কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার মহিষকোলা গ্রামে তেইশ অক্টোবর কালী মন্দিরের কালী মূর্তি ভেঙে ফেলা হয়।
গাজিপুরে কালীগঞ্জ উপজেলার কালীগঞ্জ বাজারের কালী মন্দিরে পুজোর আগে যে মূর্তিটি তৈরি হচ্ছিল, ভেঙে ফেলা হয়। –
তিরিশে সেপ্টেম্বর তারিখে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার নকীপুর গ্রামে হরিতলা মন্দিরে পুজোর আগে তৈরি করা মুর্তি ভেঙে দেয়।
পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া উপজেলায় কালী মন্দিরের দেওয়াল ভেঙে ড্রেন করা হয়েছে।
বরগুনা জেলার ফুলঝুরি বাজারের দুর্গ প্রতিমা বিজয়া দশমীর দিন মৌলবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়া ইউনিয়নের দুর্গ প্রতিমা পূজার কয়েকদিন আগে ভেঙে ফেলে। এসবের কোনও স্ট্রিচার হয়নি।
বাংলাদেশ নাকি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। সুরঞ্জন হঠাৎ হেসে ওঠে। এক ঘরে, ঘরে কিরণময়ী নেই, একটি বেড়াল শুয়েছিল। দরজার পাশে, বেড়ালটি চমকে তাকায় সুরঞ্জনের হাসির শব্দে। বেড়ালটি কি আজ ঢাকেশ্বরী মন্দির যায়নি? আচ্ছ এই বেড়ালের জাত কি? সে কি হিন্দু? হিন্দুর বাড়িতে যখন থাকে, হিন্দুই হবে বোধহয়। সাদা কালোয় মেশানো রঙ, নীল চোখদুটোয় মায়া, বেড়ালের চোখ থেকেও কি করুণা ঝরছে। তবে তো এটিও মুসলমান! নিশ্চয়ই মুক্তচিন্তার বিবেকবান মুসলমান, আজকাল ওরা আবার হিন্দুদের দিকে করুণ চোখে তাকায়। বেড়ালটি উঠে যায়। এ বাড়িতে চুলো জ্বলছে না খুব একটা, এরকম হতে পারে, বেড়ালটি পাশের মুসলমান বাড়ির রান্নাঘরে গিয়ে বসিল, বেড়ালটির তা হলে জাত নেই। জাত কেবল মানুষের আছে। মানুষেরই মন্দির মসজিদ আছে। সুরঞ্জন দেখে সিঁড়িতে রোদ এসে পড়েছে, বেলা অনেক হল, আজ ডিসেম্বরের না তারিখ, তার খুব বেড়াল হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। সারাজীবন সে পুজো করল না, মন্দিরে গেল না, দেশে সমাজতন্ত্র আনবে বলে পণ্য করুল, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াল, মিছিল করল, মিটিং-এ ভাল ভাল কথা বলল, কৃষকের কথা ভাবল, শ্রমিকের কথা ভাবল, দেশের সামাজিক অর্থনৈতিক উন্নতির কথা ভেবে ভেবে নিজের দিকে, সংসারের দিকে তাকাবার অবসরও পায়নি। আর এই সুরঞ্জনকে সবাই আঙুল তুলে বলছে সে হিন্দু : পাড়ার ছেলেরা তাকে ‘ধর ধর বলে ধ্বনি দেয়। আজ হয়ত ওরা ধরে মার দিচ্ছে না, কাল দেবে। গৌতম ডিম কিনতে গিয়ে মার খায়, সে মোড়ের মতির দোকানে সিগারেট কিনতে যাবে, পিঠে হঠাৎ পড়বে এসে প্রবল ঘুষি, ঠোঁট থেকে সিগারেটটি পড়ে যাবে তার, ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখবে কুদ্দুস, রহমান, বেলায়েত, সোবহান এরা সব দাঁড়িয়ে আছে। হাতে শক্ত লাঠি, ধারালো ছোরা। দৃশ্যটি ভাবতেই সুরঞ্জন চোখ বন্ধ করে ফেলে। গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। তবে সুরঞ্জনও কি ভয় পায়? সে তো ভয় পাওয়ার ছেলে নয়। বিছানা ছেড়ে সে উঠোনে বেড়ালটিকে খোঁজে। কী নিস্তব্ধ বাড়ি। মনে হয় কতকাল এই বাড়িতে কেউ থাকে না। একাত্তরে গ্রাম থেকে যখন ফিরে এসেছিল, ব্ৰাহ্মাপল্লীর বাড়িতে বড় বড় ঘাস গজিয়ে গিয়েছিল, থমথমে, গোটা বাড়িটায় একটি জিনিস নেই, তার লাটিম মার্বেল ঘুড়ি নাটাই ক্যারমবোর্ড দাবা বইপত্র কিছু নেই। খাঁ খাঁ করা বাড়িটিতে ঢুকে যেমন বুক কেঁপেছিল, সুরঞ্জনের তেমন বুক কাঁপে। সুধাময় কি সারাদিন শুয়ে থাকেন? প্রেসার যদি বাড়েই, ডাক্তার ডাকবে কে? বাজার করা, ওষুধ কেনা, মিস্ত্ৰি ভাকা, পত্রিকা রাখা এ ধরনের কোনও কাজই সুরঞ্জন কখনও করেনি। সে বাড়িতে তিনাবেল নয়ত দুবেলা খায়, রাত হলে বাড়ি ফেরে, বেশি রাতে হলো নিজের ঘরের দরজা বাইরে থেকে খুলে ঢোকা যায়, ঢোকে। টাকা পয়সার দরকার হলে কিরণময়ী নয় সুধাময়ের কাছে চেয়ে নেয়। টাকা চাইতে তার লজ্জাই হয়। তেত্রিশ বছর বয়স, এখনও কোনও উপার্জন নেই। সুধাময় বলেছিলেন–রিটায়ার করছি, তুই কিছু কর সুরঞ্জন।’ ‘আমার দ্বারা চাকরি-বাকরি করা হবে না।’ বলে সে কুটক্যামেলা এড়িয়ে গেছে। বাইরের ঘরে রোগী দেখে সংসার চালাচ্ছেন সুধাময়। রাত করে ঘরে ফিরেছে, পার্টি অফিসে, মধুর কেন্টিনে, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অফিসে, প্রেস ক্লাবে, বত্ৰিশ নম্বরে সারাদিন ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত সুরঞ্জন ঘরে ফিরেছে। ভাত ঢাকা থাকত টেবিলে, কোনও দিন খেয়ে, কোনও দিন না খেয়ে শুয়ে পড়েছে। দূরত্ব এভাবেই তৈরি হচ্ছিল সংসারের সঙ্গে তার, কিন্তু আজ যখন কিরণময়ী সকালের চা দিতে গিয়ে বসলেন তার বিছানায়, সুরঞ্জন অনুভব করেছে। তার মত উড়নচন্তীি উদাসীন দায়িত্বজ্ঞানহীন ছেলের ওপর এখনও বাবা মায়ের পরম নির্ভরতা। কি দিয়েছে। সে এই সংসারকে? এক সময়ের বিত্তবান সুধাময় ডাল-ভাত খেয়ে এখন তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। সুরঞ্জনও তোলে, তার মনে আছে ছোটবেলায় তাকে নাক চেপে ধরে দুধ গেলানো হত, মাখন না খেলে পিঠে মাির পড়ত, আর এখন যদি সে কিরুণাময়ীর কাছে আবদার করে আমার সেই খাঁটি দুধ চাই, ননী চাই, মাখন চাই; দুপুরে মাছ চাই মাংস চাই, ঘিয়ে ভাজা পরোটা চাই; সুধাময়ের ক্ষমতা হবে খাওয়াবার? অবশ্য প্রাচুর্য বা বিলাসিতার প্রতি সুরঞ্জনের কোনও আকর্ষণ জন্মায়নি। না জন্মাবার কারণ সুধাময়। সমান বয়সের বন্ধুরা যখন নতুন ডিজাইনের প্যাস্ট শার্ট বানাতো, সুধাময় তখন ছেলের জন্য কিনে আনতেন আইনস্টাইন, নিউটন, গ্যালিলিওর জীবনী, ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাস, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাহিনী, গোর্কি টলস্টয়ের গল্প। সুধাময় চাইতেন ছেলে তাঁর মানুষ হবে। আজ সকালে বেজাত বেড়ালটিকে খুঁজতে খুঁজতে তার নিজের কাছেই জানতে ইচ্ছে হল সে কি আন্দীে মানুষ হয়েছে? তার কোনও লোভ নেই, সম্পদ বা সম্পঞ্জির প্রতি মোহ নেই, নিজের স্বার্থের চেয়ে দশজুনের স্বার্থকেই বড় করে দেখে। এসবোকই কি মানুষ হওয়া বলে! সুরঞ্জন এলোমেলো হাঁটতে থাকে বারান্দায়। সুধাময় পত্রিকা পড়ছিলেন। ছেলের দিকে চোখ পড়তেই ডাকেন—সুরঞ্জন, শোন।
