দুইজনে কিছুক্ষণ চুপ করিয়া হাঁটিল। বেশ কেমন সন্ধ্যায় নদীতে স্নান করিতে যাওয়া বনপথ বাহিয়া এইসব শাস্তি ছাড়িয়া সে কীসের অন্বেষণে ঘুরিতেছিল সমুদ্রপারে?
বাঁশবাগানের মধ্যে হৈমন্তী হঠাৎ থামিয়া গেল। চারিদিকে তাকাইয়া বলিল–শোনো।
–কী?
–একটা মজার ব্যাপার হয়েছে।
–তোমার তো দেখি দুপুর থেকে খালি মজার ব্যাপারই ঘটছে। কী ব্যাপার?
–মালতীনগর থেকে আসবার আগে পত্রিকায় একটা গল্প দিয়ে এসেছি না? সেই গল্পে একটা বাঁশবাগানের বর্ণনা আছে। মনে মনে একটা বাঁশঝাড়ের কল্পনা করে লিখেছিলাম। হঠাৎ এখানটায় দাঁড়িয়ে চারিদিক দেখে মনে হচ্ছে অবিকল যেন আমার কল্পনাব সেই বাগানটা। কেমন আশ্চর্য, না?
অপুর বেশ ভালো লাগিল ঘটনাটা। হৈমন্তী এ গ্রামের বউ হইয়া আসিবে, ইহা যেন ভগবানই স্থির করিয়া রাখিয়াছেন। নিজের অতীত জীবনটা এই আনন্দের মুহূর্তে গোটানো মানচিত্রের মতো চোখের সামনে খুলিয়া গেল। বহু কষ্ট গিয়াছে, জীবনযুদ্ধে বহু রণক্ষেত্রের সে সৈনিক। এখন পুরস্কারের দিন-সার্থকতার দিন।
অন্ধকার ঝোপে ঝোপে কীটপতঙ্গের ঐকতান শুরু হইয়াছে। বাতাসে দিনশেষের আমেজ আর একটা বন্য গন্ধ।
অপু বলিল–নাও, তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চল। সন্ধে উতরে গেল—
এক-একদিন রাত্রিতে চাঁদ থাকিলে মাদুর পাতিয়া তারা বারান্দায় শোয়। বাবার পাশে মাদুরে শুইয়া কাজল চাঁদ নক্ষত্র আকাশ পৃথিবী সম্বন্ধীয় অজস্র বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন করিতে থাকে। অপুকে তাহার উত্তর দিতে হয়। অপু মাঝে মাঝে কাজলকে বিশ্বসাহিত্যের গল্প শোনায-কাজল মনোযোগ দিয়া শোনে। বেশি রাত হইলে অপু ভাবে কাজল ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। সে গল্প থামাইয়া বলে-কী রে, ঘুম পেয়েছে?
অমনি কাজল বলে, বাবা আমার ঘুম পায়নি। থামলে কেন? বলো–
অপুকে গল্প চালাইতে হয়। এইভাবে কিছুদিনের মধ্যেই কাজল বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কয়েকটি গ্ৰন্থ শুনিয়া ফেলিল।
একদিন অপু কাজলকে ডাকিয়া বলিল–নে, চল। কাল আমার সঙ্গে কলকাতা চল। যাদুঘর যাবি বলছিলি, কাল যাদুঘর দেখাব’খন। আমারও এমনি কাজ আছে কয়েকটা-সেই সঙ্গে সেরে ফেলব।
পরদিন সকালে অপু ছেলেকে লইয়া কলিকাতা রওনা দিল। কাজল একটা ঘিয়ে. রঙের হাফপ্যান্ট আর সাদা শার্ট পরিয়াছে। হৈমন্তী চুল আঁচড়াইয়া দিয়াছে পরিপাট করিয়া। যাইবার সময় অপুকে বলিয়া দিয়াছে–ওকে ভালো করে দেখেশুনে নিয়ে যাবে। যা দুষ্টু–
কাজল অনেকদিন বাদে কলিকাতা আসিল। আবার সেই বড়ো বড়ো বাড়ি, লোকজন, হৈ-চৈ, রাস্তায় গাড়ির ভেঁপু, ট্রামের ঘণ্টা। সব মিলিয়া জিনিসটা মন্দ লাগে না। বাবা তাহাকে বলিয়াছে বড়ো হইলে তাহাকে কলিকাতার কলেজে পড়াইবে। কলিকাতার বড়ো বড়ো কলেজের গল্প বাবা তাহার নিকট করিয়াছে, সেখানে লাইব্রেরিতে কত বই আছে–তাহা নাকি গণিয়া শেষ করা যায় না। ওই সমস্ত বই সে পড়িবে।
অপুর কাজ ছিল বিকালে। খুব সকালে রওনা হওয়ায় তাহারা বেশি বেলা হইবার আগেই কলিকাতা পৌঁছিয়াছিল। ট্রামে করিয়া অপু এসপ্ল্যানেড আসিয়া নামিয়া বলিল–এইটুকু চল হেঁটে যাই। কেমন দেখতে দেখতে যাওয়া যাবে।
যাদুঘরে ঢুকিতেই কাজলের সেই অদ্ভুত ভাবটা হইল–যাহা সে কিছুতেই কাহাকেও বুঝাইয়া উঠিতে পারে না। মাথার মধ্যে কেমন একটা ঝিম-ঝিম ভাব। যাদুঘরের একটা নিজস্ব গন্ধ আছে, তাহা কাজলকে পুরানো দিনের কথা মনে করাইয়া দেয়। নিজের জীবনের কথা নহে, বাবার কাছে শোনা ইতিহাসের কথা-মানবসৃষ্টির আগেকার পৃথিবীর কথা। সমস্ত আবেদনটা সে ঠিক ধরিতে পারে না। কিন্তু তাহার মনে হয়, এই জীবনের বাহিরে আর একটা বৃহত্তর জীবন তাহাকে হাতছানি দিয়া ডাকিতেছে।
সারাদিন ভারি আনন্দে কাটিল। প্রাচীন স্তূপ হইতে গুহামানবের মাথার খুলি পর্যন্ত সবকিছুই কাজলের কাছে সমান আকর্ষণীয়। প্রাচীন জীবজন্তুর কঙ্কালগুলি যে ঘরে আছে, সে ঘর ছাড়িয়া কাজল আর নড়িতে চায় না। উল্কাপিণ্ডটার সামনে দাঁড়াইয়া উত্তেজনায় তাহার চোখ কোটর হইতে বাহির হইয়া পড়ে আর কী! ফসিলের ঘরে সে অপুকে জিজ্ঞাসা করে–তুমি যে বলেছিলে পলিমাটিতে তারামাছের ফসিল আছে, সে কই বাবা?
এ সমস্ত অত্যন্ত পক্কতার লক্ষণ সন্দেহ নাই–কিন্তু অপু কাজলকে এইভাবেই মানুষ করিয়াছিল। এই বয়সে অন্যরা যাদুঘরে গিয়া মুগ্ধ বিস্ময়ে চতুর্দিক একবার দেখিয়া আসে মাত্র। কক্ষ হইতে কক্ষান্তরে ঘুরিয়া পা ব্যথা করিয়া বেতের ঝুড়িতে আনা জলখাবার খাইয়া মা-বাবার সহিত বাড়ি ফিরিয়া যায়। কিন্তু কাজল বুঝিতে চায়, কাজল অনুভব করে।
বিকালে যাদুঘর বন্ধ হইবার সময় অপু বলিল–চল, এবার আমার কাজটা সেরে আসি। বইএর দোকানের দিকে যেতে হবে।
পাবলিশারের কাছে কিছু টাকা পাওনা ছিল। দোকানে ঢুকিতেই মালিক হাসিয়া বলিল–আসুন অপূর্ববাবু, বসুন। এবার তো অনেকদিন বাদে এলেন। আপনার ও বইটার স্টক প্রায় শেষ। নতুন এডিশন সম্বন্ধে একটু কথাবার্তা বলে নিতে হয়। এটি কে? বাঃ বেশ বেশ।
অপুর এসব আজ ভালো লাগিতেছিল না। সকালে খুব আনন্দ করিয়া বাহির হইয়াছিল বটে, কিন্তু দুপুরের পর হইতেই শরীরটা ভালো বোধ হইতেছিল না। বুকের কাছটায় কেমন একটা ব্যথাব্যথা ভাব। এখন আবার নতুন এডিশন সম্বন্ধে বাক্যালাপের ঝামেলা আসিয়া জুটিল।
