—দেখি যাবার পথে পারুলের বাড়ি থেকে ওকে নিয়ে যাব। মায়াটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বেঁচে থাকবার প্রচণ্ড লোভে ও বোধহয় ফরিদা বেগম জাতীয় কিছু একটা হয়ে যাবে। সেলফিস।
নীলার চোখে নীল দুশ্চিন্তা খেলা করে। অলক কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেছে, গালে তার চোখের জলের দাগ। পুলক পায়চারি করে, ওর অস্থিরতা সুরঞ্জনকেও স্পর্শ করে। চায়ের মত চা পড়ে থাকে, জুড়িয়ে জল হয়ে যায়। সুরঞ্জনের চায়ের পিপাসা ছিল, কোথায় যে উবে যায় সব পিপাসা। সে চোখ বুজে ভাবতে চায় দেশটি তার, তার বাবার, তার ঠাকুরদার, ঠাকুরদারও ঠাকুরদার দেশ। এটি। সে কেন তবু বিচ্ছিন্ন বোধ করছে! কোন মনে হয় এই দেশে তার কোনও অধিকার নেই!
তার চলবার, বলবার, যা কিছু পরবার, ভাববার অধিকার নেই। তাকে সিঁটিয়ে থাকতে হবে, লুকিয়ে থাকতে হবে, তার যখন ইচ্ছে বেরোনো চলবে না, যা কিছু করা চলবে না। গলায় ফাঁস পরালে যেমন লাগে মানুষের, সুরঞ্জনের তেমন লাগে। সে নিজেই নিজের দুহাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে কণ্ঠদেশ। শ্বাস তার কিছু রোধ হয় কী হয় না। সে হঠাৎ চেচিয়ে ওঠে—আমার কিছু ভাল লাগছে না পুলক ৷
পুলকের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। এই শীতেও ঘাম জমে কেন? সুরঞ্জনের হাত নিজের কপালেও ওঠে। সে অবাক হয় তার কপালেও ঘাম জমেছে। ভয়ে? কেউ তো তাদের ধরে পেটাচ্ছে না। মেরে ফেলছে না। তবু কোন ভয় হয়, বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ হয়?
সুরঞ্জন ফোনের ডায়াল ঘোরায়। দিলীপ দে, এক সময়ের তুখোড় ছাত্র নেতা, ওর নম্বরটি মনে পড়ে হঠাৎ। বাড়িতেই ছিলেন দিলীপ দে।
—কেমন আছেন দাদা? কোনও অসুবিধে নেই তো? কিছু ঘটেনি তো?
—অসুবিধে নেই, কিন্তু মনে স্বস্তি পাচ্ছি না। আর আমারই ঘটতে হবে কেন? সারা দেশেই তো ঘটছে।
—তা ঠিক।
—তুমি কেমন আছ? চট্টগ্রামের অবস্থা তো শুনেছ নিশ্চয়ই?
—কি রকম?
—সন্দ্বীপ থানায় বাউরিয়ায় তিনটে, কালাপানিয়ায় দুটো, মগধরায় তিনটে, টেউরিয়ায় দুটো, হরিশপুরে একটি, রহমতপুরে একটি, পশ্চিম সারিকাইতে একটি, মাইটভাঙায় একটি মন্দির ধ্বংস করেছে। পশ্চিম সারকাইতে সুচারু দাস নামের এক লোককে মারধাের করে পনেরো হাজার টাকা নিয়ে যায়। টোকাতলিতে দুটো বাড়ি লুট করে দুজনকে ছুরি মেরেও গেছে। পটিয়া থানার কচুয়ায় একটি বাড়ি, ভাটিকাইনে একটি মন্দির…
—আপনি এমন একটি দুটির হিসেব পেলেন কোথায়?
—আরে আমি চিটাগাঙের ছেলে না? ওসব এলাকায় কি হচ্ছে খবর না নিলেও খবর চলে আসে। শোন, বাঁশখালি থানার বইলছড়িতে তিনটে, পূর্ব চাম্বলে তিনটে বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে। রাঙ্গুনিয়া থানায় সরফভাটা ইউনিয়নে পাঁচটি ঘর, পায়রা ইউনিয়নে সাতটি ঘর, শিলক ইউনিয়নে একটি মন্দির, চন্দনাইশ থানায় বাদামতলিতে একটি মন্দির, জোয়ারার একটি মন্দিরে লুটপাট করা হয়, ভাঙা হয়। আনোয়ারা থানার বোয়ালগাঁও-এ। চারটে মন্দির, একটি ঘর, তেগোটায় ষোলোটি বাড়িতে হামলা, লুট, ভাঙচুর সবই হয়। বোয়ালখালি থানার মেধস মুনির আশ্রমে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
—আমি কৈবল্যধাম, তুলসীধাম আশ্রম, অভয় মিত্র শ্মশান, শ্মশান কালীবাড়ি, পঞ্চাননধাম নিয়ে দশটি কালীবাড়ি যে পুরো জ্বলিয়ে দেওয়া হয়েছে শুনেছি। সুরঞ্জন বলে।
–সদরঘাট কালীবাড়ি, গোলপাহাড় শ্মশান মন্দিরেও হামলা হয়েছে। জামালখান রোড আর সিরাজউদ্দৌলা রোড়ে দোকান ভাঙচুর করা হয়। এনায়েত বাজার, কে সি দে রোড, ব্ৰিকফিল্ড রোডের হিন্দুদের দোকান ও বাড়ি লুট করে, আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। কৈবল্যধাম মালী পাড়ায় আটত্রিশটি বাড়ি, সদরঘাট জেলেপাড়ায় একশর ওপর বাড়ি লুট হয়েছে, আগুন ধরানো হয়েছে। ঈদগাঁও আগ্রাবাদ জেলেপাড়া আর বহদ্দারহাটে ম্যানেজার কলোনিতে লুটপাট করে, ভেঙেও ফেলে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে মীরেরসরাই আর সীতাকুণ্ডে। মীরেরসরাই-এর সাতবাড়িয়া গ্রামে পঁচাত্তরটি পরিবার, মসদিয়া ইউনিয়নে দশটি পরিবার, হাদিনগরে চারটি পরিবার, বেশরতে ষোলটি পরিবার, তিনটি মন্দির, ওদেয়পুরে বিশটি পরিবার, খাজুরিয়ায় বারোটি পরিবার, জাফরাবাদে সােতাশিটি পরিবারে হামলা হয়েছে। তাদের বাড়িঘর লুটপাট, ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর ইউনিয়নে একটি পরিবার, বারুইয়ার ঢালা ইউনিয়নের মহালঙ্কা গ্রামে তেইশটি পরিবার, বহরপুরে আশিটি পরিবার, বারইপাড়ায় তিনশ চল্লিশটি পরিবার, নারায়ণ মন্দির, বাঁশবাড়িয়ায় বারোটি পরিবার, বাড়বকুণ্ডে সতেরোটি পরিবার, দুটো মন্দির, ফরহাদপুরে চৌদ্দটি পরিবারে হামলা হয়েছে, লুট করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
–আর কত শুনব দিলীপদা, ভাল লাগছে না।
–তুমি কি অসুস্থ সুরঞ্জন? কণ্ঠস্বর কেমন যেন লাগছে।
–ঠিক বুঝতে পারছিনা।
ফোন ছাড়তেই পুলক বলে দেবব্রতর খবর নাও তো। সুরঞ্জন দেবব্রত, মহাদেব ভট্টাচাৰ্য, অসিত পাল, সজল ধর, মাধবী ঘোষ, কুন্তলা চৌধুরী, সরল দে, রবীন্দ্র গুপ্ত, নিখিল সানাল, নির্মল সেনগুপ্ত-কে এক এক করে ফোন করে। জানতে চায় ‘ভাল আছেন কি না।‘ অনেকদিন পর পরিচিত অনেকের সঙ্গে কথা হয়। এক ধরনের আত্মীয়তাও অনুভূত হয়।
ক্রিং ক্রিং বেজে ওঠে ফোনটি। সুরঞ্জনের কানের কাছে ক্রিংক্রিং শব্দটি দ্রিম দ্রিম হয়ে বাজে। তার অস্বস্তি হয়। পুলকের ফোন। কক্সবাজার থেকে। ফোনে কথা সেরে পুলক বলে–কক্সবাজারে জামাত শিবিরের লোকেরা জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে দিয়েছে।
