-কল। খাটের রেলিং ধরে দাঁড়ায় সে।
—যোশী আর আদভানি সহ আটজন গ্রেফতার হয়েছে শুনেছিস? ওদিকে চারশ’রও বেশি মারা গেছে। ইউ পি-র কল্যাণ সিং-এরও বিচার হবে। আমেরিকা এমনকি সারা বিশ্ব বাবরি মসজিদ ভাঙার নিন্দা করেছে, ভোলায় কার্ফু দিয়েছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্ৰীতি রক্ষণ করার জন্য বি এন পি আওয়ামি লিগ এমনকি অনেক দলই পথে নোমছে। বিবৃতি দিচ্ছে। সুধাময়ের চোখের তারা বেড়ালের চোখের তারার মত মায়া মায়া।
—আসলে কি জানিস, যারা দাঙ্গা বাঁধাচ্ছে, তারা কি আর ধর্ম মেনে করছে? আসল কথা লুটপাট। মিষ্টির দোকানগুলো লুট হয় কেন বুঝিাস না? মিষ্টির লোভে। সোনার দোকানও ওই সোনাদানার লোভে।। গুণ্ডা বদমাশরা এই লুটপাটগুলো করছে, এখানে সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে আসলে কোনও বিরোধ নেই। আর যে হারে শান্তি মিছিল বেরোচ্ছে, কিছু একটা হবেই। নব্বই-এ এরশাদের পতন তো এই ইসুতেই হল। আচ্ছা সুরে, এরশাদ যে বলেছিল হিন্দুদের ক্ষতিপূরণ দেবে, দেওয়া হয়েছিল?
—তুমি কি পাগল হয়ে গেছ বাবা?
–কী জানি আজকাল মনেও থাকে না? নিদারাবাদ হত্যাকাণ্ডের আসামীদের ফাঁসি হবে জানিস তো?
সুরঞ্জন বোঝে সুধাময় বোঝাতে চান হিন্দুরা এ দেশে বিচার পায়। ব্ৰাহ্মণবাড়িয়ার নিদারাবাদ গ্রামের বিরজাবালা দেবনাথ আর তার পাঁচ সন্তান নিয়তিবালা, সুভাষ দেবনাথ, মিনতিবালা, সুমন দেবনাথ ও সুজন দেকনাথকে ধোপাজুড়ি বিলে নিয়ে রামদা দিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলে, মেরে দুটো ড্রামে পুরে ড্রামের মুখ চুন ও নুন দিয়ে বন্ধ করে ধোপাজুড়ি বিলে ডুবিয়ে রাখে, পরে পানির নীচ থেকে ড্রাম ভেসে ওঠে। মেরেছিল বিরজার স্বামী শশাঙ্ক দেবনাথের তিন একর চৌত্ৰিশ শতক সম্পত্তি জীবর দখল করা এবং শশাঙ্ক হত্যামামলা থেকে বাঁচবার জন্য। হত্যামামলার আসামী তাজুল ইসলাম আর চোরা বাদশাহর ফাঁসির রায় হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে, সেও আজ চার মাস হয়ে গেল, নতুন করে সুধাময়ের এই কথা বলবার কারণ কি তবে এই যে তিনি কোনও একটি ঘটনা থেকে সাত্মনা পেতে চাইছেন। ভাবতে চাইছেন হিন্দুরা এই দেশে খুব সুবিচার পায়। এই দেশে হিন্দু মুসলমান একই মযাদা পায়! হিন্দুরা এই দেশে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক নয়।
—কাল কি সম্প্রীতির মিছিলে গিয়েছিলি? কত লোক হয়েছিল রে সুরঞ্জন?
—জানি না।
–জামাতিরা ছাড়া সব দল তো রাস্তায় নেমেছিল, তাই না?
–জানি না।
—পুলিশ প্রোটেকশান তো দিচ্ছেই সরকার
—জানি না।
–শাঁখারি বাজার এলাকার এমাথা ওমাথায় ট্রাক ভর্তি পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে, দেখেছিস?
–জানি না।
—হিন্দুরা তো দোকানপাটও খুলছে।
–জনি না।
–ভোলায় নাকি খুব খারাপ অবস্থা? খুব কি খারাপ অবস্থা সুরঞ্জন? নাকি প্রচারটা বেশি হচ্ছে?
–জানি না।
-গৌতমকে বোধহয় ব্যক্তিগত শক্রতার কারণেই মেরেছে। ছেলেটি নাকি গাঁজ-টাজা খেত?
–জানি না।
সুরঞ্জনের নিষ্পৃহ ভঙ্গি সুধাময়ের উচ্ছাস দমিয়ে ফেলে। তিনি পত্রিকার পাতা মেলে ধরেন চোখের সামনে। আহত কণ্ঠে বলেন–তুই বোধহয় পত্রিকা-টত্রিকা পড়িস না!
—পত্রিকা পড়ে কী হবে?
–চারদিকে কিরকম প্রতিরোধ হচ্ছে, প্রতিবাদ হচ্ছে, জামাতিদের কি আর এত শক্তি হবে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে মন্দিরে ঢুকতে?
—মন্দির দিয়ে কী করবে তুমি, পুজো করবার ইচ্ছে হচ্ছে বুঝি শেষ বয়সে? মন্দির ওঁড়ো করে ফেললে তোমার কোনও অসুবিধে? যত মন্দির আছে ভেঙে ফেলুক না! আমি তো খুশি হই।
সুধাময় অপ্রস্তুত হন। সুরঞ্জন ইচ্ছে করেই তার ভালমানুষ বাবাকে আহত করে। এত ভাবনার কি আছে, দেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে, নিজেকে প্রথম শ্রেণীর কাতারে দাঁড় করাবার ইচ্ছেটাই তো বোকামি। এতকাল পুজো-আচ্চা না করে, এতকাল মুসলমানদের ভাই বন্ধু ভেবে কী লাভ হল সুধাময়ের, কী লাভ হল সুরঞ্জনের! সেই তো সকলে তাদের হিন্দু বলেই জানে। সারাজীবন মনুষ্যত্ব আর মানবতার চাচা করে, সারাজীবন নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাস করে কী লাভ হল। এই পরিবারের! সেই তো ঢ়িল পড়ে বাড়িতে, সেই তো তটস্থ থাকতে হয় ভয়ে। সেই তো কুঁকড়ে থাকতে হয় আশঙ্কায় কখন সাম্প্রদায়িকতার অন্ধ আগুন এসে গায়ে লাগে। সুরঞ্জনের মনে আছে সে যখন ক্লাস সেভেনে পড়ে, টিফিন পিরিয়ডে তারই ক্লাশমেট ফারুক তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলেছিল-’আমি খুব ভাল একটি খাবার এনেছি বাড়ি থেকে, কাউকে দেব না, তুই আর আমি ছাদের সিঁড়িতে বসে খাব, কেমন?’ সুরঞ্জন যে খুব ক্ষুধার্ত ছিল তা কিন্তু নয়। তার কাছে ফারুকের প্রস্তাবটি মন্দ লাগেনি। টিফিনবক্স নিয়ে ফারুক উঠে এল স্কুলের ছাদে, পেছনে সুরঞ্জন। ফারুক তার টিফিনবক্স খুলে একটি কাবাব দিল সুরঞ্জনের হাতে। দুজনে গল্প করতে করতে কাবাব খেল। সুরঞ্জন ভােবল তার মা-ও চমৎকার নারকেলের নাডু বানাতে পারেন, একদিন এনে সে ফারুককে খাওয়াবে। ফারুককে সে বললও, ‘এটি কে বানিয়েছে, তোমার মা বুঝি? আমার মায়ের রান্নাও তোমাকে একদিন খাওয়াব ৷ ‘ এদিকে খাওয়া শেষ হবার পর ফারুক সজোরে আনন্দধবনি দিলে—’হুররে ৷ ‘ সে কিছু বুঝে উঠবার আগেই ফারুক দৌড়ে নেমে গেল সিঁড়ি ভেঙে। নীচে নেমে ক্লাসের সবাইকে সে জানিয়ে দিল সুরঞ্জন গরু খেয়েছে। সকলে সুরঞ্জনকে ঘিরে হৈ হৈ করে নাচতে লাগল। কেউ চিমটি কাটে, কেউ তার মাথায় চাটি মারে, কেউ জামা ধরে টান দেয়, কেউ প্যান্টখানা
