আসলে ক্লাসের পাঠ্য বিষয়গুলোয় ধর্ম একটি বাধ্যতামূলক বিষয় ছিল। ইসলামিয়াত ক্লাসে তাকে ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হত। সে একা একটি হিন্দু মেয়ে, তার বইও ছিল না, তার জন্য আলাদা হিন্দু মাস্টােরও ছিল না। স্কুলে, সে একা একটি হিন্দু মেয়ে বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকত, বড় এক বড় নিঃসঙ্গ, বড় বিচ্ছিন্ন মনে হত নিজেকে তার।
সুধাময় জিজ্ঞেস করেছিলেন-কেন, কেন তোমাকে ক্লাস থেকে বার করে দেয়?
—সবাই ক্লাস করে। আমাকে নেয় মা, আমি হিন্দু তো, তই।
সুধাময় বুকের মধ্যে জাপটে ধরেছিলেন মায়াকে। অপমানে, বেদনায় তিনি অনেকক্ষণ কোনও কথা বলতে পারেননি। সেদিনই তিনি স্কুলের ধর্ম টিচারের বাড়ি গিয়ে বলেন–’আমার মেয়েকে ক্লাসের বাইরে পাঠাবেন না, ওকে কখনও বুঝতে দেবেন না ও আলাদা কেউ। * মায়ার মানসিক সমস্যা ঘুচল, কিন্তু ওকে আবার আলিফ বে তে সোর মোহে পেয়ে বসল। বাড়িতে খেলা করতে করতে আনমনে সে বলতে থাকে—’আলহামদুলিল্লাহ হি, রাব্বিল আল আমিন, আঁর রাহমানির রহিম। * শুনে কিরণময়ী সুধাময়কে ধরতেন—‘এসব করছে কি ও? নিজের জাত ধর্ম বিলিয়ে এখন স্কুলে লেখাপড়া করতে হবে নাকি? সুধাময়ও চিন্তিত হলেন। মেয়ের মানসিক অবস্থা সুস্থ রাখতে গিয়ে মেয়ে যদি ইসলাম ধর্মে আসক্ত হয়ে পড়ে তবে তো অসুবিধে আরও নতুন করে বাঁধিল। ওই ঘটনার সপ্তাহ খানিকের মধ্যে স্কুলের হেড মাস্টারের কাছে একটি দরখাস্ত লিখলেন যে ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ব্যাপার, এটি স্কুলের পাঠ্য হওয়া জরুরি নয়। তা ছাড়া আমি যদি আমার সন্তানকে কোনও ধর্মে শিক্ষিত করবার প্রয়োজন মনে না করি। তবে তাকে স্কুল কর্তৃপক্ষ কখনও জোর করে ধর্ম শেখাবার দায়িত্ব নিতে পারেন না। আর ধর্ম নামক বিষয়টির পরিবর্তে মনীষীদের বাণী, মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী ইত্যাদি সম্পর্কে সকল সম্প্রদায়ের পাঠ্য একটি বিষয় রচনা করা যায়, তাতে সংখ্যালঘুদের হীনমন্য ভাবটি দূর হয়। সুধাময়ের এই আবেদনে স্কুল কর্তৃপক্ষ সাড়া দেননি। যেভাবে চলছিল; সেভাবেই চলছে।
নীলা আসে। ছিপছিপে শরীর তার, সুন্দরী। সেজেগুজে থাকে। আজ তার আলুথালু বেশ। চোখের নীচে কালি, উদ্বিগ্ন চোখ, সে এসেই জিজ্ঞেস করে-সুরঞ্জনদা, কতদিন আসেন না, খবর নেন না, বেঁচে আছি কি মরে গেছি জানতেও আসেন না। খবর পাই পাশের বাড়িতেই আসেন। বলতে বলতে নীলা হঠাৎ কেঁদে ওঠে।
সুরঞ্জন আসে না বলে কেঁদে উঠবে কেন নীলা? সে কি তার সম্প্রদায়ের অসহায়ত্বের জন্মই কেঁদে উঠল, যেহেতু কষ্ট যা ধারণ করে এখন নীলা, একই বেদনা বা নিরাপত্তাহীনতা সুরঞ্জনকেও ধারণ করতে হয়? সে তা বোঝে বলে নিজের অসহায়বোধের সঙ্গে পুলক, অলক এবং সুরঞ্জনের বোধকেও সে নিদ্বিধায় মিলিয়েছে। এই পরিবারটিকে বড় আপন মনে হচ্ছে সুরঞ্জনের। বেলালের বাড়িতে চার-পাঁচ দিন আগেও আড্ডা দিয়েছে সুরঞ্জন, এ বাড়িতে আসবার প্রয়োজনই বোধ করেনি। এই বোধ তার নতুন করে জন্ম নিচ্ছে।
—ভূমি এত ন্যাভাস হচ্ছে কেন? ঢাকায় বেশি কিছু করতে পারবে না। পুলিশ পাহারা আছে শাঁখারি বাজারে, ইসলামপুরে, তাঁতিবাজারে।
-পুলিশ তো গতবারও দাঁড়িয়ে ছিল, তারা ঢাকেশ্বরী মন্দির লুট করুল, আগুন ধরাল পুলিশের সামনে, পুলিশ কিছু করল?
一হুঁ।
—আপনি রাস্তায় বেরোলেন কেন? কোনও বিশ্বাস নেই মুসলমানদের। ভাবছেন বন্ধু, দেখবেন সেই আপনার গলা কেটে ফেলে রাখিল।
সুরঞ্জন আবার চোখ বন্ধ করে। দু চোখ বন্ধ করে রাখলে কি অন্তৰ্জােলা কিছু কমে! বাইরে কোথায় যেন হইচই হচ্ছে, বোধহয় কোনও হিন্দুর দোকান ভাঙছে, পুড়ছে। চোখ বন্ধ করলেই পোড়া পোড়া গন্ধ নাকে লাগে। চোখ বন্ধ করলেই দা কুড়োল রামদা হাতে ধেয়ে আসা মৌলবাদীর দল মনে হয় চোখের সামনে নাচছে। গত রাতে গৌতমকে দেখতে গিয়েছিল সে, শুয়ে আছে, চোখের নীচে, বুকে পিঠে কালশিরে দাগ। ওর বুকে হাত রেখে বসেছিল সুরঞ্জন। কিছু জিজ্ঞেস করেনি, যে স্পর্শ সে রেখেছিল, এসে স্পর্শের পর কথা বলবার দরকার পড়ে না। গৌতমই বলেছিল–‘দাদা, আমি কিছুই করিনি। ওরা মসজিদ থেকে দুপুরের নামাজ সেরে বাড়ি ফিরছিল, বাড়িতে বাজার নেই। কিছু, মা বললেন ডিম কিনে আনতে। পাড়ার দোকান ভয় কী, আমি তো আর দূরে কোথাও যাচ্ছি। না। ডিম হাতে নিয়ে টাকা ফেরত নিচ্ছি, হঠাৎ পিঠের পেছনে দুম করে লখি এসে পড়ে। ওরা ছসৈাতজন ছেলে, আমি একা কী করে পারি! দোকানঅলা, রাস্তার লোকেরা দূর থেকে মজা দেখল, কিছু বলল না। আমাকে কোনও কারণ ছাড়াই মারল ওরা, নীচে ফেলে মারল। বিশ্বাস কর কিছু বলিনি আমি ওদের। ওরা বলছিল—’হিন্দু শালা, মালাউনের বাচ্চা, শালাকে মেরে শেষ করে দেব। আমাদের মসজিদ ভেঙে পার পেতে চাস তোরা। তোদের দেশ থেকে তাড়াবই।’ সুরঞ্জন শোনে শুধু কিছু যে বলবে, খুঁজে পায় না। গৌতমের বুকের টিপচিপ শব্দ অনুভূত হয় তার হাতে। এই শব্দ সে কি তার বুকেও বাজতে শুনেছে? বোধহয় শুনেছে। দু-একবার।
নীলা চা আনে। চা খেতে খেতে মায়ার কথা ওঠে।
—মায়াকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা হয়। সে আবার হুট করে জাহাঙ্গীরকে বিয়েই করে বসে কি না।
—সে কী সুরঞ্জনদা? এখনও ফেরান ওকে। দুঃসময়ে মানুষ ঝটি করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।
