পাব।
মাঝে মাঝে ভয় পাওয়া ভাল। ভয় পেলে শরীরের সব যন্ত্রপাতি ঝাকুনির মত খায়। শরীর ভাল থাকে। যারা সব সময় ভয়ের মধ্যে থাকে তাদের শরীর ভাল থাকে।
এই বলে আমি জগলু ভাইয়ের দিকে তাকালাম। জগলু ভাই বললেন, একটা বাচা ছেলেকে একা রেখে বাবা চিটাগাং চলে গেছে। এটা কেমন কথা?
আমি বললাম, বাবু নামের আরেকটা ছেলেকে ফেলে রেখে বাবা সারা ঢাকা শহর ঘুরছে কিন্তু ছেলেটার সঙ্গে দেখা করছে না; এটাই বাঁ কেমন কথা?
বাবুর অবস্থার সঙ্গে এই ছেলের অবস্থা মেলাবে না। বাবুর সঙ্গে অনেকেই আছে। But this boy is all by himself.
শুভ্ৰ এখন স্বাভাবিক হয়েছে। আমার দিকে তাকিয়েছে। মিটমিট করে হাসছে। আমি বললাম, তোর বাপ তোকে ফেলে চলে গেল কেন? তোকে নিয়ে গেল না কেন?
শুভ্র বলল, বাবা যদি বাসে করে কিংবা ট্রেনে করে যেত তাহলে তো আমাকে নিয়েই যেত। বাবা গেছে বড় স্যারের সঙ্গে বিমানে। সেখানে আমাকে কিভাবে নেবে। বাবা কি বড় স্যারকে বলকে— আমার ছেলেটাকে সঙ্গে নেই?
আমি বললাম, তা ঠিক।
শুভ্র বলল, হিমু চাচু তুমি কি কখনো বিমানে চড়েছ?
আমি বললাম, না। আমি উড়াউড়ির মধ্যে নাই।
শুভ্ৰ জগলু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, চাচু আপনি কখনো বিমানে চড়েছেন?
জগলু ভাই শুভ্রের প্রশ্নে হঠাৎ কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলেন। হয়ত তিনি ভাবতেই পারেন নি এত আন্তরিক ভঙ্গিতে অপরিচিত একটা ছেলে তাকে প্রশ্ন করবে। তিনি থতমত খেয়ে বললেন, তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছ?
শুভ্র বলল, জ্বি।
জগলু বলল, আমি অনেকবার চড়েছি।
চাচু আপনি ভয় পান নি।
প্রথমবার যখন চড়েছি তখন খুবই ভয় পেয়েছিলাম। আমার সঙ্গে ছিল আমার স্ত্রী রেনু…
জগলু ভাইয়ের কথার মাঝখানে শুভ্র বলল, চাচু আপনি চোখ থেকে সানগ্নাস খুলেন। আমি আপনার চোখ দেখতে পারছি না।
জগলু ভাই সানগ্লাস খুললেন। শুভ্রের পাশে চৌকিতে এসে বসলেন। তাঁর ভাব-ভঙ্গিতেই বুঝছি। তিনি দীর্ঘ গল্প শুরু করবেন। আমি বললাম, জগলু ভাই আমাদের একটা কাজ ছিল না? সুটকেস উদ্ধার করা?
আরেক দিন উদ্ধার হবে।
আপনি কতক্ষণ থাকবেন। এখানে?
থাকব কিছুক্ষণ।
আমার একটা কাজ ছিল যে।
কাজ থাকলে চলে যাও। তোমাকে তো আমি শিকল দিয়ে বেঁধে রাখি নি।
তাহলে একটা সিগারেট দিন। সিগারেট টানতে টানতে চলে যাই।
জগলু ভাই বললেন, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির মধ্যে সিগারেট টানতে পারবে না। এখানে সিগারেট শেষ করে তারপর যাও।
আমি সিগারেট ধরালাম। জগলু ভাই গল্প শুরু করলেন। শুভ্ৰ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। জগলু ভাই হাত নেড়ে গল্প শুরু করেছেন— জমাটি গল্প— আমি তখন থার্ড ইয়ার অনার্সের ছাত্ৰ–চারমাস পরে ফাইনাল পরীক্ষা। এর মধ্যে বিয়ে করে— বিরাট ঝামেলায় পড়েছি।
শুভ্ৰ বলল, ঝামেলায় পড়েছেন কেন?
মেয়ের বাবা-মাকে কিছু না জানিয়ে বিয়ে। তারা আমার নামে একটা মামলাও করে দিয়েছেন। আমি না-কি জোর-জবরদস্তি করে তাদের মেয়েকে আটকে রেখেছি। পুলিশ আমাকে খুঁজছে। আমি তখন ঠিক
শুভ্ৰ কথার মাঝখানে আবার প্রশ্ন করল, চাচু গল্প শুরু করার আগে বলুন পুলিশ কি শেষ পর্যন্ত আপনাকে ধরতে পেরেছিল।
হুঁ। কক্সবাজারে এক হোটেলে ধরে। আমাকে এবং তোমার চাচীকে।
কী ভয়ংকর!
ভয়ংকর তো বটেই। থানা-পুলিশ-হাজত। আমাকে কোর্টে চালান করে দিল। সেখানে আরেক নাটক। তোমার চাচী বাবা-মা আত্মীয়-স্বজনের চাপে পড়ে বলে বাসল, এই লোককে আমি চিনি না। সে আমাকে জোর করে ধরে নিয়ে গেছে। তোমার চাচীর কথা শুনে আমি অজ্ঞান হয়ে কাঠগড়ায় পড়ে গেলাম।
শুভ্র বলল, চাচা আমি এই গল্পটা আগে শুনব।
জগলু ভাই বললেন, ঠিক আছে— এইটাই আগে। বলেই তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? চলে যাও। তোমার সঙ্গে রাতে কথা হবে।
গভীর রাতে জগলু ভাই টেলিফোন করলেন। আমি তখন নিজের বিছানায় শোবার আয়োজন করছি। বৃষ্টি চলছেই। সন্ধ্যার দিকে একটু থেমেছিল— সন্ধ্যার পর থেকে প্রবল বর্ষণ এবং দমকা বাতাস। ঢাকা শহরে ইলেকট্রিসিটিও নেই। মেইন ইলেকট্রিক গ্ৰীড নাকি ফেল করেছে।
গাঢ় অন্ধকারে চাদরের নিচ থেকে টেলিফোনে কথা বলার ভাল মজা আছে। আমি জগলু ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে মজা পাচ্ছি।
হ্যালো হিমু!
ইয়েস জগলু ভাই। আপনি কোথায়?
আমি শুভ্রের বাসায়।
বলেন কি? আটকা পরে গেছেন।
আটকা পরার তো কিছু নাই। এমন ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে একটা বাচ্চা ছেলেকে এটা ফেলে রেখে আমি যাই কিভাবে?
সেটাও কথা। রাতে কি এখানেই থাকবেন?
এ ছাড়া আমার কি অন্য কোনো বিকল্প আছে? ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। ইলেকট্রিসিটি নেই। বাচ্চা একটা ছেলে।
আপনাদের খাওয়া-দাওয়া হয়েছে?
হ্যাঁ হয়েছে। নিজেরাই রাধলাম। ডিম ছিল, ডাল ছিল। ডিম, ডাল, চাল মিশিয়ে খিচুরি টাইপ একটা বস্তু তৈরী করেছি। খেতে ভাল হয়েছে।
আপনি রাঁধলেন।
হ্যাঁ আমি; শুভ্র ছিল আমার এসিস্টেন্ট।
শুভ্র কি জেগে আছে, না ঘুমুচ্ছে?
ঘুমাচ্ছে। মজার একটা কথা শোন হিমু যেই আমি ছেলেটাকে বললাম, এত রাতে তোমাকে একা ফেলে। আমি যাব না। ওমি সে কি করল যান? ঝাঁপ দিয়ে আমার গায়ে এসে পড়ল। আমি প্রস্তুত ছিলাম না। হুড়মুড়ে করে চৌকি থেকে নিচে পড়ে গেলাম। হা হা হা।
জগলু ভাইয়ের ছেলে বাবু
জগলু ভাইয়ের ছেলে বাবু ও আমি মুখোমুখি বসে আছি। ছেলেটির বয়স চার কিংবা পাচ। বড় বড় চোখ। কোনো কথা বলার আগে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। গরমের মধ্যেও তাকে ফুলহাতা শার্ট পরানো হয়েছে। সে খাটের মাথার দিকে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে। তার হাতে লম্বালেজের একটা খেলনা বান্দর। বান্দরটার চোেখও তার মতোই বড় বড়। আমি তাকিয়ে আছি বোদরটার দিকে। একসময় ভয়ে ভয়ে বললাম, তোমার এই বাঁেদরটা কি কামড়ায়?
