আমি চোখ না মেলেই বললাম, জগলু ভাই, কখন এসেছেন?
চেয়ারে বসে-থাকা মানুষটা জবাব দিল না। তবে সিগারেট ধরাল। তামাকের গন্ধ পেলাম।
তোমার ঘর সবসময় খোলা থাকে?
জি।
আমার জিনিস কোথায়?
আমি উঠে বসতে বসতে বললাম, সুটকেসের কথা বলছেন? চৌকির নিচে আছে। হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিন।
পাঁচিশ লক্ষ টাকাভিরতি সুটকেস, তুমি চৌকির নিচে রেখে দিয়েছ। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ পর্যন্ত করনি। এটা আমাকে বিশ্বাস করতে বলছ?
হ্যাঁ, বলছি। যা চলে যাবার সেটা যাবেই। হাজার চেষ্টা করেও ধরে রাখা যাবে না। মনসুর সাহেব তার টাকা পয়সা ব্যাংকে রাখেন। তার পরও সেখান থেকে পঁচিশ লক্ষ টাকা বের হয়ে গেল না?
টাকা ঠিকঠাক আছে?
আছে বলেই তো মনে হয়। আমি গুনে দেখিনি। বাতি জ্বালাই, গুনে দেখুন।
বাতি জ্বালাতে হবে না।
আপনি মেসে ঢুকেছেন কীভাবে? কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি?
দারোয়ান জিজ্ঞেস করেছিল কোথায় যাব।–তোমার কথা বলেছি, দরজা খুলে দিয়েছে।
আপনি কি একা এসেছেন?
একা আসি নাই। আমি একা ঘোরাফেরা করি না।
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, আমরা পৃথিবীতে আসি একা, পৃথিবী থেকে ফেরত যাই একা, কিন্তু পৃথিবীতে ঘোরাফিরা করি অনেককে নিয়ে।
এই ধরনের সস্তা ফিলসফি আমার সঙ্গে কপচাবে না। এইসব থার্ড রেট কথাবার্তা আমি জানি।
বাতিটা জ্বালাই, জাগলু ভাই। মুখ দেখতে পাচ্ছি না বলে কথা বলে আরাম পাচ্ছি না। তা ছাড়া সুটকেসের টাকাও আমাদের গোনা দরকার। পঞ্চাশটা পঞ্চাশ হাজার টাকার বান্ডিল থাকার কথা।
জগলু ভাই কিছু বললেন না। আমি বাতি জ্বালালাম। সুটকেস খুলে টাকার বান্ডিল গুনলাম। জগলু ভাই কোনো কথা বলছেন না। তিনি তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। টাকার পরিমাণ ঠিক আছে কি না, এই বিষয়ে তার কোনো আগ্রহ দেখা গেল না।
হিমু!
জি জাগলু ভাই?
তোমার সম্পর্কে আমি কিছু খোঁজখবর নিয়েছি। তোমাদের মেসের দারোয়ানকেও জিজ্ঞেস করলাম। বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, তুমি সাধুসন্ন্যাসী টাইপ কেউ। তুমি নাকি ভবিষ্যৎ বলতে পার। আমার ভবিষ্যৎ কী বলো দেখি।
আমি কয়েক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে রাখলাম। তারপর চোখ খুলে বড় করে নিশ্বাস নিয়ে বললাম, আপনি পুলিশের হাতে ধরা পড়বেন। তারপর ফাঁসিতে ঝুলবেন।
জগলু ভাই বিরক্ত গলায় বললেন, আমি যে ফাঁসিতে ঝুলাব এটা বলার জন্য সাধু-সন্ন্যাসী, পীর-ফকির হওয়া লাগে না। যে-কেউ বুদ্ধিমান মানুষ বলতে পারবে যে, আমাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে।
আমি বললাম, কবে ধরা পড়বেন সেটা কিন্তু যে-কোনো মানুষ বলতে পারবে না।
তুমি বলতে পারবে?
অবশ্যই।
কবে?
সেপ্টেম্বরের এগারো তারিখ।
জগলু ভাই হতভম্ব গলায় বললেন, সেপ্টেম্বরের এগারো তারিখ?
আমি বললাম, জি। আপনার ছেলের জন্মদিন।
ছেলের জন্মদিন করতে গিয়ে আমি পুলিশের হাতে ধরা খাব?
জি।
এত সহজ হিসাব?
জি, হিসাব সহজ।
জগলু ভাই হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে নতুন আরেকটি ধারালেন। চেয়ার টেনে আমার দিকে খানিকটা বুকে এলেন। গুছিয়ে কোনো কথা বলার প্রস্তুতি। বেশির ভাগ মানুষই গুছিয়ে কথা বলার সময় শ্রোতার দিকে খানিকটা এগিয়ে আসে।
হিমু, আমাকে তোমার কী মনে হয়? বোকা না বুদ্ধিমান?
বুদ্ধিমান।
কীরকম বুদ্ধিমান?
আপনার বুদ্ধি বেশ ভালো।
একজন বুদ্ধিমান মানুষ, যে জানে তার ছেলেকে সবসময় পুলিশ নজরে রাখছে, সে কি তার ছেলেকে দেখতে যাবে?
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, বড় বোকামিগুলি বুদ্ধিমান মানুষরাই করে।
জগলু ভাই সুটকেস-হাতে উঠে দাঁড়ালেন। আমি বালিশের নিচ থেকে মোবাইল সেট বের করে উনার দিকে এগিয়ে দিলাম। জগলু ভাই বললেন, এটা তুমি রেখে দাও। এটা তোমার গিফট।
আমি বললাম, গিফট আমি নেই না, জগলু ভাই। গিফট নেয়া আমার ওস্তাদের নিষেধ আছে।
কে তোমার ওস্তাদ?
আমার বাবা। তিনি বলে গিয়েছেন, হিমালয়, কাউকে কিছু দিবি না, কারো কাছ থেকে কিছু নিবিও না। নিজেকে সবরকম দেয়া-নেয়ার বাইরে রাখবি। উপহার দেয়া-নেয়া, প্ৰেম দেয়া-নেয়া কিংবা স্নেহ-মমতা দেয়ানেয়া কোনোকিছুর মধ্যেই থাকবি না।
জগলু ভাই মোবাইল টেলিফোন হাতে নিলেন। প্যান্টের পকেটে রাখলেন আর তখনই মোবাইল বেজে উঠল। আমি বললাম, জগলু ভাই, আপনার ছেলে টেলিফোন করেছে। সে প্রায়ই গভীর রাতে টেলিফোন করে। দেখি, শেষবারের মতো তার সঙ্গে কথা বলি।
জগলু ভাই বললেন, আমি যে এখানে আছি সেটা বলবে না। খবরদার!
হ্যালো, হিমু চাচু!
হ্যালো, বাবু।
কেমন আছ, হিমু চাচু?
ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?
আমিও ভালো আছি। হিমু চাচু, তুমি কী করছ?
তোমার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছি।
আমিও তোমার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছি। হি হি হি।
জগলু ভাই আমার কানের কাছে তার মাথা নিয়ে এসেছেন। কী কথাবার্তা হয় শুনতে চাচ্ছেন। মোবাইল-নামক যন্ত্রের ভলুম বাড়ানোর ব্যবস্থা আছে। কাজটা কীভাবে করা হয় আমি জানি না। জানলে ভলু্যম বাড়িয়ে দিতাম, তাতে জগলু ভাইয়ের সুবিধা হতো। ছেলের প্রতিটি কথা পরিষ্কার শুনতে পেতেন।
হিমু চাচু!
বলো, শুনছি।
আমাকে তুমি যে ভূতের বাচ্চাটা দিয়েছ তার নাম হলো হং।
তুমি নাম দিয়েছ?
না। ও আমাকে বলেছে।
তোমার সঙ্গে কি ওর কথা হয়?
হয়। রোজ রাতে সে কথা বলে।
কী কথা বলে?
অনেক কথা বলে। বাবার কথা বলে।
বাবার কথা কী বলে?
বাবা কোথায় আছে, কী করছে—এইসব বলে।
ভূতের বাচ্চাটাকে জিজ্ঞেস করো তো এখন তোমার বাবা কোথায় আছে।
