পজিরপুর, গৌরনদী সহ সর্বহারা পার্টির সদস্যদের গ্রেফতারের নামে সংখ্যালঘুদের নির্যাতন চালানো হয়। আর গ্রেফতারের পর উৎকোচের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশি অত্যাচারের ভয়ে ওই এলাকার অনেক হিন্দু পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আগৈলঝরা উপেজলার কাশীনাথ হালনার পুলিশের নির্তিনের শিকার হয়ে প্রার মরা হয়ে পড়ে পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলায় দীঘ ইউনিয়নের নাওটানা গ্রামের কেশব সাধু তাঁর একমাত্র পুত্রকে সর্বহারা পার্টির সঙ্গে জড়িত থাকবার মিথ্যে অভিযোগে পুলিশ এমন পেটায় যে দেখে তিনি হার্টফেইল করেন।
নরসিংদী জেলার রায়পুর উপজেলার চরমধুয়া ইউনিয়নের চরমধুয়া গ্রামে শাহাবুদ্দিন ও আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে সত্তর-আশিজনের একটি দল সূত্ৰধর পাড়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলা চালায়, লুটপাট করে। বিশটি পরিবারের প্রায় দেড়শ সদস্য গ্রাম ছেড়ে উদ্বাস্তুর জীবন কাটাচ্ছে।
নেত্রকোণা জেলার মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর গ্রামে ষোলই মে তারিখে মৌলবাদী একটি দল সংখ্যালঘু নেতা বিনয় বৈশ্যের বাড়িতে হামলা চালায়। বিনয়বাবুর পরিবারের সদস্যদের ছত্রিশ ঘণ্টা আটকে রেখে লোকেরা লুটপাট করে। থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ এসে উল্টে বিনয়বাবুর দুই ছেলেকেই ধরে নিয়ে যায়। অবশ্য পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
বাকেরগঞ্জ চাঁদপুর ইউনিয়নের দুৰ্গপুর গ্রামে দশই ডিসেম্বর তারিখে স্থানীয় ইউ পি সদস্য গোলাম হোসেন পিন্টুর নেতৃত্বে প্রায় একশ মত লোক রাজেন্দ্ৰ চন্দ্র দাসের বাড়িতে হামলা চালায়, লুটপাট করে, বাড়ির লোকদের মারধোর করে, শেষে বাড়িতে লাগিয়ে দেয়। কোতয়ালি থানায় রাজেন্দ্ৰ চন্দ্রের পক্ষ থেকে মামলা করা হলে এরা আবার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পরিবারের সদস্যর প্রাণনাশের হুমকি দেয়। উপজেলায় মামলা করা হলে পুলিশ নীরব থাকে।
নোয়াখালি জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার মিরওয়ারিশপুর গ্রামের দীনেশ চন্দ্ৰ দাস-এর সম্পত্তি কিছু লোক জোর করে ভোগ দখল করছে।
সুরঞ্জনের ঘুম আসে না। একতা পত্রিকায় দু বছর কাজ করেছিল সুরঞ্জন। অষ্ট আশি উনশির দিকে। রিপোটিং-এর কাজ করতে হত তার, সারাদেশ দৌড়োতে হত। এইসব নিপীড়নের সংবাদ তার ঝোলা বোঝাই হয়ে থাকত। কিছু ছাপা হত, কিছু হত না। সম্পাদক বলতেন, ‘বুঝলে হে সুরঞ্জন, এসব হচ্ছে দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার।, দরিদ্রের ওপর ধনীর অত্যাচার। তুমি যদি ধনী হও, তুমি হিন্দু কী মুসলমান সেটা ফ্যাক্টর নয়, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার তো এরকমই নিয়ম। দেখা গিয়ে দরিদ্র মুসলমানদের একই অবস্থা। ধনীরা, সে হিন্দু হোক মুসলমান হোক, দরিদ্রকে শোষণ করছে।‘
লজ্জা (০৩) শীতটা তেমন জমিয়ে নামছে না
৩ক.
শীতটা কি তেমন জমিয়ে নামছে না? সুরঞ্জন গা থেকে লেপ সরিয়ে দেয়। সকাল হয়েছে অনেকক্ষণ। বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করে না। কাল রাতে সে সারা শহর ঘুরেছে। কারও বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করেনি, কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করেনি। একা একা হেঁটেছে। বাড়িতে বাবা মা দুশ্চিন্তা করছেন এরকম ভাবনাও তার হয়েছে। কিন্তু ইচ্ছে করেনি ফিরতে .। ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা কিরণময়ীর মুখ দেখতে তার নিজেরই ভয় হয়। সুধাময়ও কেমন ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে থাকেন। সুরঞ্জনের ইচ্ছে করে কোথাও বসে মদ খেতে। খেতে খেতে যেন সে ভুলতে পারে মায়ার মায়াবতী চোখ, সেই চোখে থোকা থোকা নীলাভ ভয় নিয়ে সে ‘দাদা দাদা’ বলে ডেকেছিল সুরঞ্জনকে। তাঁর তরী করে বড় হয়ে গেল মেয়েটি। সেদিনের মেয়েটি, দাদার আঙুল ধরে নদী দেখতে যেত। শ্যামলা সুন্দর মেয়ে, পুজো এলে আবদার করবেই, জামা কিনে দাও। সুরঞ্জন বলত পুজো-ফুজো বাদ দে তো। মাটির মূর্তি গড়ে অসভ্যগুলো নাচবে আর তুই নতুন জামা পরবি, ছিঃ! তোকে আর মানুষ করা গেল না।
মায়া আদুরে গলায় বলত—দাদা, পুজো দেখতে যাব, নেবে? সুরঞ্জন ধমক লাগাত। বলত-মানুষ হা। মানুষ হ। হিন্দু হোস নে।
মায়া খিলখিল করে হাসত। বলত-কেন হিন্দুরা কি মানুষ নয়!
মায়াকে ফরিদা বলে ডাকা হত একাত্তরে। বাহাত্তরেও হঠাৎ হঠাৎ মুখ ফসকে ‘ফরিদা’ নাম বেরিয়ে যেত সুরঞ্জনের। মায়া গাল ফুলিয়ে রাগ করত। ওর রাগ ভাঙাতে সুরঞ্জন মোড়ের দোকান থেকে চকলেট কিনে দিত। চকলেট পেয়ে ও কী যে খুশি হত, ফোলা গলে চকলেট পুরলে মায়ার মায়াবতী চোখ দুটো খুশিতে হাসত। মুসলমান বান্ধবীদের দেখে ঈদ এলেই রঙিন বেলুনের আবদার করত ছোটবেলায়, পটকা ফাটাবে, তারাবাতি জ্বলবে, কিরণময়ীর শাড়ির আঁচল ধরে ঘুর ঘুর করত ‘আজ নাদিরাদের বাড়িতে পোলাও মাংস রান্না হবে, আমিও পোলাও খাব।‘ কিরণময়ী পোলাও রাঁধতেন।
মায়া পরশু সকালে গেছে, আজও তার কোনও খবর নেই। ওকে নিয়ে বাবা মার দুশ্চিন্তাও নেই। মুসলমানের বাড়িতে অন্তত বেঁচে তো থাকতে পারবে। এই বয়সে দুটাে টিউশনি করে সে। ইডেন কলেজে পড়ে, পড়ালেখার খরচ বাড়ি থেকে নেয় না বলতে গেলে। সুরঞ্জনেরই কেবল হাত পাততে হয়। চাকরি-বাকরি করা হল না কিছুই। ফিজিক্সে মাস্টার ডিগ্রি নিয়ে বসে আছে। প্রথম প্রথম চাকরি করবার ইচ্ছে কিছু ছিল। ইন্টারভিউও দিয়েছিল। কোথাও কোথাও। ইউনিভার্সিটির তুখোড় ছাত্র সে, অথচ যে ছাত্ররা তার কাছে পড়া বুঝতে আসত, ওরাই ফাইনালে গিয়ে তার চেয়ে নম্বর বেশি। পেল। আর চাকরির বেলায়ও ঘটনা একই। শিক্ষকের চাকরি তার চেয়ে নম্বর কম। পাওয়া ছেলেদের ভাগ্যে জুটল। এদিক ওদিক ইন্টারভিউ দিয়েছে সে, ইন্টারভিউয়াররা কাত করতে পারেনি তাকে এতটুকু। অথচ বোর্ড থেকে বেরিয়ে যে ছেলেরা চুক চুক দুঃখ করত যে তেমন ভাল হয়নি ভাইবা, সুরঞ্জন আশ্চর্য হত যে ওরাই কী করে ফেন এপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়ে যেত, সুরঞ্জন পেত না। দু-একটি বোর্ডে কথা উঠেছে, সুরঞ্জন আদিবাকায়দা জানে না, এগজামিনারদের সে সালাম দেয় না। আসলে আসসালামু আলায়কুম, আদাব বা নমস্কারই যে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একমাত্র পদ্ধতি, এ কথাই সে মানে না। আসসালামু আলায়কুম বলে যে ছেলে গদগদ ভঙ্গিতে কথা বলে সে বোর্ড থেকে বেরিয়ে পরীক্ষকদের ‘শুয়োরের বাচ্চা” বলে গাল দেয়, সেই ছেলেকেই লোকে ভদ্র বলে জানে, সে-ই হয়ত টিকে যায় ইন্টারভিউয়ে। আর যে সুরঞ্জন আসসালামু আলায়কুম বলে না, সে কিন্তু কোনও দিন গাল দেয়নি শিক্ষকদের। অথচ লোকের কাছে সুরঞ্জন বেয়াদব ছেলে হিসেবে নাম কমিয়েছে, নাম না বলে দুনামও বলা যায়। কী জানি সে কারণেই কিনা নাকি সে হিন্দু বলেই কিনা কোনও সরকারি চাকরি তার হয়নি। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ পেয়েছিল, তিন মাস করবার পর ভাল লাগেনি। ছেড়ে দিয়েছে। সেইদিক থেকে মায়া বেশ মানিয়ে নিয়েছে, দিব্যি টিউশনি করে। চাকরিও নাকি কোন এক এন জি ও-তে করবে। ঠিক হয়েছে। সুরঞ্জনের সন্দেহ হয়। এইসব সুবিধেগুলো তাকে জাহাঙ্গীর নামের ছেলেটিই করে দিচ্ছে। মায়া কি কৃতজ্ঞতা দেখাতে গিয়ে ছেলেটিকে বিয়েই করে ফেলবে শেষ পর্যন্ত? আশঙ্কার খড়কুটাে তার বুকের মধ্যে বাবুই পাখির বাসার মত বাসা বাঁধতে চায়। এককাপ চা নিয়ে সামনে দাঁড়ােন কিরণময়ী। চোখের কোল ফোলা, সুরঞ্জন বোঝে রাতে ঘুম হয়নি তাঁর। তারও যে ঘুম হয়নি এ কথা সে বুঝতে দিতে চায় না। হাই তুলে বলে-“এত বেলা হয়ে গেল টেরও পাইনি।” যেন ভাল ঘুম হওয়ার কারণে সে টের পায়নি। টের পেলে অন্যদিনের মত খুব ভোরে উঠে সে হাঁটতে যেত। জগিং করত। কিরণময়ী চা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। টেবিলে রেখে যে চলে যাবেন, তাও করেন না। সুরঞ্জন অনুমান করে কিছু বলবেন কিরণময়ী। কিন্তু কোনও শব্দ তিনি উচ্চারণ করেন না, যেন ছেলে তার হাত বাড়িয়ে কাপটি নেবে। এরই অপেক্ষা করছেন। তিনি। দুজনের মধ্যে কত যোজন দূরত্ব নির্মাণ হলে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে ঠায়, নির্বাক, সুরঞ্জন বোঝে; সে নিজেই কথা পাড়ে–মায়া কি আজও ফেরেনি?
