সুরঞ্জন শোনে এবং নিজের নিলিপ্তি দেখে সে নিজেই অবাক হয়। এই খবর শুনে তার ক্ষোভে ফেটে পড়বার কথা। আজ মনে হচ্ছে এই পতাকা পুড়ে গেলে তার কিছু যায় আসে না। এই পতাকা তার নয়। সুরঞ্জনের এমন হচ্ছে কেন? এমন হচ্ছে বলে সে নিজেকে ধিক্কার দেয়, নিজেকে বড় ক্ষুদ্র মনে হয়, বড় নীচ, বড় স্বার্থপর, তবু তার নির্লিপ্তি কাটে না। পতাকা পুড়েছে বলে তার ভেতর যে ক্রোধ হওয়া উচিত ছিল, তার কিছুই হয় না।
পুলক সুরঞ্জনের কাছে এসে বসে। বলে—আজ আর যেও না। এখানেই থেকে যাও। বাইরে বেরোলে কখন কী বিপদ ঘটে বলা যায় না। এ সময় আমাদের কারও রাস্তায় বেরোনোটা ঠিক নয়।
গতকাল লুৎফর তাকে এ ধরনের একটি উপদেশ দিয়েছিল। সুরঞ্জন অনুভব করে পুলকের কণ্ঠের আন্তরিকতা আর লুৎফরের কণ্ঠের সূক্ষ্ম অহঙ্কার বা ঔদ্ধত্য।
নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে—দেশে বোধহয় আর থাকতে পারব না। আজ হয়ত কিছু হচ্ছে না, কাল হবে, পরশু হবে। কী ভীষণ অনিশ্চিত জীবন আমাদের। এর চেয়ে নিশ্চিত নিরাপদ দরিদ্র জীবন অনেক ভাল।
পুলকের প্রস্তাবে সুরঞ্জন রাজি প্রায় হয়েই যেত, কিন্তু সুধাময় এবং কিরণময়ীর কথা মনে পড়ায়, ওঁরা দুশ্চিন্তা করবেন ভেবে সুরঞ্জন উঠে যায়। বলে—যা হয় হবে। মুসলমানের হাতে না হয় শহীদ হলাম। কেওয়ারিশ লাশ পড়ে থাকবে জাতীয় ফুল শাপলার নীচে। লোকে বলবে ও কিছু না অ্যাকসিডেন্ট। কী বল? সুরঞ্জন হোসে ওঠে। পুলক আর নীলার মুখে হাসি খেলে না।
রাস্তায় নেমে একটি ক্লিক্সা পেয়ে যায় সুরঞ্জন, মাত্র আটটা বাজে, তার বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না। পুলক তার কলেজ জীবনের বন্ধু। বিয়ে করে চমৎকার সংসার সাজিয়েছে, তারই হল না কিছু বয়স তো অনেক হল, রত্না নামের এক মেয়ের সঙ্গে মাস দুই হল পরিচয় হয়েছে। সুরঞ্জনের হঠাৎ হঠাৎ ইচ্ছে হয় বিয়ে করে সংসারী হতে। পারভিনের বিয়ে হয়ে যাবার পর সে তো ভেবেইছিল সন্ন্যাসব্যাপনের কথা। তবু রত্না কেমন যেন এলোমেলো করে দিল তার ছন্নছাড়া জীবন। এখন বড় গুছিয়ে উঠতে ইচ্ছে করে, এখন স্থির হতে ইচ্ছে করে কোথাও। রত্নাকে অবশ্য এখনও বলা হয়নি ‘তোমাকে এই যে এত ভাল লাগছে আমার, তুমি বোঝা সে কথা?’
রত্নার সঙ্গে প্রথম আলাপের কয়েকদিন পর রত্না বলেছিল–এখন করছেন কি?
—কিছু না। সুরঞ্জন ঠোঁট উল্টে বলেছিল।
—চাকরি বাকরি ব্যবসা বাণিজ্য কিছু না?
–না।
–রাজনীতি করতেন, সেটা?
–ছেড়েছি।
—খুব ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন জানতাম।
–ওসব আর ভাল লাগে না।
–কি ভাল লাগে?
–ঘুরে বেড়াতে। মানুষ দেখতে।
–গাছপালা, নদী উদী দেখতে ভাল লাগে না?
—লাগে। তবে সবচেয়ে ভাল লাগে মানুষ। মানুষের ভেতর যে রহস্যময়তা আছে তার জট খুলতে আমার ভাল লাগে।
–কবিতা-টবিতা লেখেন নাকি?
—আরে না। তবে প্রচুর কবি বন্ধু আছে।
—মদ-টদ খান?
–মাঝে মধ্যে।
—সিগারেট তো বেশ ফোঁকেন।
–হ্যাঁ, তা ফুঁকি। পয়সা-টয়সা তেমন পাই না।
—সিগারেট ইজ ইনজুরিয়াস টু হেলথ, তা জানেন তো?
—জানি। করার কিছু নেই।
—বিয়ে করেননি কেন?
—কেউ পছন্দ করেনি তাই।
–কেউ না?
—একজন করেছিল। সে রিস্ক নেয়নি আলটিমেটালি।
–কেন?
—সে মুসলমান ছিল, আর আমাকে তো বলা হয় হিন্দু। হিন্দুর সঙ্গে বিয়ে, ওকে তো আর হিন্দু হতে হত না। আমাকেই আবদুস সাকের নাম-টাম রাখতে হত।
রত্না হেসেছিল শুনে। বলেছিল–বিয়ে না করাই ভাল, ক’দিনের মাত্র জীবন। বন্ধনহীন কাটিয়ে দেওয়াই তো ভাল।
—তাই বুঝি আপনিও ওপথ মাড়াচ্ছেন না।
—ঠিক তাই।
—ঐ অবশ্য একদিক থেকে ভালই।
—ঐকই সিদ্ধান্ত হলে আপনার আমার বন্ধুত্ব জামবে ভাল।
—বন্ধুত্বের খুব বড় অর্থকরি আমি। দু-একটা সিদ্ধান্ত মিললেই বন্ধু হওয়া যায় নাকি!
—আপনার বন্ধু হতে গেলে বুঝি খুব সাধনা করতে হবে?
সূরঞ্জন জোরে হেসে উঠে বলেছিল—আমার কি এত সৌভাগ্য হবে নাকি?
–আত্মবিশ্বাস খুব কম বুঝি আপনার?
–না সে কথা না। নিজেকে বিশ্বাস আছে। অন্যকে বিশ্বাস নেই।
—আমাকে বিশ্বাস করে দেখুন তো।
সূরঞ্জনের সেদিন সারাদিন মন ভাল ছিল। আজ আবার রত্নার কথা ভাবতে ইচ্ছে করছে তার, সম্ভবত মন ভাল করবার জন্য। ইদানীং সে তাই করে, কিছুতে মন খারাপ হলে রত্নাকে স্মরণ করে। রত্না আছে কেমন? একবার যাবে নাকি আজিমপুরে। গিয়ে জিজ্ঞেস করবে–কেমন আছেন রত্না মিত্ৰ?’ প্রত্না কি সামান্য অপ্রস্তুত হবে তাকে দেখে? সুরঞ্জন স্থির করতে পারে না তার কি করা উচিত। সাম্প্রদায়িক সম্রাসের কারণে এক ধরনের হিন্দু পুনর্মিলনী হচ্ছে, তা সে অনুমান করে। আর রত্না নিশ্চয় অবাক হবে না, ভাববে। এ সময় হিন্দুরা হিন্দুদের খোঁজ নিচ্ছে, দুঃসময়ে যখন পাশেই দাঁড়াচ্ছে সবাই, তখন, হঠাৎ, কোনও নিমন্ত্রণ ছাড়াই সুরঞ্জন নিশ্চয়ই দাঁড়াতে পারে রত্নার সামনে।
রিক্সাকে আজিমপুরের দিকে ঘুরতে বলে সে। রত্না তেমন লম্বা নয়, সুরঞ্জনের কাঁধের নীচে পড়ে, ফসর্ণ গোল মুখ, কিন্তু ওর চোখে কী যে অতল বিষন্নতা, সুরঞ্জন থাই পায় না। সে বুক পকেট থেকে টেলিফোন ইনডেক্সে লিখে রাখা ঠিকানাটি বের করে বাড়িটি খোঁজে। চাইলে খুঁজে পাবে না এমন কী হয়!
রত্না বাড়িতে নেই। দরজা সামান্য ফাঁক করে বুড়োমত এক লোক বললেন–আপনার নাম কি?
