—না। যেন একটি প্রশ্নের অপেক্ষাই তিনি করছিলেন। যেন সুরঞ্জন উচ্চারিত যে কোনও শব্দ নিয়ে তিনি দুকথা বলতে পারুেন। এমন দ্রুত উত্তর করে তিনি বিছানায় বসলেন। ছেলের নাগালের কাছেই। সুরঞ্জন অনুমান করে এত কাছে বসবার কারণ আসলে নিরাপত্তাহীনতার অস্থিরতা। কিরণময়ীর না ঘুমোনো চোখ, না আঁচড়ানো চুল, মলিন শাড়ি থেকে চোখ সরিয়ে নেয় সে। আধখানা পিঠ তুলে কাপটি হাতে নিয়ে চুমুক দেয়। ‘ও কেন ফিরছে না? মুসলমানরা তাকে বাঁচাচ্ছে বুঝি? আমাদের ওপর বিশ্বাস নেই? একবার খবরও নিচ্ছে না। এখানে আমরা কেমন আছি। শুধু নিজে বাঁচলেই চলবে।
কিরণময়ী চুপ হয়ে থাকেন। সুরঞ্জন চায়ের সঙ্গে একটি সিগারেট ধরায়। বাবা মা’র সামনে সে কখনও সিগারেট খায়নি, আজ যখন ফস করে ম্যাচের কাঠি জ্বালাল, সিগারেট ধরিয়ে মুখ ভরে ধোঁয়াও ছাড়ল, তার মনেও পড়ে না। সে কিরণময়ীর সামনে সিগারেট ফোঁকে না। যেন অন্য দিনগুলোর মত স্বাভাবিক দিন নয় এখন। এখন মা ছেলের যে দূরত্বটি রচিত ছিল তা ঘুচে গেছে। সূক্ষ্ম যে একটি দেওয়াল ছিল, তা ভেঙে যাচ্ছে। কতদিন সে একটি স্নেহকাঙািল হাত মায়ের কোলে রাখেনি। ছেলেরা বড় হয়ে গেলে কি মায়ের স্পর্শ থেকে এরকম দূরে সরে যেতে থাকে! সুরঞ্জনের ইচ্ছে করে অবোধ শিশুর মত কিরণময়ীর কোলে মাথা রেখে ছোটবেলার ঘুড়ি ওড়ানোর গল্প করুক, সেই যে সিলেট থেকে এক মামা আসত, নবীন মামা, নিজে হাতে ঘুড়ি তৈরি করত, আর ওড়ােতও চমৎকার। আকাশের আর সব ঘুড়িকে ভোকাট্টা করে দিয়ে দিব্যি সে উড়ে বেড়াত।
সুরঞ্জন মায়ের কোলটির দিকে তৃষ্ণাৰ্তা চোখে তাকায়। সিগারেটের শেষ ধোঁয়া ছেড়ে বলে–কাল কি কামাল, বেলাল বা অন্য কেউ এসেছিল?
কিরণময়ী স্নান কণ্ঠে বলেন–না।
কামাল একবার খোঁজও নিল না, অবাক লাগে বন্ধুরা কি ভাবছে। সুরঞ্জন মরে গেছে, নাকি ওকে বাঁচাবার আর ইচ্ছে নেই। কারও?
কিরণময়ী ধীরে, গলার স্বরটি বুজে আসে, বলেন–কাল তুই গেলি কোথায়? আমরা বাড়িতে দুজন মানুষ। কী হয় না হয় একটু কি ভাবিস না? আর তুই যে বাইরে চলে গেলি কিছু যদি হত? ও বাড়ির গীেতম দুপুরের দিকে পাড়ার দোকানো গিয়েছিল ডিম কিনতে, ওকে মুসলমান ছেলেরা মেরেছে। সামনের দুটো দাঁত ভেঙে গেছে। পায়ের হাঁড়ও নাকি ভেঙেছে।
–ও।
—মনে আছে। বছর দুই আগে শনির আখড়া থেকে গীতার মা আসত, ঘরবাড়ি ছিল না। পুড়িয়ে দিয়েছিল? গীতার মা এ বাড়ির কাজ ছেড়ে চলে গেল ভিটের ওপর নতুন করে ঘর তুলবে বলে। ঘর তুলেওছিল, এর ওর বাড়িতে কাজ করে টাকা জমিয়ে। সে এসেছিল ভোরে, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে। এবারও তার নতুন তোলা ঘর ছাই করে দিয়েছে। ভিটেয় কিছু নেই। আজ ভোরে এসে বলল, ‘বোঁদি, বিষ পাওয়া যায় কোন দোকানে? পাগল হয়ে গেছে মনে হয়।
—ও। সুরঞ্জন চায়ের কাপটি বালিশের পাশে রাখে।
—মায়া যে এ বাড়িতে আসবে, ওকে নিয়ে তো আরও দুশ্চিন্তা হবে রে।
—তাই বলে মুসলমানের ছাতার তলে তার সারাজীবন বাস করতে হবে নাকি?
সুরঞ্জনের কণ্ঠ কঠিন হয়ে ওঠে। সে-ও একবার বাড়ির সবাইকে নিয়ে কামালের বাড়ি গিয়েছিল, তখন মুসলমানের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে বলে এরকম গ্লানি হয়নি, মনে হয়েছে কিছু দুষ্ট লোক দুষ্টোমি করছে, কেটে যাবে, সব দেশেই তো এরকম দুষ্ট লোক থাকে। এখন ওরকম মনে হয় না। এখন কিছু দুষ্ট লোকের দুষ্টেমি মনে হয় না এসব। আরও বড় কোনও গভীর কোনও ষড়যন্ত্র বলে সন্দেহ হয়। হ্যাঁ সন্দেহই হয় বৈকি। সুরঞ্জনের এখন বিশ্বাস হতে চায় না কামাল বেলাল কায়সার লুৎফর এরা কেউ অসাম্প্রদায়িক লোক। আটাত্তরে জনগণ কি সংবিধানে বিসমিল্লাহ বসাবার আন্দোলন করেছিল যে জিয়াউর রহমানের সরকার বিসমিল্লাহ বসােল? অষ্টআশিতে জনগণ কি ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করবার জন্য কেঁদেছিল যে এরশাদ সরকার ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করল? কেন করল? সেকুলারিজমে নাকি বাঙালি মুসলমানের অগাধ বিশ্বাস, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির! কই, তারা তো রাষ্ট্র কাঠামোয় সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ বপন করা দেখেও তেমন ক্ষুব্ধ হয়নি? ক্ষুব্ধ হলে কী না হয়! এত বড় একটি যুদ্ধ ঘটিয়ে দিতে পারে যে দেশের রক্ত-গরম মানুষ, সে দেশের মানুষ আজ সাপের মত শীতল কেন? কেন তারা সাম্প্রদায়িকতার চারাগাছকে সমুলে উৎপাটন করবার তাগিদ অনুভব করছে না? কেন তারা এমন একটি অসম্ভব ভাবনা ভাববার সাহস পায় যে ধর্মনিরপেক্ষতা ছাড়া দেশে গণতন্ত্র আসবে বা এসেছে? এ ভাবনা তো তারাই ভাবছে, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিই? প্রগতিশীল আন্দোলনে যুক্ত মানুষেরাই?
—কাল সোয়ারিঘাট মন্দির ভেঙে ফেলেছে শুনেছিস? শ্যামপুর মন্দিরও?
কিরণময়ী করুণ কণ্ঠে বলেন। সুরঞ্জন আড়মোড়া ভাঙে। বলে—তুমি কি মন্দিরে যেতে কখনও, যে মন্দির ভাঙলে কষ্ট হচ্ছে? ভাঙুক না, ক্ষতি কি? ওঁড়ো হয়ে যাক এইসব ধর্মের দালানকোঠা।
—মসজিদ ভাঙলে ওদের রাগ হয়, মন্দির ভাঙলে যে হিন্দুদের রাগ হয় এটা কি ওরা জানে না? নাকি বোঝে না? একটা মসজিদের জন্য ওরা শ’য়ে শ’য়ে মন্দির ভাঙছে। ইসলাম না শান্তির ধর্ম?
—এ দেশের হিন্দুরা যে রাগ করে কিছুই করতে পারবে না তা মুসলমানরা ভাল জানে। তাই তারা করছে। কেউ হাত দিতে পেরেছে একটি মসজিদে? নয়াবাজারের মন্দিরটা দু বছর থেকে ভেঙে পড়ে আছে। বাচ্চারা ওর ওপর উঠে নাচে, পেচ্ছাব করে। কোনও হিন্দুর শক্তি আছে মসজিদের ঝকঝকে দেওয়ালে দুটো কিল বসায়?
