—কাকে ডাকব? হরিপদবাবুকে ডাকব একবার?
সুধাময় বাঁ হাতে খামচে ধরেন কিরণময়ীর হাত। —যেও না, আমার কাছ থেকে নড়ো না কিরণ। মায়া কোথায়?
—ও তো সেই যে গেছে। পারুলের বাড়ি। ফেরেনি।
—আমার ছেলে কোথায় কিরণ? আমার ছেলে?
—কি পাগলের মত কথা বলছি।
—কিরণ দরজা জানালাগুলো খুলে দাও।
—দরজা জানালা কেন খুলব?
—আমার একটু আলো চাই। বাতাস চাই।
—হরিপদবাবুকে ডেকে আনি। তুমি চুপচাপ শুয়ে থাকো।
—ওই হিন্দুগুলো পালিয়েছে বাড়ি ছেড়ে, ওদের পাবে না। মায়াকে ডাকো।
—খবর পাঠাবো কাকে দিয়ে বল। কেউ তো নেই।
—তুমি একচুল নড়ো না কিরণ। সুরঞ্জনকে ডাকো।
সুধাময়। এরপর বিড়বিড় করে কী বলেন কিছু বোঝা যায় না। কিরণময়ী কেঁপে ওঠেন। তিনি কি চিৎকার করে পাড়ার লোক ডাকবেন? দীর্ঘ বছর ধরে পাশাপাশি থাকা পড়শি কাউকে? হঠাৎ দমে গেলেন তিনি পড়শি কে আছে যে আসবেন? হায়দার, গৌতম বা শফিক সাহেবদের বাড়ির কাউকে? বড় অসহায় বোধ করেন কিরণময়ী। ডাল পুড়ে পোড়া গন্ধে আর ধোঁয়ায় ঘর ভেসে যায়।
৩ঘ.
সুরঞ্জন আজও কোথায় যাবে কোনও ঠিক নেই। একবার ভাবে বেলালের বাড়ি যাবে। কাকরাইল পার হয়ে ডানেই দেখে জলখাবার নামের দোকানটি ভাঙা। রাস্তায় দোকানের টেবিল চেয়ার এনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, পোড়া কাঠকয়লা আর ছাই জমে আছে। সুরঞ্জন দেখে, যতক্ষণ দেখা যায়। চামেলিবাগে পুলকের বাড়িও। সুরঞ্জন হঠাৎই তার ইচ্ছে পাল্টায়। পুলকের বাড়িতে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। রিক্সাকে বাঁয়ের গলিতে যেতে বলে। পুলক একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকে। এন জি ও-তে চাকরি করে। অনেকদিন দেখা হয় না। ওর সঙ্গে। পাশেই বেলালের বাড়ি আডিডা দিতে সে প্রায়ই আসে। অথচ কলেজ জীবনের বন্ধু পুলকের খোঁজ নেওয়ার সময়ই তার হয় না।
কলিং বেল বাজে। ভেতর থেকে কোনও শব্দ আসে না। একটানা কলিং বেল বাজিয়েই চলে সুরঞ্জন। ভেতর থেকে ক্ষীণ কণ্ঠে শব্দ হয়—কে?
–আমি সুরঞ্জন।
—কোন সুরঞ্জন?
–সুরঞ্জন দত্ত। ভেতর থেকে তালা খুলবার শব্দ হয়। পুলক নিজেই দরজা খুলে দেয়। চাপা কণ্ঠে বলে-ঢুকে পড়।
—কি ব্যাপার এত প্রোটেকশনের ব্যবস্থা কেন? ডোর ভিউ লাগালেই পারো।
পুলক আবার তালাটি লাগায় দরজায়। টেনে দেখেও নেয় ঠিকমত লাগল কিনা ৷ সুরঞ্জন বেশ চমকিত হয়। পুলক চাপা স্বরে আবার জিজ্ঞেস করে—তুমি বাইরে বেরিয়েছ যে?
—ইচ্ছে করেছে।
—মানে? ভয়ডর নেই নাকি? সাহস দেখিয়ে প্রাণটা খোয়াতে চাও? নাকি এডভেঞ্চারে বেরিয়েছ?
সুরঞ্জন সোফায় শরীর ছেড়ে দিয়ে বলে—যা ভাবো তাই।
পুলকের চোখের মণিতে আশঙ্কা কাঁপে। সেও পাশের সোফায় এসে বসে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বলে-খবর রাখছ তো সব?
—নাহ।
—ভোলায় তো খুব খারাপ অবস্থা। তাজমুদ্দিন, বোরহানউদ্দিন থানার গোলকপুর, ছোট ডাউরি, শম্ভুপুর, দাসের হাট, খাসের হাট, দরিরামপুর, পদ্মামন আর মনিরাম গ্রামের দশ হাজার পরিবারের প্রায় পঞ্চাশ হাজার হিন্দু সর্বস্বাস্ত হয়েছে। লুটেপুটে আগুন লাগিয়ে ভেঙেচুরে সব শেষ করে দিয়েছে রে। পঞ্চাশ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। মরেছে দুজন, আহত দুশ। লোকের পরনে কাপড় নেই, পেটে ভাত নেই। একটি ঘরাও আর বাকি নেই। আগুন ধরাতে। শত শত দোকান লুট হয়েছে। দাসের হাট বাজারের একটি হিন্দুর দোকানও নেই। আর। ঘরবাড়িহারা মানুষগুলো এই প্রচণ্ড শীতে খোলা আকাশের নীচে দিন কাটাচ্ছে। শহরের মদনমোহন ঠাকুরবাড়ি, মন্দির, লক্ষ্মীগোবিন্দ ঠাকুরবাড়ি, তার মন্দির, মহাপ্রভুর আখড়া লুট করে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। বোরহানউদ্দিন, দৌলতখান, চরফ্যাশন, তাজমুদ্দিন, লালমোহন থানার কোনও মন্দির, কোনও আখড়ার অক্তিত্ব নেই। সব ঘরবাড়িতে লুট হয়, আগুন ধরানো হয়। ঘুইন্যার হাট বলে এক এলাকায় প্রায় দু মাইল জুড়ে হিন্দুদের ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। দৌলতখান থানার বড় আখড়াটি সাত তারিখ রাতে জ্বলিয়ে দিয়েছে। বোরহানউদ্দিন বাজারের আখড়া ভেঙে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। কুতুবা গ্রামের পঞ্চাশটি বাড়ি ছাই করে দিয়েছে। চরফ্যাশন থানায় হিন্দুদের বাড়িঘর লুট করেছে। অরবিন্দ দে নামের একজনকে ছুরিও মেরেছে।
–নীলা কোথায়?
—ও তো ভয়ে কাঁপছে। তোমার অবস্থা কি?
সুরঞ্জন সোফায় আরাম করে বসে চোখ বন্ধ করে। সে ভাবে পাশেই বেলালের বাড়ি না গিয়ে আজ সে পুলকের বাড়ি এল কেন। সে কি ভেতরে ভেতরে কম্যুনাল হয়ে উঠছে, নাকি পরিস্থিতি তাকে কম্যুনাল করছে।
—বেঁচে আছি, এইটুকুই বলতে পারি।
মেঝোয় শুয়ে পুলকের ছ’বছরের ছেলে কাঁদছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। পুলক বলে ও কাঁদছে কেমন জানো? পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চারা, যাদের সঙ্গে খেলত ও, আজ থেকে অলককে খেলায় নিচ্ছে না। বলছে তোমাকে খেলায় নেব না, হুজুর বলেছেন হিন্দুদের সঙ্গে না মিশতে।
—হজুর মানে? সুরঞ্জন প্রশ্ন করে।
—হুজুর হচ্ছে সকলে মৌলভি আসে আরবি পড়াতে সেই লোক।
—পাশের ফ্ল্যাটে আনিস আহমেদ থাকে না? সে তো কমিউনিস্ট পার্টি করে, সে তার বাচ্চাদের হুজুর দিয়ে আরবি পড়ায়?
—হ্যাঁ। পুলক বলে।
সুরঞ্জন আবার চোখ বোজে। সে অলক হয়ে নিজেকে অনুভব করে। অলকের গ কেঁপে কেঁপে ওঠা কান্না তার বুকেও নিঃশব্দে বাজে। তাকেও যেন কেউ খেলায় নিচ্ছে না। এতকাল যাদের সঙ্গে সে খেলেছিল, যাদের সঙ্গে খেলবে বলে ভেবেছিল, তারা তাকে খেলায় নিচ্ছে না। হুজুরেরা বলেছে হিন্দুদের খেলায় নিতে নেই। সুরঞ্জনের মনে পড়ে মায়া একবার স্কুল থেকে কেঁদে কেঁদে বাড়ি ফিরেছিল। বলেছিল—আমাকে ক্লাস থেকে বার করে দেয় টিচার।
