একবার কাজলের উর্দু শিখিবার শখ হইল। কী একটা বই পড়িতে পড়িতে সে মির্জা গালিবের দুইটা লাইন পাইয়াছিল। লাইন দুইটা তাহার এত ভাল লাগিল যে, ক্রমশ উর্দু কবিতা সংগ্রহ করা তাহার বাতিকে দাঁড়াইয়া গেল। কলেজে এক সহপাঠীকে সে উর্দু কবিতা আবৃত্তি করিয়া শোনাইতেছিল, ছেলেটি তাহাকে উর্দু শিখিবার উপদেশ দেয়। কথাটা মনে ধরিল। অনেক সন্ধানের পর এক বৃদ্ধ মুসলমান ভদ্রলোককে পাওয়া গেল, তিনি সপ্তাহে তিনদিন সন্ধ্যায় কাজলকে উর্দু পাঠ দিতে বাজি হইলেন। সন্ধ্যাবেলা খাতা হাতে কাজল তার কাছে গিয়া হাজির হয়। মালতীনগরের প্রান্তে এক মসজিদে তিনি থাকেন, সবাই মৌলবী সাহেব বলিয়া ডাকে। কাজল গেলে মৌলবী সাহেব হাসিয়া বলেন—সেলাম আলেক। ইহার প্রত্যুত্তরও কাজল তাহার নিকট হইতে শিখিয়া লইয়াছে— সে মাথা বুকাইয়া বলে, ওআলেক সেলাম। মৌলবী সাহেব বুঝাইয়া বলিলেন, এটা হচ্ছে শুভেচ্ছা জানান, ভগবানের আশীর্বাদ প্রার্থনা করা। একজন বলছে—তোমার ওপর ভগবানের আশীর্বাদ নেমে আসুক। অন্যজন বলছে—তোমার ওপরও ভগবানের আশীর্বাদ নেমে আসুক।
মৌলবী সাহেবের ছোট ঘরে মোমবাতি জ্বলে, মাদুরের উপর বসিয়া কাজল মনোযোগ দিয়া আপাত-বৈসাদৃশ্যহীন উর্দু অক্ষরের পার্থক্য বুঝিবার চেষ্টা করে। মৌলবী সাহেব হাঁ-হাঁ করিয়া বলেন–নেহি, নেহি-এয়সা করকে লিখ্খো, ইয়ে হম্জা নেহি হুয়া।
কখনও কখনও তিনি মূল ফারসী হইতে কাজলকে ওমর খৈয়াম পড়িয়া শোনান। বলেনএই কবিতা অনেক গোঁড়া মুসলমান অপছন্দ করে। এতে নাকি অধর্মের কথা, ভোগবিলাসের কথা লেখা আছে। আমি কিন্তু তা মানি না, যা ভালো কবিতা, তা না পড়ে আমি থাকতে পারি না।
ওমর খৈয়াম শুনিয়া কাজলের এত ভালো লাগিল যে, সে একখানা ফিটজেরালড় অনূদিত রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম কিনিয়া ফেলিল, কেননা ফারসী বুঝিবার ক্ষমতা তাহার নাই। ওমর খৈয়ামের স্বপ্নিল জীবনরহস্য, মধ্যপ্রাচ্যের অতীত দিনগুলির রোম্যান্টিক অনুভূতি কাজলকে মুগ্ধ করিল। কী সুন্দর এক একটি ছোট কবিতা—
They say the Lion and the Lizard keep
The Courts where Jamshyd gloried and drank deep;
And Bahram, that great hunter-the Wild Ass
Stamps oer his Head, but cannot break his sleep.
অনিবার্যভাবে মৃত্যু আসিয়া দাম্ভিক নৃপতি এবং বলদর্পী শিকারীকে চিরকালের মতো ঘুম পাড়াইয়া গিয়াছে, তাহাদের সমাধির উপরে বাড়িয়া ওঠা জঙ্গলের বন্য গর্দভের মাতামাতিও আর তাহাদের ঘুম ভাঙাইতে পারে না।
মৌলবী সাহেব বলেন–তাড়াতাড়ি শিখতে চেষ্টা করো, উর্দু সাহিত্যের ভেতরে ঢুকলে মুগ্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া উর্দু হয়ে গেলে ফারসী শেখাও বিশেষ আর কষ্টকর হবে না।
মেজাজ ভালো থাকিলে তিনি বলেন–আজ পড়া থাক—এসো, তোমাকে কিছু শের শোনাই। সম্রাট বাহাদুব শাহের লেখা কবিতা শুনবে? একেবারে শেষ জীবনে লেখা, শোনো
উমরে দরাজ মাকর লায়ে থে ইয়ে চার রোজ।
দো আরজুমে কাটগয়ে, দো ইজারমে।
***
কিতনা হ্যায় বদনসীব জাফর দনেকে লিয়ে।
দো গজ জমিন না মিল সকি ইস কুয়েয়ার মে।
কিছুদিন যাতায়াত করিয়া কাজলের উর্দু শিখিবার উৎসাহ চলিয়া গেল। জটিল ব্যাকরণ এবং ততোধিক জটিল লিখন প্রণালী সে কিছুতেই আয়ত্ত করিয়া উঠিতে পারিতেছিল না। অবশ্য উর্দু সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ তাহার থাকিয়াই গেল।
কলেজ হইতে ফিরিবার সময় একদিন কাজল কী কাজে কলেজ স্ট্রীটে গিয়াছিল। একটা পুরাতন বইয়ের দোকানে নজরে পড়িল, ডস্টয়েভস্কির ব্রাদার্স কারামাজখানা। কাজল নগদ দেড় টাকা মূল্যে বইখানি হস্তগত করিয়া বাড়ি ফিরিল। খুব নাম শুনিয়াছে বইখানার—কিন্তু পড়িয়া ওঠা হয় নাই। বাড়ি ফিরিয়া সন্ধ্যায় অন্যদিনের মতো বেড়াইতে বাহির না হইয়া সে বিছানায় শুইয়া হ্যারিকেন কাছে টানিয়া পড়া শুরু করিল।
সে ভাবিয়াছিল নাম করা উপন্যাস যখন, প্রথম পাতা হইতেই গল্প খুব জমিবে। তাহা হইল না। পাতার পর পাতা পড়িয়া যাইতেছে, কিন্তু রস যাহাকে বলে, তাহা ঠিক জমিতেছে না। শতখানেক পৃষ্ঠা পড়িয়া সে বিরক্ত হইয়া বই মুড়িয়া তুলিয়া রাখিয়া দিল। মাস আটেকের মধ্যে আর সে হাত দেয় নাই। একদিন কি খেয়াল হওয়ায় তাক হইতে নামাইয়া নূতন করিয়া পড়িতে শুরু করিল।
জমিয়া গেল।
কষ্ট করিয়া, তেতো ওষুধ খাইবার মতো করিয়া দুইশত পৃষ্ঠা পড়িবার পর বই আর হাত হইতে নামাইতে পারিল না। বৃহৎ পটভূমিতে জীবনকে এমনভাবে অঙ্কন করিতে সে অন্য কোনো শিল্পীকে দেখে নাই। বিশেষত দিমিত্রির চরিত্র তাহার কাছে অসাধারণ সৃষ্টি বলিয়া মনে হইল।
দিমিত্রির উন্মত্ততা, জীবনকে আকুল হইয়া জড়াইয়া ধবিবার চেষ্টা—এসব সত্ত্বেও দিমিত্রির পরিণতিতে কাজল কেমন মুহ্যমান হইয়া পড়িল। মনে হইল, জীবনটা এক অদৃশ্য শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাহা ঈশ্বর না, মানবিক কিছু নহে—বরং মানবিকতা বিরোধী।
জীবনকে ভালোবাসিবার পরিণতি যদি এই হয়, তবে বাঁচিয়া লাভ কী? ব্রাদার্স কারামজভ জীবনকে নূতন এক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখিতে শিখাইল।
১৩. শীত আসিতেছে
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
শীত আসিতেছে। সকালে ঘাসে আলগা শিশির লাগিয়া থাকে, শেষরাতের দিকে চাদর গায়ে টানিয়া দিতে হয়। সন্ধ্যাবেলা ঘরে ঘরে উনানে আঁচ পড়িলে ধোয়া জমিয়া যায়, বাতাস না থাকায় ধোঁয়া সরে না। রাত্রে আকাশ একেবারে পরিষ্কার হইয়া যায়, মেঘ আসিয়া নক্ষত্রদের ঢাকিয়া দেয় না। পাড়ায় পাড়ায় ধুনুরীদের হক শোনা যায়-লেপ বানাবে নাকি মা-ঠাকরুন, বাছাই করা ভালো তুলে ছিল–
