আমরা রোয়াইলবাড়ি পৌছিলাম সন্ধ্যাবেলা। পরিকল্পনা ছিল ঘণ্টাখানেকের মধ্যে দাফন-কাফন শেষ করে ঢাকার দিকে রওনা হব। নানান ক্যাচাল শুরু হয়ে গেল। জাগ্ৰত জনতা আমাদের ঘিরে ধরল। জাগ্ৰত জনতার মুখপাত্ৰ জামে মসজিদের পেশ ইমাম মওলানা তাহেরউদ্দিন জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন। তাঁর বক্তব্য, অতি দুষ্ট সন্ত্রাসীর কবর রোয়াইলবাড়িতে হবে না।
জাগ্ৰত জনতাকে কখনো কিছু বোঝানো যায় না। তাদেরকে কিছু বলা বৃথা। আমরা সেখান থেকে রওনা হলাম মতি মিয়ার মামার বাড়ি বাল্লা গ্রাম। এই গ্রাম যেহেতু অতি প্রত্যন্ত অঞ্চলে, সেখানে জাগ্ৰত জনতার দেখা পাবার কথা না।
দেখা গেল আমার অনুমান ভুল। বাল্লা গ্রামের জনতা আরো বেশি জাগ্রত। তাদের মূর্তি আরো উগ্ৰ। বাল্লা গ্রামের জাগ্ৰত জনতার মুখপাত্র জনৈক হিন্দু মেম্বার। তার নাম যাদব।
যাদববাবু চোখ-মুখ লাল করে বললেন, আপনাদের বিবেচনা দেখে অদ্ভুত হয়েছি। এমন এক খুনিকে আমাদের গ্রামে নিয়ে এসেছেন!
আমি বললাম, এখন তো সে আর খুন করতে পারবে না। কবরে ঢুকায়ে দেবেন। শরীর পচে-গলে যাবে।
অসম্ভব! অসম্ভব! আপনারা যদি এক্ষণ বিদায় না হন, অসুবিধা আছে।
কী অসুবিধা?
সেটা মুখে বলব না। কাজে দেখবেন।
আমি জগলু ভাইকে টেলিফোন করলাম। জানতে চাইলাম কী করণীয়। জগলু ভাই শান্ত গলায় বললেন, লাশ ফেলে চলে আসো।
কোথায় ফেলে আসবে?
যেখানে ইচ্ছা ফেলে আসো।
বলেই জগলু ভাই টেলিফোন অফ করে দিলেন। বাদল আমার দিকে তাকিয়ে হাসি–হাসি মুখে বলল, খুবই মজা লাগছে। গুড অ্যাডভেঞ্চার। ডেড বডি নিয়ে ঘুরছি। কবর দেয়ার জায়গা পাচ্ছি না। সো ইন্টারেস্টিং। সো ম্যাচ ফান—
দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী আঙুল-কাটা জগলু ভাইয়ের ডানহাত মতি মিয়ার ডেডবডি নিয়ে আমরা মোটামুটি ভালো ঝামেলাতেই পড়ে গেলাম। রাত একটা থেকে শুরু হয়েছে বৃষ্টি। এমন বৃষ্টি যে দুই হাত সামনে কী হচ্ছে দেখা যায় না। আমরা ঢাকার দিকে ফিরে আসছি। শেষ চেষ্টা হিসেবে আজিমপুর গোরস্তানে ট্রাই করব এরকম পরিকল্পনা।
নিশিরাতে সাধারণ শব্দও কানো অন্যরকম শোনায়। গাড়ির চাকার শব্দ, বাতাসের শব্দ এবং বৃষ্টির শব্দ—সব মিলেমিশে একাকার হয়ে কেমন ভৌতিক আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। মাঝেমধ্যেই মনে হচ্ছে সাদা চাদরে মুড়ি দেওয়া মতি মিয়া কাশছে। বুড়ো মানুষের খকখক কাশির মতো কাশি।
বাদল চমকে উঠে বলল, ভাইজান, কে কাশে?
মাইক্রোবাসের ড্রাইভার নিয়ামত আলি চাপাগলায় বলল, আয়াতুল কুরসি পড়েন। আইজ আমরার খবর আছে।
বাদল আমার কাছে ঘেঁষে এসে ফিসফিস করে বলল, মতি মিয়া কাশছে নাকি?
আমি উদাস গলায় বললাম, বুঝতে পারছি না। ঠাণ্ডা লেগে কাশিরোগ হতে পারে। তবে লাশদের ঠাণ্ডা লাগে এ-রকম আগে শুনি নাই।
বাদল বলল, চলো, আমরা উনাদের পাজেরো গাড়িতে চলে যাই।
নিয়ামত বলল, আপনেরা পাজেরো গাড়িতে যাইবেন আর আমি একলা থাকুম এইখানে? ভূতের থাপ্পড় একা খামু? মাফ চাই!
বলতে বলতে ব্রেক চেপে সে গাড়ি থামিয়ে দিল। মনসুর সাহেবের গাড়ি অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। সেটাও ফিরে এল। মনসুর সাহেব গাড়ির উইন্ডোগ্লাস নামিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, কী হয়েছে?
আমাদের ড্রাইভার বলল, লাশ জিন্দা হয়ে গেছে। কাশতেছে।
মনসুর সাহেব বললেন, কি বল এইসব?
বাদল সঙ্গে সঙ্গে বলল, ঘটনা সত্য। একবার হাঁচি দিয়েছে, আমি স্পষ্ট শুনেছি।
নিয়ামত আলি বলল, সে ভুতে-পাওয়া লাশ নিয়ে যাবে না। লাশ এইখানে নামিয়ে দিতে হবে। লাশ নামানোর সময়ও সে হাত দিয়ে ধরবে क†|।
উনি চুপ করে রইলেন। মিতু বলল, সব ঝামেলা। আপনি তৈরি করেছেন। কী করা যায় সেটাও আপনি ঠিক করবেন।
আমি বললাম, তুমি আমার অবস্থায় হলে কী করতে?
মিতু বলল, আপনার অবস্থা আমার কখনো হতো না।
লাশ এখানে ফেলে রেখে যাব কি না, সেটা বলো।
আপনার যা ইচ্ছা করুন, আমি আর পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করব; তারপর বাবাকে নিয়ে চলে যাব।
নিয়ামত আলি বলল, বাহাসের সময় নাই। এই জিনিস রাস্তার ধারে ফেলায়া আমরা চইল্যা যাব। সোজা কথা। সোজা হিসাব।
মৃত মানুষের ওজন বাড়ে কথাটা সত্যি। হালকা-পাতলা মতি মিয়াকে নড়ানোই মুশকিল। টানাটানির কাজ আমাকেই করতে হচ্ছে। কেউ ধরবে না। বাদলও না। মনসুর সাহেব পাঁচ-ব্যাটারির একটা টর্চ জ্বালিয়ে ধরে আছেন।
নিয়ামত আলি শেষ কথা বলে দিয়েছে, তাকে এক লাখ টাকা দিলেও সে লাশ হাত দিয়ে ধরবে না। দুই লাখ দিলেও না।
অনেক ঝামেলা করে ডেডবডি নামালাম এবং কাদায় পা হড়কে গড়িয়ে পানিভরতি গর্তে পড়ে গেলাম। লাশের গা থেকে কাপড় খুলে গেছে। তার বীভৎস মুখ বের হয়ে আছে। লাশের চোখের পাতা রিগর মটিস হবার আগেই বন্ধ করতে হয়, নয়তো লাশ বিকট ভঙ্গিতে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে। মতি মিয়ার চোখ কেউ বন্ধ করেনি বলে তার চোখ ভয়ঙ্কর ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে।
তাকে নিয়ে পানিতে নামার পর একটা ঘটনা ঘটল। ডেডবডি পানিতে ভেসে উঠল। এমনভাবে ভাসল, যেন সে বসে আছে এবং আমাদের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ছে। চারদিকেই ঘন শালবন। বাতাস লেগে গাছের পাতায় শিসের মতো শব্দ হলো। সবার কাছে মনে হলো মাথা দোলাতে দোলাতে মতি মিয়া শিস দিচ্ছে।
মিতু আতঙ্কিত গলায় বলল, হিমু সাহেব, আপনি এখনো গর্তে বসে আছেন কেন? উঠে আসুন তো! আমি আপনার পায়ে পড়ি। প্লিজ উঠে আসুন।
