সেটা তো আগেই জিজ্ঞেস করেছি।
হং কী বলেছে?
বলেছে, বাবা তোমার সঙ্গে আছে।
কথা বলবে বাবার সঙ্গে?
না। আমি এখন ঘুমাব।
বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছ না কেন?
হং নিষেধ করেছে।
কেন নিষেধ করেছে?
হং বলেছে, আমি যদি অনেক দিন বাবার সঙ্গে কথা না বলি তা হলেই জন্মদিনে বাবা আমাকে দেখতে আসবে। কথা বললে আসবে না। আমি এখন আর তোমার সঙ্গে কথা বলব না। আমি ঘুমাব।
জগলু ভাই এখন বসে আছেন। মুখে জ্বলন্ত সিগারেট। আমি জগলু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, আর রাত করে লাভ কী? চলে যান।
জগলু ভাই বললেন, ভূতের বাচ্চার ব্যাপারটা কী?
আমি বললাম, কোনো ব্যাপারই না। একটা সবুজ বোতলে আমি কিছু সিগারেটের ধোয়া ভরে দিয়ে দিয়েছি।
ভূতের বাচ্চা কথা বলছে, এই রহস্যটা কী?
শিশুমনের কল্পনা। এর বেশি কিছু না।
আমি যে তোমার সঙ্গে আছি সেটা কীভাবে বলল?
কাকতালীয় ব্যাপার। লেগে গেছে। জগৎসংসারে কাকতালীয়া ব্যাপার ঘটে। ভালোমতো চিন্তা করে দেখুন, আপনার জীবনেও অনেকবার ঘটেছে।
জগলু ভাই উঠে দাঁড়ালেন। আমি বললাম, সুটকেস, ফেলে যাচ্ছেন।
জগলু ভাই বললেন, এত রাতে টাকা নিয়ে বের হব না। থাকুক তোমার কাছে। পরে একসময় এসে নিয়ে যাবে।
আমি বললাম, তা হলে একটা কাজ করি, সুটকেসটা নিরাপদে থাকে এমন একটা জায়গায় রেখে দেই। আবার মনসুর সাহেবের কাছে দিয়ে আসি?
জগলু ভাইয়ের ঠোঁটে এই প্রথম সামান্য হাসির আভাস দেখলাম। তিনি হ্যাঁ-না কিছুই বললেন না।
আমি বললাম, শুভ্ৰ কেমন আছে?
জগলু ভাই বললেন, শুভ্ৰ কেমন আছে আমাকে জিজ্ঞেস করছি কেন?
আপনাকে জিজ্ঞেস করছি। কারণ আমার ধারণা। আপনি তার খোঁজ খবর নেন।
শুভ্ৰ ভাল আছে।
আমি বললাম, জগলু ভাই আমার ধারণা আপনার সঙ্গে এই আমার শেষ দেখা। আপনি কি ঐ ধাঁধার উত্তরটা জানতে চান। ঐ যে কোন সে প্রাণী খাদ্য গ্ৰহণ করে না…।
উত্তর জানতে চাই না। উত্তর আমি নিজে নিজে বের করব।
সহজ লাইনে চিন্তা করবেন জগলু ভাই। সমস্যা যত জটিল তার সমাধান তত সহজ। অতি জটিল যে জীবন তার ব্যাখ্যা সেই কারণেই অতি সহজ।
ব্যাখ্যা কি?
আপনি এই ধাঁধাটার জবাবও নিজেই বের করুন। আপনি দীর্ঘ সময় জেগে থাকবেন ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করার সুযোগ পাবেন।
মিতুরা কানাডায় চলে যাবে
মিতুরা কানাডায় চলে যাবে। আমি শেষ দেখা করতে গেছি। মিতু আমাকে দেখেই বলল, একা এসেছেন? না ঠেলাগাড়িতে নতুন কোনো ডেডবডি আছে?
আমি বললাম, একা।
মিতু বলল, এখন আর আপনাকে একা মানায় না। দুএকটা ডেড বডি সঙ্গে না থাকলে আপনি কিসের হিমু?
মিতুকে খুব আনন্দিত লাগছে। তার আনন্দের কারণটা ধরতে পারছি না। আমার ক্ষীণ সন্দেহ হল সে আমাকে দেখেই আনন্দিত।
তারপর হিমু সাহেব এসেছেন কি জন্যে? টাকার ব্যাগ নিয়ে যেতে?
হুঁ।
আমিও তাই ভাবছিলাম। আমাদের বিদায় দিতে আসার মানুষ আপনি না। আপনার দরকার টাকা। সুটকেস এখনি দিয়ে দেব না-কি আগে এক কাপ চা খাবেন?
চা খেতে পারি।
আপনার অসীম দয়া। আমার মত অভাজনের সঙ্গে চা খেতে রাজি হয়েছেন। নিজের সৌভাগ্যে নিজেরই ঈর্ষা হচ্ছে।
তোমরা যাচ্ছি কবে?
পরশু সকালে।
তাহলে বাংলাদেশ বিদায়?
হ্যাঁ বাংলাদেশ বিদায়। দেশ নিয়ে আপনারা থাকুন। ভাল কথা তিন মিনিট একা বসে থাকতে পারবেন? আপনার চা-টা আমি নিজের হাতে বানাবো।
কেন?
আমার ইচ্ছা।
তোমার বাবা কোথায়?
জানি না কোথায়। ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন তো–দম ফেলার সময় পাচ্ছেন না।
মিতু চা এনে সামনে বসল। আমি এক চুমুকে চা শেষ করে বললাম, উঠি?
মিতু তাকিয়ে আছে কিছু বলছে না। আমার ব্যবহারে সে যে প্রচণ্ড আহত হয়েছে সেটা বুঝতে পারছি। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, টাকার সুটকেস নিয়ে যান।
আমি বললাম, স্যুটকেসের দরকার নেই।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। মিতু বলল, আপনি বসুন। আপনি যেতে পারবেন না। বসুন বললাম।
আমি বসলাম।
মিতু বলল, এখন বাজে এগারোটা। আপনি দুপুর পর্যন্ত থাকবেন এবং দুপুরে আমার সঙ্গে ভাত খাবেন।
আমার জরুরি কাজ ছিল মিতু।
আপনার কোনো জরুরি কাজ নেই। বেকার মানুষদের জরুরি কাজ থাকে না। বেকাররা যা করে তা হল জরুরি কাজের ভান করে–ঘোরাঘুরি।
দুপুরে কী খাওয়াবে?
আপনি যা খেতে চাইবেন তা-ই খাওয়াব। তাই বলে উদ্ভট কিছু চাইলে তো খাওয়াতে পারব না। এখন আপনি যদি ময়ূরের মাংসের কাবাব আর হরিণের কলিজা ভূনা খেতে চান তাহলে পারব না। বলুন কী খাবেন? সহজ কিছু খেতে চান যেন আমি নিজে হাতে রোধে আপনাকে খাওয়াতে পারি।
পোলাউর চালের ভাত। ঘন ডাল। দেশী মুরগীর ডিমের ঝোল, কই মাছ ভাজা, ইলিশ মাছের ডিমের ভূনা। সঙ্গে থাকবে। আমের আচার। খাওয়ার শেষে বগুড়ার দৈ।
মিতু হাসছে। সে হাসতে হাসতেই বলল, আপনার ভাব-ভঙ্গি দেখে কখনো মনে হয় না। আপনি কোনদিন বিয়ে করবেন। যদি কখনও বিয়ে করতে ইচ্ছা হয় আমাকে জানাবেন। আমি একটা মেয়ে দেখে রেখেছি সে আপনার জন্যে পার্ফেক্ট হবে। রূপবতী মেয়ে, শুধু রূপবতীই না, বুদ্ধিমতীও। মেয়েটার প্রচুর টাকা। আপনার মত ভ্যাগবণ্ডের এরকম বউই দরকার।
আমি বললাম, মেয়েটার চিবুকে কি তিল আছে?
মিতু তার চিবুকের তিল বাঁ হাতে ঢেকে সহজ গলায় বলল, হ্যাঁ আছে। খুব বেহায়ার মতই কথাটা বললাম। আপনার কি মেয়ে পছন্দ হয়েছে?
আমি বললাম, অবশ্যই পছন্দ হয়েছে। চল যাই।
মিতু বলল, চল যাই মানে? কোথায় যাই?
