তবু তো ভারতের মুসলমান দেশ ত্যাগ করছে না। কিন্তু এখানকার হিন্দুদের এক পা থাকে বাংলাদেশে, আরেক পা ভারতে। অৰ্থাৎ ভারতের মুসলমানরা লড়াই করছে, আর বাংলাদেশের হিন্দুরা পালাচ্ছে।
গুণ গভীর হয়ে বলেন-ওখানকার মুসলমানরা লড়াই করতেই পারে। ভারত সেকুলার রাষ্ট্র। আর এখানে ফান্ডামেন্টালিস্টরা ক্ষমতায়। এখানে আবার লড়াই কিসের। এখানে হিন্দুরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের কি লড়াই করবার জোর থাকে?
—এসব নিয়ে কিছু লেখেন না কেন?
—লিখতে তো ইচ্ছে করেই। লিখলে আবার ভারতের দালাল বলে গাল দেবে। কত কিছু লিখতে ইচ্ছে করে, ইচ্ছে করেই লিখি না। কী হবে লিখে!
গুণ বোধহীন চোখে তাকিয়ে থাকেন টেলিভিশন নামের খেলনা বাক্সটির দিকে। গীতা চা রেখে যায় টেবিলে। সুরঞ্জনের খেতে ইচ্ছে করে না। গুণদার ভেতরের যন্ত্রণা তাকেও স্পর্শ করে।
হঠাৎ হেসে ওঠেন গুণ, বলেন—তুমি যে অন্যের খোঁজ-খবর নিচ্ছ, তোমার নিজের নিরাপত্তা আছে তো?
—আচ্ছা গুণদা, জুয়ো খেলে কি জেতেন কখনও?
- না।
- –তাহলে খেলেন কেন?
—না খেললে ওরা মা বাপ তুলে গাল দেয়, তাই খেলতে হয়।
শুনে হো হো করে হেসে ওঠে সুরঞ্জন। গুণও হাসেন। চমৎকার রসিকতা জানেন মানুষটি। আমেরিকার লাস ভেগাসের ক্যাসিনোয় বসে তিনি জুয়ো খেলতে পারেন, আবার পলাশির বস্তিতে বসে মশার কামড়ও খেতে পারেন। কিছুতে আপত্তি নেই, বিরক্তি নেই তাঁর। বারো বাই বারো ফুটের একটি ঘরে দিব্যি তিনি তুচ্ছ আমোদ আহ্রদে কাটিয়ে দিচ্ছেন। এত অমল আনন্দে তিনি ভেসে থাকেন কী করে, সুরঞ্জন ভাবে। আসলেই কি আনন্দ নাকি বুকের ভেতরে তিনিও গোপনে গোপনে দুঃখ পোষেন। কিছুই করবার নেই বলে হেসে পার করেন দুঃসহ সময়।
সুরঞ্জন উঠে পড়ে। তার নিজের ভেতরেও দুঃখবোধটা বেড়ে উঠছে। দুঃখ কি সংক্রামক কিছু? সে হেঁটে হেঁটে টিকাটুলির দিকে যেতে থাকে। রিক্সা নেবে না। পাঁচটি টাকা আছে পকেটে। পলাশির মোড় থেকে সিগারেট কেনে। বাংলা ফাইভ চাইলে দোকানিটি সুরঞ্জনের মুখের দিকে অবাক তাকায়। ওর তোকানো দেখে বুকের মধ্যে সেই টিপচিপ শব্দটি হয়। লোকটি কি টের পাচ্ছে সে হিন্দু ছেলে, লোকটি কি জানে ব্যবরি মসজিদ ভেঙেছে বলে ঐখন যে কোনও হিন্দুকেই ইচ্ছে করলে পেটানো যায়? সিগারেট কিনে দ্রুত্ব সরে যায় সুরঞ্জন। তার এমন হচ্ছে কেন? সে সিগারেটটি দোকানে না ধরিয়েই চলে এসেছে। আগুন চাইতে গেলে যদি বুঝে ফেলে সে হিন্দু? হিন্দু মুসলমান পরিচয় তো আর গায়ে লেখা থাকে না। তবু তার সন্দেহ হয় তার হাঁটায়, ভাষায়, চোখের চাহনিতেও বোধহয় ধরে ফেলবার কিছু আছে। টিকাটুলির মোড়ে আসতেই একটি কুকুর ঘেউ করে ওঠে। চমকে ওঠে। সে। হঠাৎ পেছনে শোনো একপাল ছেলের ‘ধর ধর’ আওয়াজ। শুনে সে আর পেছন ফেরে না। উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়োয়। গা ঘামতে থাকে তার। শার্টের বোতাম খুলে যায়, তবু দৌড় দৌড়। অনেকদূর দৌড়ে এসে সে পেছনে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। তবে কি সে মিছিমিছি দৌড়োলো। শব্দটি তার উদ্দেশ্যে ছিল না? নাকি এ তার অডিটরি হ্যালুশিনেশন!
