এখন কিরণময়ীর দিকে চোখ পড়তেই সুধাময়ের মনে হয় সে ভেতরে ভেতরে একাত্তরের ন’ মাসের মত কাল্লা জমাচ্ছে। হঠাৎ একদিন সব কান্না সে কাঁদবে, হঠাৎ একদিন তাঁর দুঃসহ স্তব্ধতা কাটবে। ভেতরে কালো মেঘের মত দুঃখ জমছে। একদিন জল হযে বৃষ্টি হয়ে ঝরবে সব, কবে জয় বাংলার মত স্বাধীনতার সংবাদ তাদের কানে আসবে। কবে খবর আসবে শাঁখা সিঁদুর পরুবার, ধুতি পরুবার অবাধ স্বাধীনতার। কবে কািটৰে একাত্তরের মত দম বন্ধ করা দুৰ্য্যেগের দীর্ঘ রাত? সুধাময় লক্ষ করছেন কোনও রোগীও আর আসছে না। তাঁর কাছে; দিনে ছ সাতটি রোগী তো ঝড়-বৃটির দিনেও হত। সারাদিন ঘরে বসে থাকতে ভাল লাগে না সুধাময়ের, খানিক পর পর মিছিল যায় ‘নারীয়ে তকবির আল্লাহু আকবার, হিন্দু যদি বাঁচতে চাণ্ড, এ দেশ ছেড়ে চলে যাও।’ যে কোনও সময় বোমা পড়তে পারে বাড়িতে, যে কোনও সময় আগুন লাগিয়ে দেবে মীেলাবাদীরা, যে কোনও সময় লুট হয়ে যাবে বাড়ি, খুন হয়ে যাবে বাড়ির যে কেউ। হিন্দুরা কি চলে যাচ্ছে, নব্বই-এর পর সুধাময় জানেন অনেকে দেশ ছেড়েছে, নতুন সেনসাসে হিন্দু মুসলমান আলাদা আলাদা করে গোনা হয়নি, হলে দেশ ছেড়ে গেছে কত হিন্দু তা স্পষ্ট হত। বইয়ের তাকে ধুলো জমে গেছে। সুধাময় কুঁ দিয়ে ধুলো পরিষ্কার করেন। স্কুলো কি যায়! পাঞ্জাবির খুঁট দিয়ে ধুলো মুছতে মুছতে চোখে পড়ে। বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান ঝুরোর পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থটি। উনিশ’শ ছিয়াশির পরিসংখ্যান। চুয়াত্তর এবং একাশি সনের হিসেবে। চুয়াত্তরে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যা ছিল পাঁচ লক্ষ আট হাজার, একাশিতে দাঁড়াল পাঁচ লক্ষ আশি হাজার। চুয়াত্তিরে সেখানে মুসলমান ছিল ছিয়ানব্বই হাজার, একাশিতে হল এক লক্ষ অষ্টআশি হাজার। চুয়াত্তিরে ছিন্দু ছিল তোপ্পান্ন হাজার, একাশিতে হল ছেষট্রি হাজার। মুসলমান বৃদ্ধির হার ৯৫.৮৩%, হিন্দু বৃদ্ধির হার ২৪.৫৩%,। কুমিল্লায় চুয়াত্তিরে মুসলমানের সংখ্যা ছিল বাহান্ন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার, একাশিতে দাঁড়াল ছেষট্টি লক্ষ, হিন্দু ছিল পাঁচ লক্ষ চৌষট্টি হাজার, একাশিতে ছিল পাঁচ লক্ষ পয়ষট্টি হাজার। মুসলমান বৃদ্ধির হার ২০.১৩%। হিন্দু বৃদ্ধির হার ০-১৮% ৷ ফরিদপুরে জনসংখ্যা চুয়াত্তর থেকে একাশিতে বৃদ্ধি পেয়েছে ১৭.৩৪%। মুসলমান সংখ্যা ছিল একত্ৰিশ লক্ষ, একাশিতে এসে হল আটত্রিশ লক্ষ বাহান্ন হাজার। বৃদ্ধির হার ২৪.২৬%। নয় লক্ষ চুয়াল্লিশ হাজার ছিল চুয়াত্তিরের হিন্দু সংখ্যা, একাশিতে দাঁড়াল আট লক্ষ চুরানব্বই হাজার। বৃদ্ধির হার (-)৫.৩৫%,। পাবনার জনসংখ্যা চুয়াত্তর থেকে একাশিতে বেড়েছে ২১.১৩%। পঁচিশ লক্ষ ছেচল্লিশ হাজার মুসলমান ছিল চুয়াত্তরে, একাশিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল একত্রিশ লক্ষ সাতষট্টি হাজার। বৃদ্ধির হার ২৪-৩৯% ৷ এদিকে হিন্দু ছিল দুই লক্ষ ষাট হাজার, একাশিতে হল দুই লক্ষ একান্ন হাজার। বৃদ্ধির হার (-)৩-৪৬%,। রাজশাহী জেলায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২৩.৭৮ % ৷ মুসলমান বেড়েছে। ২৭।২০%। হিন্দু ছিল চুয়াত্তিরে পাঁচ লক্ষ আটান্ন হাজার। একাশিতে হল পাঁচ লক্ষ তিন হাজার। হিন্দু বৃদ্ধির হার (-)৯.৬৮%,। পরিসংখ্যান গ্রন্থটির ১১২ নম্বর পৃষ্ঠায় সুখময় দেখলেন একটি হিসেব লেখা : ১৯৭৪ সনে হিন্দু জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার শতকরা সাড়ে তের ভাগ ছিল। ১৯৮১ সনে হিন্দুরা মোট জনসংখ্যার ১২.১ ভাগ। বাকি হিন্দু যাচ্ছে কোথায়? সুধাময় চশমার কাচ পরিষ্কার করেন জামার হাতায়। তরে কি ওরা চলে যাচ্ছে? কেন চলে যাচ্ছে? চলে যাওয়াতেই কি আসল মুক্তি? দেশে থেকে লড়াই করা কি উচিত ছিল না? সুধাময়ের আবার ইচ্ছে করে পালিয়ে যাওয়া হিন্দুদের কাওয়ার্ড বলে গাল দিতে।
তাঁর শরীরটা ভাল লাগছে না। পরিসংখ্যানের বই হাতে নেওয়ার পর থেকে তিনি লক্ষ করছেন ডান হাতটি দুর্বল লাগছে। বইটি তাকে উঠিয়ে রাখতে গিয়েও দেখেন আগের মত জোর পাচ্ছেন না হাতে। কিরণময়ীকে ডাকেন। তিনি, ডাকতে গিয়ে লক্ষ করেন জিভখানাও ভরি লাগছে। নীল নেকড়ের মত একটি আশঙ্কা তাঁর দরজায় দাঁড়ায়। নাছোড়বান্দা নেকড়ে। হাঁটতে গিয়েও লক্ষ করেন তাঁর ডান পায়ে আগের জোর নেই। ডাকেন—কিরণ! ও কিরণ!
কিরণময়ী ডাল বসিয়েছেন চুলোয়। নিঃশব্দে দাঁড়ান এসে সামনে। সুধাময় ডান হাত বাড়তে চান কিরণাময়ীর দিকে। হাতটি ঢলে পড়ে যায়। —কিরুণ, আমাকে বিছানায় শুইয়ে দাও তো।
কিরুণাময়ীও ঠিক বুঝতে পারেন না হয়েছে কী। মানুষটি এভাবে কাঁপছেন কেন। কথাই বা জড়িয়ে যাচ্ছে কেন। তিনি শোবার ঘরের বিছানায় শুইয়ে দেন সুধাময়কে। –হয়েছে কি তোমার?
—সুরঞ্জন কোথায়?
—এই তো বেরিয়ে গেল। কথা শুনল না।
–আমার ভাল লাগছে না কিরণ। কিছু একটা কর।
—তোমার কথা জড়াচ্ছে কেন? কি হয়েছে?
—ডান হাতে জোর পাচ্ছি না। ডান পায়েও না। তবে কি কিরণময়ী প্যারালাইসিস হয়ে যাচ্ছে?
কিরণময়ী দুহাতে জাপটে ধরেন সুধাময়ের দুটো বাহু। বলেন—বালাই ষাট। দুর্বলতা থেকে হচ্ছে গো, ঘুম হচ্ছে না রাতে। তাই বোধহয়। খাওয়া-দাওয়াও করছ না।
সুধাময় ছটফট করেন। অস্থিরতা তাঁর সারা শরীরে। তিনি বলেন–দেখ তো কিরণ, আমি মরে যাচ্ছি কি না। আমার এমন লাগছে কি না।
