মনসুর সাহেব আমাকেও বসতে ইশারা করলেন। আমি ধাপ করে বসে পড়লাম। মিতু অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাচ্ছে। সম্ভবত বোঝার চেষ্টা করছে, কেন তার বাবা আমাকে বসতে বলল। মিতু কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, তখনই আমার মোবাইল বাজল। আমি বোতাম টেপার আগেই বুঝতে পারলাম টেলিফোন করেছেন জগলু ভাই। আমি লক্ষ করেছি, বেশির ভাগ সময়ই রিং শুনে বোঝা যায় টেলিফোন কে করেছে। ব্যাপারটা কী কে জানে!
হিমু?
জি, জগলু ভাই! ভালো আছেন?
তুমি কোথায়?
মনসুর সাহেবের বাসায়। মাল ডেলিভারি নিতে এসেছি।
পেয়েছে?
জি, পেয়েছি।
দশ মিনিটের মধ্যে চলে আসে।
কোথায় চলে আসব?
রমনা পার্কে। ওইদিন যেখানে বসেছিলে সেখানে। আমার লোক থাকবে।
জগলু ভাই! একটু যে দেরি হবে! চার ঘণ্টা ধরে রাখেন। তার বেশিও লগতে পারে।
কেন দেরি হবে?
আমার সঙ্গে আছে মতি মিয়ার ডেড়বড়ি। হাসপাতাল থেকে রিলিজ করিয়েছি। দাফন-কাফনের সময় লাগবে। এখান থেকে আজিমপুর গোরস্তানে যেতেই লাগবে দুই ঘণ্টা। ঠেলাগাড়িতে করে যাওয়া, বুঝতেই পারেন।
তোমার সঙ্গে মতি মিয়ার ডেডবিড?
জি।
সত্যি কথা বলছ?
জি।
জগলু ভাই চুপ করে আছেন। ঘটনা হজম করতে সময় লাগছে। সময় লাগার কথা।
হিমু!
জি ওস্তাদ?
মতি সব সময় বলত, মারা গেলে তার ডেডবাড়ি যেন গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তার বাবার পাশে যেন তার কবর হয়। তার বাড়ি নেত্রকোনা জেলা, থানার নাম কেন্দুয়া, গ্রাম রোয়াইলবাড়ি। একটা মাইক্রোবাসে করে ডেড বডি নিয়ে যাও। পারবে না?
অবশ্যই পারব। আপনারা কেউ যাবেন?
না।
মাইক্রোবাসের ভাড়া কোত্থেকে দেব?
সুটকেসের টাকা নিয়ে খরচ করো।
ওই টাকাটা ভাঙতে ইচ্ছা করছে না। আপনি বরং একটা কাজ করুন, মনসুর সাহেবকে বলুন, তিনি যেন তাঁর একটা গাড়ি দেন। উনি আমার সামনেই আছেন। নিন কথা বলুন।
আমি হতভম্ব মনসুর সাহেবের হাতে টেলিফোন ধরিয়ে দিয়ে মিতুর দিকে তাকিয়ে মধুর ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বললাম, আরেক কাপ কফি খাওয়াবে? ঘরের কফি এবং চটপটি কখনো দোকানের মতো হয় না। তোমাদের কফি দোকানের চেয়েও ভালো।
মিতু অগ্নিদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনসুর সাহেবও তাকিয়ে আছেন। ওনার সঙ্গে জগলু ভাইয়ের কী কথা হয়েছে জানি না। তবে মনসুর সাহেবের দৃষ্টিতে কোনো উত্তাপ নেই। মনসুর সাহেব ক্লান্ত গলায় বললেন, হিমু শোনো। ডেড়বডি ক্যারি করার মতো গাড়ি আমার কাছে নেই। তবে আমি গাড়ি ভাড়া করে দিচ্ছি। আরেকটা কথা, তোমার অসুবিধা না হলে আমিও তোমার সঙ্গে যেতে চাই।
মিতু প্ৰায় চেঁচিয়ে বলল, কেন?
মনসুর সাহেব বললেন, আমি জানি না কেন যেতে চাচ্ছি। কিন্তু যেতে যে চাচ্ছি। এতে ভুল নেই।
বাবা, আমাদের ফ্লাইট বিকাল তিনটায়।
মনসুর সাহেব গভীর গলায় বললেন, ফ্লাইট ক্যানসেল করা কোনো ব্যাপার না।
দুটি গাড়ি নিয়ে আমাদেয় যাত্রা শুরু হয়েছে। গন্তব্য নেত্রকোনো, থানা কেন্দুয়া, গ্রাম রোয়াইলবাড়ি। প্রথম গাড়িতে (বিশাল পাজেরো টাইপ গাড়ি) আছেন। মনসুর সাহেব এবং তার কন্যা মিতু। তাদের পেছনে পেছনে মাইক্রোবাসে করে আমি। আমার সঙ্গে বাদল। বাদলকে খবর দিয়েছিলাম, সে মহাউৎসাহে ছুটে এসেছে। আমরা দুজন বসেছি। ড্রাইভারের পাশে। ড্রাইভারে নাম নেয়ামত আলি। হাসিখুশি তরুণ। লাশের গাড়ির ড্রাইভার হবে বয়স্ক, বিষগ্নমুখের কেউ। নেয়ামত আলির মধ্যে বিষন্নতার ছিটাফোঁটা নেই। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, সে বরযাত্রী নিয়ে যাচ্ছে। গাজীপুর চৌরাস্তা পার হওয়ার পরই সে বলল, স্যার, গান দিব?
আমি বললাম, কী গান দেবে?
সব ধরনের গান আছে—ইংলিশ, হিন্দি, ড্যান্স মিউজিক।
ড্যান্স মিউজিক দাও।
নেয়ামত আলি বলল, পতাকা নামায়ে মিউজিক দিতে হবে।
কী পতাকা?
লাল পতাকা। যে-গাড়িতে লাশ যায়, সেই গাড়িতে লাল পতাকা দিতে হয়। আমার গাড়িতেও আছে। মিনিস্টারের গাড়িতে যেমন পতাকা থাকে, লাশের গাড়িতেও থাকে। লাশ হইল গিয়া মিনিস্টার।
নেয়ামত রাস্তার পাশে গাড়ি পার্ক করে পতাকা খুলে ফেলে ড্যান্স মিউজিক দিয়ে দিল। ঝা ঝুমঝুম ঝা ঝুমঝুম মিউজিক। আমি বাদলের দিকে তাকিয়ে বললাম, কেমন বুঝছিস?
বাদল সবগুলি দাঁত বের করে বলল, খুবই ভালো।
মজা পাচ্ছিস তো?
অবশ্যই। তোমার সঙ্গে যে-যেনো জায়গায় যাওয়ার মধ্যেই মজা আছে।
খালুসাহেব কি জানেন, তুই আমার সঙ্গে?
না।
তাঁকে জানানো দরকার। রাতে-রাতে আমরা ফিরতে পারব বলে মনে হয় না। উনি পরে টেনশান করবেন।
বাদল উদাস গলায় বলল, জানাতে হলে তুমি জানাও। আমি কথা বলব না।
আমি খালুসাহেবকে টেলিফোন করলাম। খালুসাহেব টেলিফোন ধরেই বললেন, হিমু, বাদল কোথায়?
আমি বললাম, আমার পাশেই বসে আছে।
তোমার পাশে বসা?
জি, খালুসাহেব।
খালুসাহেব থমথমে গলায় বললেন, সে কেন তোমার পাশে বসে আছে, সেটা কি জানতে পারি?
আমি মধুর ভঙ্গিতে বললাম, আমরা একটা ডেডবডি নিয়ে নেত্রকোনার দিকে রওনা হয়েছি খালুসাহেব।
কী বললে, আবার বলো।
আমি আর বাদল একটা ডেড বডি নিয়ে নেত্রকোনা যাচ্ছি।
কী নিয়ে নেত্রকোনা যাচ্ছ?
ডেডবডি। পত্রিকায় পড়েছেন নিশ্চয়ই, কুখ্যাত সন্ত্রাসী মতি মিয়া ক্রসফায়ারে মারা গেছে। তার ডেড বডি নিয়ে যাত্রা করেছি। খালুসাহেব, আমাদের জন্য একটু দোয়া রাখবেন। আপনি কি বাদলের সঙ্গে কথা বলবেন?
খালু সাহেব স্পষ্ট স্বরে বললেন, না। বলেই টেলিফোন অফ করে দিলেন।
