গান শেষ হইতে পূর্ব আকাশের কিনারায় শুকতারা দেখা দিল। ফকিরেরা গান থামাইয়া যার যার বাড়ি চলিয়া গেল। কেহ কাহারও সঙ্গে একটি কথাও বলিল না। গানের আসরে কি এক মহাবস্তু যেন তাহারা আজ পাইয়াছে। সকলেরই হৃদয় সেই গানের আবেশে ভরপুর।
ফকিরনী নিজের বিছানার এক পাশ দেখাইয়া বছিরকে বলিল, “বাজান! আইস শুইয়া পড়।” বছির শুইলে ফকিরনী তাহার গায়ে বাতাস করিতে লাগিল। একহাতে মাথার চুলগুলি বিলি দিতে লাগিল। শুইয়া শুইয়া বছিরের কিন্তু ঘুম আসিল না।
দূরবর্তী চরের কৃষাণ কুটিরগুলি হইতে চেঁকি পারের শব্দ আসিতে লাগিল। চাষী-মেয়েরা শেষ রাত্রিতে উঠিয়া ধান ভানিতেছে। শেষ রাতের শীতল বাতাসে টেকি পারাইতে তত হয়রান হইতে হয় না। কত রকম সুরেই যে মোরগ ডাকিতে লাগিল। চাষীরা এখনই উঠিয়া মাঠে লাঙল দিতে চলিয়াছে! তাহাদের গরু তাড়াইবার শব্দ কানে আসিতেছে। ক্রমে ক্রমে দিনের পাখিগুলি গাছের ডালে জাগিয়া উঠিল। নদী-তীর হইতে চখা-চখী ডাকিতে লাগিল। সে কি মধুর সুর! সমস্ত বালুচরের মনের কথা যেন তাহারা সুরে সুরে ছড়াইয়া দিতেছে।
মাঝে মাঝে এক ঝাক বেলে হাঁস আকাশে উড়িয়া কখনো অর্ধ গোলাকার হইয়া কখনো লম্বা ফুলের মালার মত হইয়া দূর শূন্য পথে ঘুরিতেছিল। ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়া বছির দেখিতেছিল।
ফর্সা হইয়া যখন সকাল হইল বছির উঠিয়া বসিল। ফকিরনী বছিরের হাতমুখ ধোওয়াইয়া তাহাকে সামান্যকটি ভিজানো ছোলা আনিয়া খাইতে দিল।
বিদায়ের সময় ফকিরনী বলিল, “বাজান! ম্যায়ারে দেখপার জন্যি কিন্তুক আইস। আমি পথের দিগে চায়া থাকপ।”
যতক্ষণ বছিরকে দেখা গেল ফকিরনী ঘরের বেড়া ধরিয়া ঠায় দাঁড়াইয়া রহিল। তারপর সে যখন দূরের ঝাউ গাছটির আড়ালে অদৃশ্য হইয়া গেল তখন একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া মাটিতে বসিয়া পড়িল। আহা! এই শ্যামল রঙের ছেলেটিকে সে কোন মায়ার পাশে বাঁধিবে? আর কি সে আসিবে? তারই গায়ের রঙ মাখিয়া দুরের শস্য খেতগুলি যেন মায়ায় দুলিতেছে। আকাশের কিনারায় দূরের মেঘগুলি যেন তারই ছায়া গায়ে মাখিয়া ওমন পেলব হইয়াছে। গোপাল–আমার গোপাল–আমি যে তোর মা যশোদা! গোঠের খেলা ভঙ্গ করিয়া তুই আমার বুকে আয়!
.
৩৩.
সেদিন বছির টিনের থালায় করিয়া এক গ্লাস ভাত মুখে দিয়া আর এক গ্লাস হাতে লইয়াছে। এমন সময় উকিল সাহেব তাহার সামনে আসিয়া বলিলেন, “খবর পেলাম, তুমি আরজান ফকিরের বাড়ি যেয়ে একরাত কাটিয়ে এসেছ। আমরা তাকে একঘরে করেছি। তার বাড়িতে যেয়ে তুমি ভাত খেয়েছ। আমার এখানে আর তোমার থাকা হবে না। বই-পত্র নিয়ে শিল্পীর সরে পড়। তোমার মুখ দেখলে আমার গা জ্বালা করে।” এই বলিয়া উকিল সাহেব অন্দরে প্রবেশ করিলেন।
বছিরের হাতের ভাত হাতেই রহিল। হতভম্বের মত সে বসিয়া রহিল। কখন যেন হাতের ভাত থালায় পড়িয়া গেল সে টেরও পাইল না। টিনের থালাখানা হাতে করিয়া বছির বাহিরে আসিয়া ভাতগুলি ফেলিয়া দিল। কতকগুলি কাক আসিয়া সেই ভাত খাইতে খাইতে ছিটাইয়া একাকার করিল। তেমনি করিয়া তাহার বালক-জীবনের স্বপ্নখানিকেও কে। যেন দু’পায়ে দলিয়া-পিষিয়া টুকরো টুকরো করিয়া ইতস্ততঃ ছড়াইয়া দিল।
এখন বছির কোথায় যাইবে! কোথায় যাইয়া আশ্রয় পাইবে? বই-পুস্তক নিজের লুঙ্গিখানায় বাধিয়া বছির পথে বাহির হইল। আজ আর স্কুলে যাওয়া হইবে না।
শহরের মসজিদে কয়েকটি মাদ্রাসার ছাত্র থাকিত। সেখানে মজিদ নামে একটি ছেলের সঙ্গে তাহার আলাপ হইয়াছিল। সে মসজিদে থাকিয়া পড়াশুনা করিত। ছুটির সময় গ্রামে গ্রামে লোকজনের কাছে সাহায্য ভিক্ষা করিত। তাই দিয়া শহরের হোটেলে একপেটা আধপেটা খাইয়া কোন রকমে তাহার পড়াশুনা চালাইত। তাহার সঙ্গে আরও যে চার পাঁচটি ছাত্র থাকিত তাহারাও এইভাবে তাহাদের পড়াশুনার খরচ চালাইত।
অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া বছির মজিদের আস্তানায় আসিয়া উঠিল। মজিদ অতি সমাদর করিয়া চৌকির উপর তাহার ময়লা লুঙ্গিখানা বিছাইয়া বছিরকে বসিতে দিল। সমস্ত শুনিয়া মজিদ বলিল, “ভাই! আল্লার ওয়াস্তে তুমি আমার মেহমান হয়া আইছ। তোমার কুনু চিন্তা নাই। আমি তোমারে আশ্রয় দিলাম।”
বছির বলিল, “ভাই! তুমি নিজেই পেট ভরিয়া খাইবার পাও না। তার উপরে আমারে খাওন দিবা কেমন কইরা?”
মজিদ বলিল, “ভাই! আমার কাছে আট আনার পয়সা আছে, চল এই দিয়া দুইজনে ভাত খায়া আসি। তারপর আর সব কথা শুনবানে।”
বছির জিজ্ঞাসা করিল, “এই আট আনা দিয়া তুমি আমারে খাওয়াইবা। কালকার খাওন কুথায় থনে অইব?”
উত্তরে মজিদ বলিল, “ভাইরে! আইজকার কথা বাইবাই বাঁচি না। কালকার কথা বাবলি ত আমরা গরীব আল্লার দইনা হইতে মুইছা যাইতাম। আমাগো কথা ঐল আইজ বাইচা থাহি। কাইলকার কথা কাইল বাবব। চল যাই, হৈটালত্যা খায়া আসি।”
সামনে হাফেজ মিঞার হোটেল। বাঁশের মাচার উপর হোগলা বিছানো। তার এখানে। সেখানে তরকারি পড়িয়া দাগ হইয়া আছে। রাশি রাশি মাছি ভন ভন করিয়া উড়িতেছে। পিছনের নর্দমার সামনে একরাশ এঁটো থালা-বাসন পড়িয়া আছে। কতকগুলি ঘেয়ো কুকুর। সেখানে কাড়াকাড়ি করিয়া সেই ভুক্তাবশিষ্ট ভাতের উপর পড়িয়া কামড়া-কামড়ি করিতেছে। হোটেলওয়ালা আসিয়া সেই কুকুরগুলিকে নির্দয়ভাবে প্রহার করিয়া তাড়াইয়া দিতেছে; আবার তাহারা আসিয়া যথাস্থান দখল করিতেছে।
