যাইবার গোলমাল, বাক্স গোছানো, নানাবিধ উপদেশ এবং উত্তেজনায় কাজল কিছুটা দিশাহারা হইয়া পড়িয়ছিল, নতুবা রওনা হইবার সময় সে নিশ্চয়ই একবার কাঁদিয়া ফেলিত। পরে তাহার মনে হইয়াছিল–পিসি অত কাঁদলে আর আমি দিব্যি চলে এলাম। পিসি হয়তো ভাবলে ছেড়ে আসতে আমার মন খারাপ হয়নি।
মন খারাপ তাহার অবশ্যই হইয়াছে, কিন্তু সেই গোলমালে তাহার কান্না আসে নাই।
অপুর মনটা কেমন ঝিমাইয়া পড়িয়াছিল। রানির কাছে কাজলকে রাখিয়া তাহার যে সহজ নিশ্চিন্ততা ছিল, তাহা সে ফিরিয়া পাইতেছিল না। অনেক প্রতিজ্ঞা, অনেক পত্র লিখিবার প্রতিশ্রুতি, অনেক চোখের জলের মধ্য দিয়া তাহারা মাঝেরপাড়া স্টেশনে পৌঁছিয়া গেল।
ট্রেনে উঠিয়া কাজল বলিল–একটা কথা বলব বাবা?
-কী?
–আমবা মালতীনগরে যাচ্ছি, না?
–হ্যাঁ।
-সেখানে থাকতে কেমন লাগবে বাবা?
কঠিন প্রশ্ন। অপু জানালা দিয়া বাহিরে তাকাইয়া রৌদ্রদগ্ধ প্ৰান্তর দেখিতে দেখিতে উত্তর খুঁজিতে লাগিল।
০৩. মালতীনগর জায়গাটা
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
মালতীনগর জায়গাটা কাজলের খুব খারাপ লাগিল না। ঘনবসতি সে ভালোবাসে না, মালতীনগরে তাহা নাই। বাবা যে বাসা ভাড়া লইয়াছে সেটা শহরের অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায়। জানালায় দাঁড়াইলে অনেক দূর দেখা যায়, দৃষ্টির কোন প্রতিবন্ধক নাই। একটা জানালা আর মুক্ত আদর্শ কাজলের অত্যন্ত প্রয়োজন। দুপুরের আকাশে চিল ওড়া দেখিয়া সে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাইয়া দিতে পারে। তাই জানালা একটা অবশ্যই দরকার প্রান্তরের দিকে। সে যে শুধু চিল দেখিবার জন্যই দাঁড়াইয়া থাকে। এমন নহে। আসলে চিলগুলা উঠিতে উঠিতে যখন বিন্দুবৎ হইয়া আসে তখন কাজলের মনটা হঠাৎ বিপুল একটা প্রসারলাভ করে। মনে মনে রোজ ভাবে-বাব্বাঃ, কোথায় উঠে গিয়েছে। চিলগুলো, এই এতোটুকু দেখাচ্চে একেবারে! আচ্ছ, ওখান থেকে না জানি পৃথিবীটা কেমন দেখায়। সুদূরের কল্পনা তাহার শিশুমনে স্বপ্নের রঙ বুলাইয়া দেয়। আরও কী একটা মনের মধ্যে হয়, সেটা সে ঠিক বুঝাইয়া উঠিতে পারে না, সেটা বুঝাইবার উপযুক্ত ভাষা তার আয়ত্তে নাই। দুরের কথা ভাবিলে দুপুরের জানালায় বসিয়া মেঘস্পশী পাখি দেখিলে তাহার বুকের গভীরে কী একটা কথা গুমরাইয়া উঠে, সে তাহা ভাষায় অনুবাদ করিতে পারে না।
একদিন অপু বাহির হইতে আসিয়া কাজলকে জানালায় দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিল-কী রে, কী দেখছিস হ্যাঁ করে?
কী দেখিতেছিল তাহা সে বাবাকে মোটেই বুঝাইয়া উঠিতে পারে নাই, প্রকাশের চেষ্টায় তাহার মুখ লাল হইয়া গিয়াছিল। চিলগুলি নহে, অগ্নিবৰ্ষী আকাশটা নহে, মাঠ-প্ৰস্তর নহে, মেঘ নহে, অথচ এই সবগুলি মিলিয়া যে গভীর ঐকতান সাধারণ মানুষের ইন্দ্ৰিয়গ্রাহ্যতার বাহিরে সর্বদাই বাজিতেছে, তাহা সে কেমন করিয়া শুনিয়া ফেলিয়াছে। অপু একেবারে অবাক হইয়া গিয়াছিল। তাহার নিজের শৈশবের চিন্তা হুবহু কাজলের মনে প্রতিফলিত হইয়াছে–হুবহু। ছোটবেলায় সেও রোয়াকে বসিয়া গ্ৰীষ্মের দুপুরে অবাক হইয়া আকাশ দেখিত। প্রকৃতির আশ্চর্য নিয়মগুলির কাছে শ্রদ্ধায় তাহার মাথা নত হইয়া আসে। মানুষের মতামত, ইতিহাসের গতি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া প্রকৃতি কঠোর হাতে পৃথিবী শাসন করিতেছে। প্রকৃতি স্পষ্ট, জড়তাশূন্য অথচ রহস্যময়। প্রকৃতির রহস্যময়তার প্রতি আকর্ষণ কাজলের রক্তেও সঞ্চারিত। আর মুক্তি নাই। সে মুক্তি পায় নাই, কাজলও পাইবে না।
রান্নাবান্না কোন রকমে হইতেছিল। সৌভাগ্যের কথা এই যে, কাজলের মুখে অপুর রান্না মোটামুটি খারাপ লাগে না।
কিন্তু এইভাবে বেশিদিন চলিবে না, তাহা অপু বুঝিতে পারিয়া একটি বুড়িকে রান্নার জন্য ধরিয়া আনিল। খুব বুড়ি নয়, দুইজনের রান্নার কাজ চালাইয়া লইতে পারে। বুড়িরও কোথাও আশ্রয় মিলিতেছিল না, বলিবামাত্র পোটল হাতে করিয়া আসিয়া পড়িল। তাহার ব্যস্ততা দেখিয়া অপু মনে মনে ভাবিল–আহা, বুড়ি মানুষ, কোথাও কেউই নেই। একে তাড়াব না, রেখে দেব যতদিন থাকে। মুখে বলিল–তোমাকে কী বলে ডাকব বলো দেখি? তোমার ছেলের নাম তো গোপাল? তাহলে গোপালের মা বলে ডাকব, কেমন?
–আর বাবা ছেলে। সে কী আমায় দেখে, না খেতে দেয়? তবুও কী জ্বালা, তার নাম ধবেই লোকে আমায় ডাকবে। যেখানে যাই, শুধু গোপালের মা আর গোপালের মা–
–তবে অন্য একটা কিছু বলো, সেভাবেই ডাকবাখন।
তাহাতেও বুড়ির আপত্তি। দেখা গেল যে ছেলে খাইতে বা পরিতে দেয় না, মুখে আপত্তি করা সত্ত্বেও বুড়ি তাহারই নামে পরিচিত হইতে চায়। অপুর কেমন মায়া পড়িয়া যাওয়ায় গোপালের মা থাকিয়া গেল।
মালতীনগরে আসিবার পরদিন অপু কাজলকে লইয়া বেড়াইতে বাহির হইল। পথটা বাজারেব মধ্য দিয়া গিয়া রেললাইন পার হইয়াছে, সে পথ ধরিয়া দুজনে কিছুক্ষণ হাঁটিল। বাজার ছাড়াইবাব পর বাঁদিকে একটি দোকান হইতে অপু একটা সিগারেট কিনিল। লুঙ্গি পর একজন মানুষ হাত-পা নাড়িয়া বলিতেছে–বেরিয়েছে কি এখন! সেই দুপুরের আগে একবার জাবনা খেয়ে বেরিযেছে। তা কোথাও খুঁজে পাচ্চি নে, কী করি বলো দেখি হরিধান? দুধেলো গাই–কোথাও বেঁধে রেখে দুধ টুধ দুয়ে নিচ্ছে না তো?
হরিধান, দোকানের মালিক, অপুকে পয়সা ফেরত দিতে দিতে বলিল–খুঁজে দেখা পাবে’খন, এখনও তো সন্ধে লাগে নি। তুমি বড়ো বেশি ভাবে কামাল।
