বাবু অবাক হয়ে বলল, কামড়াৰে কেন? এটা তো খেলনা বান্দর। ভেতরে তুলা ভরা।
আমি তার মতোই অবাক হয়ে বললাম, সত্যি খেলনা?
বাবু বলল, হ্যা। হাতে নিয়ে দেখুন।
আমি বললাম, কোনো দরকার নেই, তুমি হাতে নিয়ে বসে থাকো। বান্দরের কামড় খাওয়ার আমার কোনো শখ নেই।
আপনাকে বললাম না, এটা খেলনা!
খেলনা হলে ভালো কথা। তুমি কি কিছুক্ষণ এই জন্তুটাকে চাদর দিয়ে ঢেকে রাখবে?
আপনার ভয় লাগছে?
হুঁ। আপনি ভীতু?
আমি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললাম, বাবা রে, আমি ভীতু না, কিন্তু জন্তু-জানোয়ার আমি পছন্দ করি না। তুমি দয়া করে এটাকে চাদরের নিচে ঢোকাও।
পৃথিবীর সব শিশু বয়স্ক ভীতু মানুষ দেখতে পছন্দ করে। বাবুও পছন্দ করল। সে তার খেলনা বাঁদর চাদরের নিচে লুকিয়ে ফেলল। আমি বললাম, লেজটা বের হয়ে আছে। লেজটাও ঢোকাও।
বাবু চাদরের নিচে লেজ ঢুকাতে ঢুকাতে আনন্দিত গলায় বলল, আপনি এত ভীতু!
আমি বললাম, পৃথিবীতে সাহসী মানুষ যেমন থাকে, ভীতু মানুষও থাকে। বুঝেছি?
বাবু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। তার চোখে আনন্দ ঝলমল করছে। আমি বললাম, তুমি কি আমাকে চিনেছ?
না।
সেকী! তোমার সঙ্গে আমার অনেকবার টেলিফোনে কথা হয়েছে। আমি তোমার হিমু চাচা।
এখন চিনেছি। বাবা কোথায়?
তোমার বাবা কোথায় তা তো জানি না। তোমার বাবা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিল একটা ভূতের বাচ্চা যোগাড় করার। বাচ্চা যোগাড় হয়েছে। ছেলে-বাচ্চা পাওয়া যায়নি। মেয়ে–বাচ্চা।
কোথায়?
সঙ্গেই আছে। চাদর দিয়ে ঢেকে রেখেছি। এরা আলো সহ্য করতে পারে না।
আমার কাছে দিন তো!
এখন দেওয়া যাবে না। তোমার জন্মদিনে তোমার বাবা তোমার হাতে দেবেন। আমি শুধু স্যাম্পল দেখাতে এনেছি। তোমার পছন্দ হয় কি না, জানা দরকার। তুমি চেয়েছিলে ছেলে-ভূতের বাচ্চা। এটা মেয়ে।
কই, একটু দেখান না!
জানালা বন্ধ করতে হবে। এত আলোতে বের করা যাবে না। কাউকে বলো দরজা-জানালা বন্ধ করতে।
বাবু চিৎকার করে ডাকল, ফুপু। বড় ফুপু।
মধ্যবয়স্ক এক মহিলা ঢুকলেন। চোখভরতি সন্দেহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, জগলু ভাই আমাকে পাঠিয়েছেন।
আমার কথায় ভদ্রমহিলার চোখের সন্দেহ দূর হলো না। তিনি শীতল গলায় বললেন, আপনি এই ঘরে ঢুকলেন কীভাবে?
আমি বললাম, দরজা খোলা ছিল, ঢুকে পড়েছি।
দরজা তো কখনো খোলা থাকে না।
আজ ছিল। ছিল বলেই তো ঢুকেছি। আপনি কি দয়া করে এই ঘরের জানালাগুলো একটু বন্ধ করবেন?
কেন?
বাবুর জন্য একটা উপহার এনেছি। তাকে দেব। উপহারটা এমন যে আলোতে দেখানো যায় না।
কী উপহার?
একটা ভূতের বাচ্চা।
ভদ্রমহিলার চোখের সন্দেহ আরো ঘনীভূত হলো। তিনি তাকালেন বাবুর দিকে। বাবু বলল, উনাকে ছেলে-ভূতের বাচ্চা আনতে বলেছিলাম, উনি এনেছেন মেয়ে-ভূতের বাচ্চা।
ভদ্রমহিলা বললেন, কী এনেছেন দেখান।
আমি বললাম, দেখান বললেই তো আর দেখানো যায় না। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করতে হবে। তা ছাড়া আপনার সামনে আমি এই জিনিস বেরও করব না। ভূতের বাচ্চারা ভীতু প্রকৃতির হয়। আপনাকে দেখে ভয় পেতে পারে।
বাবু বলল, ফুপু, তুমি দরজা-জানালা বন্ধ করে চলে যাও তো!
আমি হাসিমুখে বললাম, ভূতের বাচ্চা তো এই বাড়িতেই থাকবে। বাবু যদি পরে আপনাকে দেখাতে চায়, আপনি দেখবেন। আপনাকে এই মুহুর্তেই যে দেখতে হবে তা তো না।
চাদরের আড়াল থেকে আমি সবুজ রঙের চ্যাপটা একটা বোতল বের করলাম। বোতলের মুখ সিলগালা দিয়ে বন্ধ করা। বোতলের ভেতর দুটি মারবেল। ভালো করে তাকালে ধোয়াটে কিছু একটা দেখা যায়। আমি বললাম, ধোঁয়া-ধোঁয়া জিনিসটি ভূত। কাচের গোল জিনিস দুটি চেন?
না।
এদের বলে মারবেল। ভূতের বাচ্চাটা যেন খেলতে পারে, এইজন্য মারবেল দিয়ে দেওয়া।
ওর নাম কী?
নাম জানি না, তুমি জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়ো।
কথা বলে?
ছোটদের সঙ্গে বলে। বড়দের সঙ্গে বলে না।
কী খায়?
এখন চাঁদের আলো খায়। আরেকটু বড় হলে মোমবাতির আলো, কুপির আলো, হারিকেনের আলো এইসব খাবে।
কীভাবে খায়?
বোতলাটা চাঁদের আলোতে কিছুক্ষণ রেখে দিলেই তার খাওয়া হয়ে যাবে।
এর মা-বাবা কোথায়?
কোথায় তা তো জানি না। তুমি জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়ো।
এখন জিজ্ঞেস করব?
এখন জিজ্ঞেস না করাই ভালো। আমি সামনে আছি তো, জবাব দেবে। না। আমাকে পছন্দ করে না।
কোন পছন্দ করে না?
এটাকে আমি ধরে এনেছি। তো, এইজন্যই আমাকে পছন্দ করে না। তোমাকে কেউ যদি ধরে নিয়ে ভূতদের কাছে দিয়ে আসত, তুমি তাকে পছন্দ করতে?
না।
এখন বোতলাটা দাও, আমি এটা নিয়ে চলে যাই।
না, আমি বোতল দেব না।
তুমি ছেলে-ভূত চেয়েছিলে, এটা তো মেয়ে…।
বাবু গম্ভীর গলায় বলল, আমি বোতল দেব না।
সে বোতল চাদরের নিচে লুকিয়ে ফেলল। বাবু সম্পর্কে যেসব তথ্য জানলাম তা হলো, বাবুর মা মারা গেছে তার এক বছর বয়সে। বাবুর দুই ফুপু তাকে পালাক্রমে লালনপালন করেন। এখন দায়িত্বে আছেন বড় ফুপু, যার নাম রোখসানা। বাবুর অসুখ ধরা পড়েছে তিন বছর বয়সে। এই অসুখে রক্তের লোহিত কণিকা তৈরি কমে যায়। যেগুলো তৈরি হয় সেগুলো থাকে ভাঙা-ভাঙা। অসুখের একটাই চিকিৎসা বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট। সেই চিকিৎসা এক দফা করা হয়েছে। কাজ হয়নি। দ্বিতীয় দফা চিকিৎসার প্রস্তুতি চলছে। সেটা কখন শুরু হবে কেউ জানে না। বাবুর সঙ্গে তার বাবার দেখা হয় না বললেই চলে। গত ছয় মাসে পিতা-পুত্রের কোনো দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। ছেলেটা তার বাবার জন্য সবসময় অপেক্ষা করে। থাকে। তার খাটের এক পাশে সে বাবার জন্য দুটো বালিশ দিয়ে রাখে। তার ধারণা, কোনো-এক রাতে ঘুম ভেঙে সে দেখবে, বাবা তার পাশে শুয়ে আছে।
