কিরণময়ী নিঃশব্দে উঠে চলে যান। সুরঞ্জন বোঝে যে মানুষটি নিজের ভেতর এক জগত তৈরি করে নিয়েছিলেন, সংসারের বাইরে তিনি হাত পা বড় একটা বাড়ান না, তিনি পারভিনকে যে চোখে দেখেন, অৰ্চনাকেও সে চোখে—তিনিও খানিক টালমাটাল হলেন, তাঁরও প্রশ্ন জেগেছে মনে—রোগ অভিমান ক্ৰোধ কি কেবল মুসলমানদেরই আছে?
৩খ.
বাবরি মসজিদ আক্রান্ত হওয়ার পরই যে নব্বই-এর অক্টোবরে শুরু হয়েছে। এ দেশে হিন্দু নিযতন এবং মন্দির হামলা, তা নয়। সুরঞ্জনের মনে পড়ে উনআশির একুশে এপ্রিল সকালে রাজশাহী জেলা সদরে সাহেব বাজারের ঐতিহাসিক কালী মন্দিরের কালী মূর্তি আয়ুব আলি নামের এক লোক নিজ হাতে ভেঙে ফেলেছিল। মন্দির ভাঙবার পর হিন্দু মালিকদের দোকানও ভাঙে ৷
ওই বছরের ষোলই এপ্রিল ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার রামগোপাল পাড়ায় রামগোপাল মন্দিরের ঐতিহ্যবাহী রামগোপাল বিগ্রহ চুরি হয়। পরে শৈলকূপা শ্মশানের পাশে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় মূর্তিটি পাওয়া যায়। তবে বিগ্রহের সোনা রূপার অলঙ্কার পাওয়া যায়নি।
সীতাকুণ্ডের পূর্ণ লালানগর গ্রামের জয়গোপালহাট কালী মন্দির ভস্মীভূত করা হয়েছে। উত্তর চান্দগাঁও-এর কুরাইশ চান্দগাঁও দুগাবাড়ির বিগ্রহও ভেঙে ফেলা হয়েছে।
রাষ্ট্রধর্ম বিল পাশ হবার দু মাস পর খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামের পাশে পুরনো কালাচাঁদ মন্দিরের কষ্টিপাথরের মূর্তি আর তার গায়ের সোনার অলঙ্কার চুরি হয়। মন্দির কমিটির সম্পাদক ফুলতলা থানায় এজাহার করতে গেলে পুলিশ তাঁকেই গ্রেফতার করে, তাঁকেই শারীরিক নিযাতন করে। মন্দির কমিটির সকলের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। জেলার এ এস পি ওই এলাকার তদন্তে গিয়ে হিন্দুদের এই বলে হুমকি দেন যে হিন্দুরাই মন্দিরের বিগ্রহ চুরি করেছে।
টাঙাইল জেলার কালীহাতি উপজেলার দ্বিমুখা গ্রামের প্রাচীন মন্দির থেকে আটই ডিসেম্বর রাতে শ্বেতপাথরের শিব, রাধাগোবিন্দ, অন্নপূর্ণ মূর্তি ও শালগ্রাম শিলা চুরি হয়ে যায়। থানার লোক আসে, নূর মোহাম্মদ তালুকদার বিগ্রহ চুরি করেছে জানাবার পরও এটি উদ্ধারের কোনও ব্যবস্থা হয়নি।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি ইউনিয়নের হিন্দুদের উদ্দেশ্যে ‘বিশ্ব ইসলাম নামের একটি সংগঠন চিঠি দেয় যে হিন্দুরা যেন অবিলম্বে এ দেশ ছেড়ে চলে যায়। চিঠিতে হাঁশিয়ার করা হয় পুজো-আচ্চা বন্ধ না করলে দাঙ্গা হবে। চৌদ্দই এপ্রিল কালীবাড়ির মন্দিরের পাশের বটবৃক্ষে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। আলী আহমদ নামের এক লোক ময়নামতি বাজারে প্রচার করে যে এলাকার হিন্দুদের দাঙ্গার মাধ্যমে উৎখাত করতে হবে।
এগারোই মার্চ ভোলার লালমোহন উপজেলার শ্ৰী শ্ৰী মদনমোহন আখড়ায় নাম সংকীর্তন চলাকালে শতাধিক লোক মণ্ডপে হামলা চালায়। তারা মন্দিরে ঢুকে প্রতিমা ভাঙচুর করে, উপস্থিত ভক্তদের মারধোর করে। দত্তপাড়ার বিভিন্ন মন্দিরে ঢুকে প্রতিমা ভাঙচুর, লুটপাট, আর আগুন ধরানো খেলা খেলে।
মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার বড়টিয়া গ্রামে প্রায় একশ বছরের পুরনো শ্ৰী শ্ৰী কালীমাতার মন্দিরের পাশের জমিতে এডভোকেট জিলুর আহমদ কবরস্থান ও মসজিদ নিমাণের উদ্যোগ নেওয়ায় পুজো করার অন্তরায় হবে বলে আশঙ্কা করছে হিন্দুরা।, নোয়াখালি জেলার চাটখিল উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নে কালীরহাটে হিন্দুরা একটি মন্দিরে দীর্ঘদিন যাবৎ পূজাৰ্চনা করে আসছে। স্থানীয় মুসলমানেরা চক্রান্ত করে জোর করে মন্দিরটি উঠিয়ে দিয়ে সেখানে ব্যবসা শুরু করেছে।
গাজিপুর পৌরসভার ফাউকাল গ্রামের লক্ষ্মী মন্দিরের বিগ্রহ ছাবিবশে মে তারিখে গভীর রাতে ভেঙে ফেলে, বিগ্রহের মাথাটি নিয়েও যায়।
ঝিনাইদহ জেলার সদর উপজেলার কষ্টসাগর গ্রামের মঠবাড়িতে চৈত্র সংক্রান্তির রাতে চড়ক পূজো চলাকালে একদল লোক হামলা চালায়, পূজারীকে বেদম পেটায়, পূজার নৈবেদ্য তছনছ করে, ঢাক কেড়ে নেয়। মামলা দায়ের করবার পরও কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার নিজড় পূর্বপাড়ার কালীমন্দিরে উনআশির চৌদ্দই মার্চ রাত ন’টায় মুসলমানেরা হামলা করে মন্দিরের ক্ষতি করে। উলপুরের শিবমন্দিরের তালা ভেঙে শিবলিঙ্গ সহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরিও করে।
কুষ্টিয়া জেলা সদরে থানাপাড়ায় অষ্টআশির সতেরো অক্টোবর তারিখে দুৰ্গ প্রতিমা ভেঙে ফেলে।
খুলনা জেলা সদর পালের বাজারে পুজো শুরু হওয়ার আগে মুর্তিগুলো ভেঙে ফেলে ঝাজারের কজুন মুসলুমান লোক।
যশোর জেলার গোবরায় দুর্গ প্রতিমা ভেঙে ফেলা হয়।
অষ্টআশির পয়লা অক্টোবর খুলনা জেলার ঐতিহ্যবাহী শ্ৰী শ্ৰী প্রণবানন্দজী মহারাজের আশ্রমের দুর্গা প্রতিমা ভেঙে ফেলা হয়।
তিরিশে সেপ্টেম্বর তারিখে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পুজোমন্দিরের দুর্গ প্রতিমা ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়।
খুলনা ভুমুরিয়া উপজেলার মধুগ্রাম জামে মসজিদের ইমাম শারদীয় দুগোঁহাসকের আগে এলাকার সকল পুজো মণ্ডপে চিঠি লিখে জানিয়ে দেয় প্রতিবার আজান ও নামাজের জন্য পুজোর সব কিছু বন্ধ রাখতে হবে। চিঠিটি পেঁৗছয় সতেরো অক্টোবর তারিখে।
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে খুলনা জেলা শহরে সাম্প্রদায়িক শক্তির এক মিছিলে শ্লোগান ওঠে-মুর্তিপূজা চলবে না, ভেঙে দাও, ওঁড়িয়ে দাও।’
