রানির বুক টিবি টিব করিতেছিল। হয়তো তাহারই ঠিক-কতদিন আর ভুলিয়া থাকিতে পারে!
কাজল খাম খুলিয়া চিঠিটা বাহির করিয়া প্ৰথমে যেন চোখে ধোঁয়া দেখিল। কিছু বুঝিতে পারিল না প্রথমটা। খুব চেনা, খুব পরিচিত হস্তাক্ষর, এ নিশ্চয়ই-। পরীক্ষণেই রানির হৃৎস্পন্দনকে দ্রুতায়িত করিয়া মুখ তুলিয়া সে বলিল–বাবা দিয়েচে-বাবার চিঠি পিসি। এই দ্যাখো, বাবার হাতের লেখা।
উত্তেজনায় সে হাঁপাইতেছিল।
একটু পরেই রানি দেখিল, সে আর কাজল দুজনেই অঝোরধারে কাঁদিতেছে।
অপু রানিকে লিখিয়াছে—
‘ফিজি থেকে আফ্রিকায় এসেছি। কখন কোথায় ঘুরছি কিছু ঠিক নেই। ফিজিতে একটা মিশনারী স্কুলে মাস্টারি করলাম কিছুদিন। অ্যাশবার্টন সাহেবই সব ঠিক করে দিয়েছিল। জীবনটাকে যেমন করে দেখতে চেয়েছিলাম-ঠিক তেমনি করেই দেখছি রানুদি। কোথাও ধাক্কা খেলাম না। আশ্চর্য একটা অসীমত্বের সন্ধান পেয়ে গেছি। মনে হয় যেন সময় অফুরন্ত–তা ফুরিয়ে যাবে না কোনদিন। জীবনও তাই বাঁধনহারা, অসীম। মহাকাল এত বিশাল-তার আঁচলটুকুই এত বড়ো যে সেই বিশালতাকে অনুভব করা বহু দূরের কথা, ধারণাটাকে কল্পনায় আনতেই মানুষের যুগযুগান্ত কেটে যাবে। এই জীবনকে-ত্রিকালকে বুকের পাঁজরে পাঁজরে ব্যথায়-বেদনায়, আনন্দে-উল্লাসে, স্বপ্নে-জাগরণে প্রতিক্ষণে অনুভব করছি। আমার আর ভয় কী রানুদি? এখন মনে হচ্ছে, ভক্তি ভাবটা শুধু মেয়েদেরই একচেট নয়-আমার মনেও একটা ভক্তির ভাব জেগে উঠেছে। এ ঠিক ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি নয়। বর্তমানের ক্ষুদ্র গণ্ডী পেরিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতে রহস্যের প্রদোষালোকে আলোকিত পরিসরে বিস্তৃত যে মহাজীবন-তার প্রতি ভক্তি। এ যেন কিছুটা নিজেরই প্রতি ভক্তি। নিজেকে, বিশেষ করে নিজের জীবনকে জানিবার অদম্য স্পৃহায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। এখন মনে হচ্ছে যেন তা ছাড়িয়ে আরও বেশি কিছু জেনে ফেলেছি। কিন্তু সে কথা প্ৰকাশ করা যায় না। রানুদি-সে বোধ ভাষার অতীত। সে সকল জানার জানা-এক অনির্বাচনীয় পরম পাওয়া।’
কাজলকে লিখিয়াছে—
তোমার জন্যই হয়তো আমাকে ফিরে আসতে হবে। কতদিন ফিজিতে সমুদ্রের তীরে বসে আশ্চর্য সূর্যস্ত দেখতে দেখতে তোমার কথা ভেবেছি। তুমি আমার প্রাণের অংশ দিয়ে তৈরি স্বপ্ন, বাবা। চেষ্টা করছি তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে। তুমি পিসির কথা শুনে চলো তো? বেশি রাতে বেরুবে না। নদীর ধারে বেশি যেয়ে না। আমার যে ফার্স্ট বুকটা আছে–সেটা মনোযোগ দিয়ে পড়বে। এখানে অনেক মজার মজার জিনিস দেখছি।-ফিরে তোমাকে গল্প বলবো। তোমাকে বড়ো দেখতে ইচ্ছে করে। আমার জন্য তোমার মন খারাপ হয় না?’
বাবার জন্য তাহার মন খারাপ হয় কিনা! এমন দিন কবে গিয়াছে যে, সকাল হইতে রাত্রির মধ্যে সে বাবার কথা ভাবে নাই? বরং বাবাই তো তাহাকে ফেলিয়া বেশ থাকিতে পারিতেছে। বাবা ফিরিয়া আসিলে সে বাঁচে।
দুপুরে অপুর রাখিয়া যাওয়া সুটকেস হইতে ডায়েরিখানা বাহির করিয়া সে পড়িতে বসে। ইহা সে মধ্যে মধ্যেই পড়িয়া থাকে। এক বৎসরের ঠাসবুনোট লেখায় ভর্তি ডায়েরি। পাতা উলটাইতে উলটাইতে এক জায়গায় তাহার দৃষ্টি আটকাইয়া গেল। কাশীর কথা লেখা আছে কয়েক পাতা। বাবা তাহাকে রাখিয়া একবার কাশী গিয়াছিল বটে। কাজল পড়িয়া ফেলে পাতা কয়টা। এ কাহার কথা লেখা! লীলা কে? তাহার মেয়ের সহিত বাবা তাহার বিবাহে ইচ্ছা প্ৰকাশ করিয়াছে যে! বিবাহ! এ তো বড়ো মজার কথা হইল। কলিকাতায় থাকিতে গলির ওপারে একটা বাড়িতে সে বিবাহের উৎসব দেখিয়াছিল। বর মোটরগাড়ি করিয়া মালা-চন্দন পরিয়া আসে। পরে গাড়ি হইতে নামিলে একজন মেয়ে কুলোর উপর কী সব সাজাইয়া তাহাকে বরণ করে ও অন্যান্যরা জোরে হাতপাখা নাড়িয়া বাতাস করিয়া থাকে। ওপাড়ার চনুর দিদিরও তো বিবাহের কথা চলিতেছে। চনু বলিতেছিল, দিদি কালো বলিয়া নাকি পত্রিপক্ষ এক হাজার টাকা পণ চাহিয়াছে। বেশ মজা তো! বিবাহ করিলে সেও টাকা পাইবে তাহা হইলে। কিন্তু বাবা তো লিখিতেছে লীলার (এ কে?) মেয়ে ফরসা। ফরসা মেয়েকে বিবাহ করিলে টাকা দিবে তো? টাকা পাইলে সে সব টাকা বাবাকে দিবে। আচ্ছা, কত বৎসর বয়স হইলে বিবাহ হইয়া থাকে?
০২. সেদিন সকাল হইতে মেঘ করিয়াছিল
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
সেদিন সকাল হইতে মেঘ করিয়াছিল–কিন্তু বৃষ্টি হয় নাই। সুন্দর একটা ছায়াঘন আমেজে গ্রামটা ঝিমাইতেছিল। পাখির ডাক শোনা যাইতেছিল কম। কেবল বহু উঁচুতে প্রায় মেঘের গায়ে গায়ে কয়েকটা চিল উড়িতেছিল। কাদের মিঞার ক্ষেতের পাশে কাজল একবার থামিল। কাদের তাহার শালার সহিত নিড়ান দিতেছে ক্ষেতে। কাজলকে দেখিয়া কাদেরের শালা বলিল–বাড়ি চলে যাও কর্তবাবা-বিষ্টি হতে পারে। কাদের আপত্তি করিয়া বলিল—পানি হবে না মোট-দেখছো না চিল উড়ছে ওপরে। ডানায় পানি পালি নামি আসত। নিচপানে। আরহাওয়াতত্ত্ব সম্বন্ধে তাহদের আলাপ করিতে দিয়া কাজল হাটতে লাগিল মেঠোপথ ধরিয়া। ওই পথটা গিয়াছে আষাঢ়-এই পথটা ঘুরিয়া গিয়াছে নদীর দিকে। একটা বড়ো গাছ রহিয়াছে দুইটা পথের সঙ্গমস্থলে। জায়গাটা কাজলের বড়ো ভালো লাগে। গ্রামের যাবতীয় লোক এই পথ দিয়া আষাঢুব হাটে গিয়া থাকে। অচেনা লোকও যায় কত। ভিন-গাঁ হইতে মালপত্ৰ কাঁধে করিয়া আলের পথ মাঠের পথ ধরিয়া এখানে আসে। এখান হইতে কাঁচা পথ ধরিয়া চলিয়া যায় হাটে। পণ্যাদি কাঁধে হাটমুখী জনস্রোত দেখিতে কাজলের বেশ লাগে।
