বছিরকে সঙ্গে করিয়া মজিদ সেই মাচার উপর হোগলা বিছানায় আসিয়া বসিল। হোটেলের চাকর সেই এঁটো থালা বাসনগুলি হইতে চল্টা-ওঠা দু’খানা টিনের থালা সামান্য পানিতে ধুইয়া নোংরা একখানা কাপড় দিয়া মুছিয়া তাহাদের সামনে দিল। মজিদ বলে, “দুই থালায় তিন আনার করিয়া ভাত আর এক আনার করিয়া ডাল দাও!” শুনিয়া হোটেলওয়ালা হাফেজ মিঞা বলিল, “মিঞা! রোজই শুধু ডাল ভাত চাও? আমার তরকারি বেচপ কার কাছে! আইজকার মত দিলাম, কিন্তুক আর পাইবা না। ভাত বিক্রী হয়া যায়, তরকারি পইড়া থাহে।”
মজিদ কথার উত্তর না দিয়া সেই ডাল-ভাত মাখাইয়া দুইজনে খাইতে বসিল। খাইতে খাইতে মজিদ চাকরটাকে বলিল, “বাই ত বাল, দুইডা কাঁচা মরিচ আর দুইডা পেঁয়াজ আইনা দাও।” চাকর তাহাই আনিয়া দিল। হাফেজ মিঞা তাহার দিকে কটমট করিয়া চাহিতে লাগিল। অল্প এতটুকু ডালে অর্ধেক ভাতও খাওয়া হইল না। মজিদ হোটেল-ওয়ালাকে বলিল, “হাফেজসাব! আজই এক ছিপারা কোরান শরীফ পইড়া আপনার মা-বাপের নামে বকশায়া দিবানি। আমাগো একটু মাছের ঝোল দেওনের হুকুম করেন।
হোটেলওয়ালা বলিল, “অত বকশানের কাম নাই। পয়সা আছে যে মাছের ঝোল দিব?”
মজিদ বলিল, “আমরা তালেম-এলেম মানুষ। আমাগো দিলি আল্লা আপনাগো বরকত। দিব। না দিলি আল্লা বেজার হবেন।”
হোটেলওয়ালা মনে মনে ভাবিল, না যদি দেই তবে হয়ত ইহারা অভিসম্পাত দিবে। শত হইলেও তালেম–এলেম! ইহাদের কথা আল্লা শোনে। নিজের অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে দুই চামচ মাছের ঝোল তাহাদের পাতে ঢালিয়া দিল।
খাইয়া লইয়া হোটেলওয়ালারে ভাতের দাম দিয়া তাহারা আবার সেই মসজিদের ঘরে আসিয়া বসিল! স্কুলের ঘন্টা কখন পড়িয়া গিয়াছে। তবু বছির বই-পত্র লইয়া স্কুলের পথে রওয়ানা হইল।
বিকালে স্কুলের ছুটির পর সে মজিদের আস্তানায় ফিরিয়া আসিল। তখন মাদ্রাসার আর আর ছেলেরাও আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। মজিদ তাহাদের কাছে বছিরকে পরিচিত করাইয়া দিল। যাহারা সব সময় অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করিতেছে তাহারাই অভাবী লোকের দুঃখ সকলের আগে বুঝিতে পারে। মাদ্রাসার ছেলেরা সকলেই বছিরকে আপনজনের মত গ্রহণ করিল।
কথায় কথায় তাহারা আলাপ করিতে লাগিল, আজ বিকালে তাহারা কোথায় খাওয়ার ব্যবস্থা করিবে? ছাত্রদের মধ্যে করিম একটি রোগা-পটকা ছেলে। পড়াশুনা বিশেষ কিছুই করে না কিন্তু কোথায় কাহার বাড়ি ফাতেহা হইবে, কোথায় বিবাহ উপলক্ষে ভোজের ব্যবস্থা হইবে, তার সমস্ত খবর সে সংগ্রহ করিয়া আনে। সেই জন্য সঙ্গী-সাথীরা তাহাকে বড়ই ভালবাসে। মজিদ করিমকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “করিম ভাই! বল ত আজ তুমি আমাগো জন্যি কুন জায়গায় দাওয়াতের বন্দোবস্ত করছাও?”
করিম বলিল, “চিন্তা কইর না বাই! আজ খান বাহাদুর সায়েবের মায়ের ফাতেহা। এহনই চল! খতম পড়তি অবি। যার যার ছিপারা লয়া চল।”
বছির মজিদের কানে কানে বলিল, “আমি যে বাল আরবী পড়তি জানি না।”
মজিদ বলিল, “আমরাই কি বাল মত জানি বাই? তোমারে একখান ছিপারা দিব। আমাগো মতন দুইলা দুইলা পড়ার অভিনয় করবা। কেউ টের পাবি না।”
ইতিমধ্যে হোটেলে যাইয়া যে ভাবে মজিদ মাছের ঝোল চাহিয়া লইয়াছে তাহা বছিরের মনঃপুত হয় নাই। এখন আবার আল্লার কোরান শরীফ লইয়া পড়ার অভিনয় করিতে তাহার কিছুতেই মন উঠিতেছিল না।
সে মজিদকে বলিল, “ভাই! তোমরা সগলে যাও। সকালে আমি এত খাইছি যে আমার মোটেই ক্ষিধা নাই। তাছাড়া আল্লার কালাম লয়া মিথ্যা অভিনয় করবার পারব না।”
মজিদ বলিল, “ভাই বছির! আল্লার দইনায় কোন সত্য আর কোন মিথ্যা কওন বড় মুস্কিল! আমরা যে এমন কইরা আধ পেটা খায়া আল্লার কালাম পড়তাছি আর খান বাহাদুর সাবরা কতক খায় কতক ফেলায়া দ্যায়। একবারও আল্লার নাম মুহি আনে না! এডাই কি আল্লার হুকুম? আমরা বইসা বইসা কোরান শরীফ পড়ব আর তার ছওয়াব পাইব খান বাহাদুর সাবের মরা মা, এডাই কি সত্য! বাইরে! আমাগো বাইচা থাকার চায়া সত্য আর দুইনায় নাই। অতসব ভাবতি ঐলি আর লেহা পড়া করতি অবি ন্যা। বাড়ি যায় লাঙল ঠেলতি অবি।” এই বলিয়া বছিরকে টানিয়া লইয়াই তাহারা খান বাহাদুর সাহেবের বাড়ি রওয়ানা হইল।
পরদিন সকালে বছির তার বই-পুস্তক লইয়া পড়িতে বসিল! খান বাহাদুর সাহেবের বাড়ি যাইয়া রাতের খাওয়া ত তাহারা খাইয়াই আসিয়াছে। তাহার উপরে এক একজন পঁচ সিকা করিয়া পাইয়াছে। সুতরাং দুইদিনের জন্য আর তাহাদিগকে ভাবিতে হইবে না।
পরদিন সকালে মসজিদের বারান্দায় আরও অনেকগুলি নূতন তালেব-এলেম আসিয়া যার যার কেতাব সামনে করিয়া সুর করিয়া পড়িতে লাগিল। বলা বাহুল্য মজিদ ও তার বন্ধুরা আসিয়াও তাহাদের সঙ্গে যোগ দিল। সকলে সুর করিয়া যখন পড়িতেছিল দূর হইতে মনে হইতেছিল, মসজিদে যেন হাট বসিয়াছে। কিছুক্ষণ পরে ইমাম সাহেব। আসিলেন। তাহাকে দেখিয়া সকল ছাত্র দাঁড়াইয়া সিলামালকি দিল। তিনিও যথারীতি উত্তর প্রদান করিয়া আসন গ্রহণ করিলেন। দুইজন ছাত্র তাড়াতাড়ি যাইয়া ইমাম সাহেবকে বাতাস করিতে লাগিল। ইহার পুরস্কার স্বরূপ তিনি তাহাদিগের প্রতি চাহিয়া একটু মৃদু হাসিলেন। তাহাতেই যেন তাহারা কৃতার্থ হইয়া আরও জোরে জোরে পাখা চালাইতে লাগিল।
