প্রথমদিকে কাজল কলিকাতায় বিশেষ কিছু অস্বাভাবিকতা দেখে নাই। কিন্তু যত দিন যাইতে লাগিল, মানুষ ততই দিশাহারা হইয়া পড়িল। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে জাপান হঠাৎ পার্ল হারবার আক্রমণ করায় আমেরিকা যুদ্ধে নামিল। ইহার কিছুদিন বাদে ব্রহ্মদেশের পতন হওয়ায় ভারতবর্ষ অনুভব করিল, বিপদ একেবারে ঘাড়ের উপর আসিয়া পড়িয়াছে। শুরু হইল বা বিনা ঘাড়ে গ্রামের দিকে সদলে পলায়ন। তাড়া খাওয়া প্রাণীর মতো অবস্থা।
অনেক সময় কাজলের ক্লাস করিতে ভালো লাগত না। পরমেশের সঙ্গে রাস্তায় ঘুরিতে ঘুরিতে তাহার মনে হইত, মানুষ মোকা যুদ্ধ করে মরছে কেন? এমনিই তো মরবে কদিন বাদে।
সে বলিত-পরমেশ, যুদ্ধ বড়ো বীভৎস আর অর্থহীন, না?
—হয়তো তাই, কিন্তু যুদ্ধেরও যে অনেক সৃষ্টিশীল দিক আছে। কলকারখানা বাড়ছে, নতুন নতুন আবিষ্কার হচ্ছে। কত প্রথম শ্রেণীর সাহিত্য সৃষ্টি হবে হয়তো পরে। প্রথম মহাযুদ্ধের ফসল যেমন রেমার্ক, রুপার্ট ব্রুক–
–ভালো সাহিত্যের জন্য, নতুন আবিষ্কারের জন্য কি মানুষ মারতে হবে?
পরমেশ হাসিল। বলিল—তুমি নিজেই বলে থাকো জীবনের কোন অর্থ হয় না, জীবনটা দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্ত হবার একটা পন্থা মাত্র। মানুষের জীবন থাকলে কী গেল, তাতে তোমার দুঃখিত হবার কারণ নেই।
কাজল ভাবিয়া দেখিল, পরমেশ ঠিকই বলিয়াছে। তাহার দর্শন অনুযায়ী যুদ্ধে মন-মরা হইবার কারণ নাই।
অথচ এ কথাও ঠিক যে, সে হাঁপাইয়া উঠিয়াছে। কলিকাতার আলোকহীন নিপ্রাণ সন্ধ্যা, লোজনের পলায়ন, প্রতিদিন যুদ্ধের নূতন নূতন নারকীয় সংবাদ তাহার মনে এত অবসাদ আনিয়াছে যে, আই-এ পরীক্ষায় যেমন করা উচিত ছিল, তাহা সে পারে নাই। পরীক্ষার হলে বসিয়া অনেকবার কাগজ জমা দিয়া উঠিয়া আসিবার কথা ভাবিয়াছে, কিন্তু মায়ের কথা ভাবিয়া পারে নাই।
মায়ের আশা সে বড়ো হইবে। টাকার দিক দিয়া নহে, যশের দিক দিয়া। রাত্রে শুইয়া সে বাচ্চা ছেলের মতো মায়ের বুকে মুখ খুঁজিয়া থাকে। সারাদিনের চিন্তার পরিশ্রমে ক্লান্ত মস্তিষ্ক তাহাতে বিশ্রাম পায়। পৃথিবীর বড়ো বড়ো ফাঁকির ভিতরে মায়ের ভালোবাসাই তাহার কাছে একটুকু সার পদার্থ বলিয়া বোধ হয়। প্রায় রাত্রে দুইজনে নিশ্চিন্দিপুরের গল্প করে, মৌপাহাড়িব গল্প করে। গল্প কিছুক্ষণ চলিবার পর কাজল টের পায়, মা কাঁদিতেছে। তখন সে বলে—মা, তোমার ছোটবেলার গল্প বলল।
হৈমন্তী কাজলকে বুকের কাছে লইয়া মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে তাহার রঙিন শৈশবের গল্প করে।
ভারি সুন্দর ছিল সে সমস্ত দিন। কত জায়গায় সে ঘুরিয়াছে বাবার সঙ্গে। এক জায়গায় সংসার পুরাতন হইতে না হইতেই সব কিছু গুটাইয়া আবার নূতন স্থানে যাত্রা শুরু হইত। জামালপুরে তাহাদের পাশের বাড়ির সেই সুমিত্রাদি কী ভালোই না বাসিত তাহাকে! স্বামী রাত্রে মদ খাইয়া বাড়ি ফিরিত, হুঁশ থাকিত না। সুমিত্রাদি জামাকাপড় ছাড়াইয়া বিছানায় শোয়াইয়া বাতাস করিয়া ঘুম পাড়াইত। একদিন অভিযোগ করিতে গিয়া কী মারটাই না খাইয়াছিল স্বামীর হাতে! হৈমন্তীকে ডাকিয়া সে একদিন গহনাপত্র দেখাইয়াছিল। শখ করিয়া কত কিছু গড়াইয়াছিল সুমিত্রাদি, খুব শখ ছিল ভালো করিয়া সংসার করিবে। হয় নাই। মাতাল, অপদার্থ স্বামী কোথা হইতে আর একজনকে বিবাহ করিয়া আনিল। কয়েকদিন বাদে সুমিত্রাদি গেল পাগল হইয়া। তাহাকে বাপের বাড়ি পাঠাইয়া দেওয়া হইল। সুমিত্রাদি আর সারিয়া উঠে নাই, তাহার সংসার করিবার সাধ পূর্ণ হয় নাই।
—তখন ভারি টক খেতে ভালোবাসতাম, জানিস বুড়ো। আমি আর দিদি সারাদিন এ বাগানে ও-বাগানে ঘুরতাম চালতে করমচার খোঁজে। এক বুড়োর বাগানে লুকিয়ে ঢুকেছিলাম। বুড়ো দেখতে পেয়ে আমাদের ডেকে বলললুকিয়ে নিচ্ছ কেন খুকিরা, যত ইচ্ছে নিয়ে যাও, কেউ কিছু বলবে না। কোথায় থাকো মা তোমরা?
মায়ের জন্য কাজলের দুঃখ হয়। মা জীবনে কিছু পায় নাই। কত অল্প বয়সে বিধবা হইয়াছে, এখন পুরাতন স্মৃতি মন্থন করিয়া দিন কাটায়। বাবা মারা যাইবার পর হইতে কী-ই বা রহিয়াছে। একটা বড়ো রকমের কিছু করিয়া মাকে খুশি করিতে হইবে। সে বলে—একটা গল্প শুনবে মা?
-কী গল্প রে খোকন?
সে ফিয়োদর সোলোগাব-এর ‘দি হুপ’ গটা মাকে বলে। সোলোগা এমন কিছু বড়ো সাহিত্যিক নন। কিন্তু গল্পটা তাহার খুব ভালো লাগিয়াছিল। আশি বছরের এক বৃদ্ধের গল্প। মায়ের সহিত বাচ্চাকে হাঁটিয়া যাইতে দেখিয়া বৃদ্ধের শিশু হইতে ইচ্ছা করিয়াছিল। বাচ্চাটি বেশি দূরে গিয়া পড়িলেই মা ডাকিয়া বলিতেছে–ওদিকে যাস নে, পড়ে যাবি। পরের দিন বৃদ্ধ কাজ কামাই করিয়া সারাদিন বালকের মতো নির্জন পাহাড়ের ধারে খেলিয়া বেড়াইল। বৃদ্ধের কেহ ছিল না। শৈশবে সে মায়ের স্নেহ পায় নাই। অশক্ত শরীরে পাহাড়ের পথে দৌড়াইতে দৌড়াইতে কেবল তাহার মনে হইতেছিল, মা পিছন হইতে সাবধান করিয়া দিতেছে—ওদিকে যাস নে, পড়ে যাবি।
সম্বলহীন আত্মীয়হীন বৃদ্ধের গল্পটা কাজলের মনে দাগ কাটিয়াছিল। বলিতে বলিতে সে বিছানার উপর উঠিয়া বসিল। শেষ দিকটায় তাহার গলার কাছটায় একটা কান্না আটকাইয়া যাইতেছিল। অবাক হইয়া সে লক্ষ করিল, জীবনের অর্থহীনতা আবিষ্কারের পরেও সে জীবনকে কত ভালোবাসে। অরুদ্ধ কণ্ঠে বলিল—কত লোক জীবনে কিছু না পেয়েই মবে যায় মা!
