পরে পার্শ্বস্থ স্থূলকায় ব্যক্তিটির দিকে ফিরিয়া বলিলেন—নিন, আর ঠিকানা দিতে হল না, একেবারে লেখক মশাইকে ধবে দিলাম।
কথার্বতা ঠিক হইয়া গেল। আগামী সংখ্যা হইতে অপু লিখিবে। একটা বিজ্ঞাপন দেওয়া হইতেছে। সম্পাদক ভদ্রলোক অপুর লেখার অত্যন্ত প্রশংসা করিলেন।
অগ্রিম টাকা পকেটে লইয়া অপু পুরাতন দিনের মতো খেয়ালে কিছুক্ষণ রাস্তায় বাস্তায় বেড়াইল। এখন সে হোটেলে ঢুকিয়া যাহা ইচ্ছা এবং যত ইচ্ছা খাইতে পারে, ইচ্ছা করিলে নোটগুলি একটা একটা করিয়া হাওয়ায় উড়াইয়া দিতে পারে। আজ হইতে অনেকদিন আগে, অবশ্য খুব বেশিদিন আর কী, তাহাকে অভুক্ত অবস্থায় রাস্তায় বেড়াইতে হইয়াছে শুকনো মুখে। কেহ ভালোবাসিয়া বলে নাই, আহা, তোমার বুঝি খাওয়া হয় নি? এসো, যা হয় দুটো ডাল-ভাত–না, সেরূপ কেহ বলে নাই; ববং তেওয়ারী-বধূ বেশ ভালো ছিল, তাহার স্নেহে খাদ ছিল না। জীবনের পথে তেওয়ারী-বধূর মতো কয়েকজনের নিকট হইতে স্নেহস্পর্শ পাইয়াই তো কষ্টের মধ্যেও মানুষ সম্বন্ধে সে হতাশ হইয়া পড়ে নাই। আজ টাকা কয়টা পকেটে করিয়া সে পরিচিত স্থানগুলিতেঁ একবার করিয়া গেল। মনে মনে ভাবিল, মানুষ যেখানে কষ্ট পায়, ভগবান সেইখানেই আবার তাকে সুখ দেন। আমার সেই পুরোনো মেসের সামনেই পকেটে আজ একগাদা টাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কথাটা ভাবিয়া তাহার কেমন অদ্ভুত লাগিল। মনে হইল, রাস্তার ওপারের ওই দোকানে বসিয়া থাকা ধূমপানরত মানুষটিকে ডাকিয়া বলে—শুনুন, আমি ওই গলিতে থাকতাম অনেকদিন আগে। খেতে পেতাম না, কলেজের মাইনে দিতে পারতাম না। মা বাড়িতে কষ্ট পেতেন, টাকা পাঠাতে পারতাম না। আর এখন আমার পকেটে এই দেখুন, অনেক টাকা-অনেক। এ দিয়ে আমি কী করি বলুন তো?
কিছুদিনের মধ্যেই অপু আরও একটি পত্রিকায় ধারাবাহিক উপন্যাস লিখিতে শুরু করিল। বাজারে তাহার বেশ নাম। বিশেষ করিয়া তরুণদের কাছে তাহার নূতন দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত আদর পাইতেছে। মালতীনগরের সেই তরুণ বাহিনী রোজ তাহার দুর্গ আক্ৰমণ করে, সে মাঝে মাঝে বিরক্ত হইলেও মুখে কিছু বলিতে পারে না। ছেলেগুলোকে সে পছন্দ করে, কিন্তু বড়ো বেশি বক বক করে তাহারা। অপুর মাথা ধরিয়া যায়।
অপু প্ৰতি মাসে একগাদা পত্রিকা ও বই কিনিয়া থাকে। ছেলের জন্য ভালো শিশুসাহিত্য আনে। এমন বই আনে, যাহা কাজলের মনেব গভীরে ঘুমন্ত ইন্দ্ৰিয়গুলিকে জাগাইয়া তোলে। কূপমণ্ডুক হইয়া বাঁচিয়া থাকিবার কোন অর্থ হয় না, ছেলেকে সে মধ্যবিত্ত মনের অধিকারী করিয়া গড়িবে না। অপু নিজে ওয়াইড ওয়ার্লড ম্যাগাজিন পড়িতে ভালোবাসে। সে পড়ে ও ভালো গল্প পাইলে তৎক্ষণাৎ ছেলেকে ডাকিয়া শোনায়। এইভাবে অপু ছেলের মনে একটা পিপাসা জাগায়।
কাজলের বিশেষ বন্ধু কেহ নাই। স্কুলে নাই, পাড়াতেও নাই। সে সমবয়সীদের মতো দৌড়ঝাপ করিতে পারে না-যেসব খেলায় শারীরিক কসরতের প্রযোজন, সেগুলি কাজল সভয়ে এড়াইয়া চলে। চেষ্টা করিয়া দেখিয়াছে, সে পারে না। এই তো সেদিন বেণু আর শ্ৰীশ আম পাড়িবার জন্য মুখুজ্যেদের বাগানে পাচিল ডিঙাইয়া ঢুকিতেছিল। আম খাইতে কাজলের আপত্তি নাই, কিন্তু মধ্যে প্রাচীররূপী বড়ো একটা বাধা রহিয়াছে। অতি উঁচু পাঁচিল তাহার পার হইবার সাধ্য নাই! বেণু আর শ্ৰীশ অদ্ভুত কৌশলে তর তর করিয়া পাঁচিলের মাথায় উঠিয়া গেল। শ্ৰীশ মিটমিটি হাসিয়া বলিল–কী রে, পাববি নে?
তাহাদের উঠিবার কায়দা দেখিয়া কাজলের মনে হইতেছিল, ভূমিষ্ঠ হইয়া অবধি তাহারা এই কার্যের অনুশীলন করিয়াছে। মনে মনে নিজের অক্ষমতা বুঝিয়া কাজল ম্রিযমাণ হইয়া বলিল–না ভাই, আমার ডান পায়ে ব্যথা। একটা ফেলে দে না ভাই, খাই।
শ্ৰীশ এবং বেণুরা। দয়া করিয়া একটা দুইটা আমি তাহাকে খাইতে দেয়। উপায় কী! নিজ উঠিয়া পাড়িবার সাধা তাহার নাই।
বাহিরের দুনিয়ায় লাফালাফি করিয়া বেড়াইবার সমর্থ্য নাই বলিয়া সে ঘরের মধ্যে অধিকাংশ সময় কাটায়। মাঝে মাঝে কাজল বাবার ওয়াইড ওয়ার্লড ম্যাগাজিনগুলি নাড়িয়া-চাড়িয়া দেখে। গল্পগুলির আকর্ষণ তীব্র। ছবি দেখিয়া তাহার গায়ের লোম কাঁটা দিয়া ওঠে- যে ছবিটায় খুব রহস্যজনক ঘটনার আভাস পাওয়া যায়, বাবাকে বলিয়া গল্পটা কাজল শুনিয়া লয়।
অপু বুঝিতে পারে, কাজলের মানসিক বৃদ্ধি শুরু হইয়াছে। ঠিক এই একই জিনিস সেও করিত দেওয়ানপুরের স্কুলে। কঠিন ইংরাজি বুঝিতে না পারিলে ছবি দেখিয়া কিছুটা আভাস পাইবার চেষ্টা করিত, অনেক সময় রমাপতিদাকে ধরিয়া গল্পটা বুঝিয়া লইত। সেই একই জিনিস আবার ঘটিতেছে। রক্তের ভিতর অদৃশ্য বীজ রহিয়াছে–তাহাই এ সব সম্ভব করিতেছে।
ধারাবাহিক উপন্যাস দুইখানি শুরু করিবার কিছুদিন পরে অপু বিকালে বসিয়া ছেলের সঙ্গে জলখাবার খাইতেছিল। গোপালের মা পরোটা ভাজিয়া দিয়া রাস্তার ও পারের দোকানে দোক্তা আনিতে গিয়াছে। এমন সময় বসিবার ঘরের দরজার মুখে আসিয়া দাঁড়াইল একটি মেয়ে! কিশোরী বলাই অধিক সঙ্গত, মেয়েটির বয়স কোনমতেই পনেরো-ষোলর বেশি নহে। অপু অবশিষ্ট পরোটাসুদ্ধ থালাখানা তাড়াতাড়ি খাটের নিচে লুকাইবার চেষ্টা করিল।
আশ্চর্যের উপর আশ্চর্য! মেয়েটি একা আসে নাই, তাহার পিছনে আরও একটি মেয়ে আসিয়াছে। এ মেয়েটি হয়তো প্রথমটির চেয়ে বৎসর দুই-তিনের বড়ো হইবে।
