নামিয়ে ফেলতে চায়, কেউ জিভ বের করে নাড়ায়, কেউ খুশিতে মরা তেলাপোকা ঢুকিয়ে দেয় শার্টের পকেটে। সুরঞ্জন লজ্জায় মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিল, তার চোখ উপচে জল নামছিল, গরুর মাংস খেয়ে তার এতটুকু গ্লানি হচ্ছিল না, গ্লানি হচ্ছিল তাকে ঘিরে জান্তব উচ্ছ্বাস দেখে। সে খুব বিচ্ছিন্ন বোধ করছিল। তার মনে হচ্ছিল যেন সে এদের বাইরে, এই বন্ধুরা একরকম মানুষ, আর সে আরেকরকম। বাড়ি ফিরে সে কী কান্না সুরঞ্জনের। সুধাময়কে বলল–ওরা আমাকে ষড়যন্ত্র করে গরুর মাংস খাইয়েছে।
শুনে সুধাময় হেসে বলেছিলেন-এর জন্য কাঁদতে হয় নাকি? গরুর মাংস তো ভাল খাবর। কালই আমি বাজার থেকে কিনে আনিব, সবাই মিলে খাব, দেখিস।
পরদিন সত্যি সত্যি গরুর মাংস কিনে এনেছিলেন সুধাময়। কিরুণাময়ী রেঁধেছিলেন সেই মাংস ৷ সহজে কি রাঁধতে চান। অর্ধেক রাত পর্যন্ত সুধাময় বুঝিয়েছিলেন এসব কুসংস্কারের কোনও অর্থ নেই, অনেক বড় বড় মনীষী এইসব সংস্কার মানতেন না, আর যাই বল মাংসটা তো টেস্টি। ঝাল ফ্রাইও করতে পারো। সুরঞ্জনের ধীরে ধীরে কেটেছিল ছোটবেলার লজ্জা, ভয়, ক্ষোভ, সংস্কার। পরিবারের শিক্ষক ছিলেন সুধাময়। সুরঞ্জনের মনে হয় তার বাবা অতিমানব গোছের কিছু হবেন। এত সততা, এত সারল্য, এত সুস্থ চিন্তা, গভীর বোধ ও ভালবাসা, এত অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আজকাল কেউ বাঁচে না।
সুরঞ্জন পত্রিকাটি ছুঁয়েও দেখে না। আলগোছে সরে যায় সুধাময়ের ঘর থেকে। তার ইচ্ছে করে না পত্রিকার ওপর ঝুঁকে থাকতে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিপক্ষে বুদ্ধিজীবীদের গীতি পড়বে, শক্তি মিছিলের ছবি দেখবে, আর প্রাণে তার আস্থার সুবাতাস বইবে এ স্পর্কবারেই অপছন্দ সুরঞ্জনের। সে বরং বেড়ালটিকে খুঁজতে থাকে। জাতছাড়া একটি বেড়াল! বেড়ালের তো জাত নেই, সম্প্রদায় নেই। সেও যদি একটি বেড়াল হতে পারত।
৩গ.
ক্যাম্প থেকে কদিন পর ফিরেছিলেন সুধাময়, সাতদিন? ছ’দিন? তাঁর খুব পিপাসা পেয়েছিল। এত পিপাসা যে সে হাত পা বাঁধা, চোখও বাঁধা, তবু তিনি গড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছিলেন যদি কোনও মাটির কলসের দিকে যাওয়া যায়। ক্যাম্পে কলস কোথায় পাবেন, দূরে ব্ৰহ্মপুত্রের জল ছলাৎ ছলাৎ করে, ঘড়ায় কোনও জল তোলা নেই। সুধাময়ের বুক, জিভ শুকিয়ে কাঠ হয়ে থাকত। জল জল বলে যখন কাতরাতেন সুধাময়, মিলিটারিগুলো ইতি শব্দ করে হাসত। একদিন অবশ্য জল দিয়েছিল ওরা, সুধাময়ের চোখের পট্টি খুলে দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে একটি ঘটিতে পেচ্ছাব করেছিল দুটো মিলিটারি, সেই ঘটির পেচ্ছাব সুধাময়ের মুখে ঢালতে নিলে তিনি সরিয়ে ফেলেছিলেন মুখ ঘূণায়, কিন্তু মুখটিকে হাঁ করিয়ে রাখলো শক্ত দুটো হাত দিয়ে একজন, আর আরেকজন ঢালল, হো হো করে হেসে উঠেছিল ক্যাম্পের বাকি মিলিটারি। নোনা গরম জল তাঁর গলা বেয়ে নামছিল, মনে মনে তিনি তাঁর প্রকৃতির কাছে বিষ চাইছিলেন। ওরা কড়িকাঠে ঝুলিয়ে পিটিয়েছিল তাঁকে। পেটাতে পেটতে বারবারই বলছিল মুসলমান হতে। কলমা পড়ে মুসলমান হতে। অ্যালেক্স হ্যালির রুটস-এ কালো ছেলে কুণ্টা কিন্টেকে যেমন তার নাম টোবি বলবার জন্য যারা চাবুক মারছিল পিঠে, তাদের সে বারবারই বলছিল তার নাম কুন্টা কিন্টে। সুধাময় যখন কিছুতেই মুসলমান হতে চাইলেন না, মুসলমান যখন হাবই ন এই নে তোর মুসলমানি করে দিলাম বলে ওরা একদিন লুঙ্গি তুলে খচ করে কেটে ফেলল তাঁর পুরুষাঙ্গ। ওটি ধরে পেচ্ছাব খাওয়াবার দিন যেমন হেসেছিল, তেমন অদ্ভুত কণ্ঠে হেসে উঠল। সুধাময় সম্ভবত জ্ঞান হারিয়েছিলেন সে মুহুর্তে। বেঁচে ফিরবেন এরকম আশা তিনি করেননি, যে হিন্দুরা চোখের সামনে বাঁধা ছিল, তারা কলমা পড়ে মুসলমান হতে চাইল, তবুও তারা প্ৰাণে বাঁচল না, সুখময়কে আমূল মুসলমানি করুবার করুণায় হয়ত বাঁচিয়ে দিল ওরা। ওরকম বেঁচে এসে তাঁর নালিতবাড়ি যাবার প্রোগ্রাম গেল ধসে।
ডাকবাংলোর ড্রেনের কাছে পড়ে থাকা দেহটি সজাগ হয়ে দেখেছিল গা থেকে রক্ত গড়াচ্ছে, কিন্তু মরেনি। সেই পা পাঁজর ভাঙা শরীর নিয়ে কী করে ব্ৰাহ্মাপল্লী অবধি এসেছিলেন ভাবলে এখনও তিনি অবাক হন, ওই ভেতরের শক্তিই সম্ভবত তাঁকে এখনও অনড় রেখেছে। বাড়ি ফিরে কিরুণাময়ীর সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন সেদিন। দেখে থর/থার কেঁপেছিলেন কিরণময়ী। কিরণময়ীই তাঁকে পার করে নিয়ে এসেছিলেন, রাড়িঘর ফেলে ব্ৰহ্মপুত্রের ফেরি পার হলেন তিনি, সঙ্গে অবাধ দুটো শিশু ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে উঠছিল, কিরণময়ী কাঁদতে পারেননি, সব কান্না তাঁর জমা ছিল বুকের ভেতর। ফয়জুলের মা প্রায়ই তাঁকে বলতেন—’মৌলভি ডাকি, কলমা পড়ে মুসলমান হয়ে যান, সওয়াব হবে। মায়ার বাবাকে বোঝান।’ কিরণময়ী তখনও কাঁদেননি। আটকে রেখেছিলেন। গভীর গোপন বেদনাগুলো, বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে গেলে শাড়ির আঁচল কেটে সুধাময়ের ক্ষতে ব্যান্ডেজ করে দিতেন, তখনও কর্মীদেননি; কেঁদেছিলেন তখন যখন সারা গ্রাম জুড়ে উৎসব শুরু হল আনন্দের, জয় বাংলার, তখন গ্রামের লোকে কী বলবে কিছু না ভেবেই কিরণময়ী সুধাময়ের বুকে পড়ে বুকের সব জমানো কান্না কেঁদেছিলেন। শিশুর মত গলা ছেড়ে কেঁদেছিলেন।
