দেখিতে দেখিতে চারিদিক অন্ধকার করিয়া রাত্র আসিল। কোন্ গ্রাম্য-চাষীর মেয়েটি যেন আকাশের নীল কথাখানার উপর একটি একটি করিয়া তারার ফুল বুনট করিয়া তুলিতেছিল। তাহারই নকল করিয়া সমস্ত গ্রামের অন্ধকার কথাখানার উপর একটি একটি করিয়া সান্ধ্য প্রদীপের নক্সা বুনট হইতেছিল। ছোট্ট ছেলে বছির। অত শত ভাবিতে পারিল কিনা জানি না। কিন্তু বাহিরের এই সুন্দর প্রকৃতি তার অবচেতন মনে কি এক প্রভাব বিস্তার করিয়া রাত্রের গানের আসরের জন্য তাহার অন্তরে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী করিতেছিল। উদাস নয়নে বছির বাহিরের আকাশের পানে বহুক্ষণ চাহিয়াছিল। ফকিরনীর গান শুনিয়া তাহার চমক ভাঙ্গিল।
ক্ষুধার হয়েছে বেলা
এখন ভাইঙ্গা আইস গোঠের খেলারে
–কানাই রাখাল ভাবে।
“আমার গোপাল! মুখোনি খিদায় মৈলাম হয়া গ্যাছে। বাজান! চল খাইবার দেই।” আঁচল দিয়া জড়াইয়া ধরিয়া ফকিরনী বছিরকে ঘরে লইয়া গেল। মাটির সানকীতে করিয়া ভাত আর লাউ শাক। পাতের এক পাশে দুইটা কুমড়াফুল ভাজা। এই সামান্য খাবার। ফকিরনী বলে, “বাজান! আর কি খাইওয়াবো তোমারে। আমাদের গোপালের ভোগে এই। শাক আর ভাত!”
বছির আস্তে আস্তে খায়। ফকিরনী পুত্র-স্নেহের ক্ষুধার্ত দৃষ্টি লইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া থাকে। বছিরের খাওয়া যখন শেষ হইয়াছে, ফকিরনী গান ধরিল–
কি দিয়ে ভজিব তোর রাঙা পায়,
আমার মনে বড় ভয় দয়ালরে।
গানের সুর শুনিয়া ফকির তাহার সারিন্দা বাজাইয়া ফকিরনীর কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাইল। ফকিরনী গাহিতে লাগিল,
দুগ্ধ দিয়া ভজিব তোরে
সেও দুধ বাছুরিতি খায়।
চিনি দিয়া ভজিব তোরে
সে চিনি পিঁপড়ায় লইয়া যায়।
কলা দিয়া ভজিব তোরে
সেও কলা বাদুরিতি খায়।
মন দিয়া ভজিব তোরে
সেও মন অন্য পথে ধায়।
দয়ালরে–
আমি কি দিয়া ভজিব তোর রাঙা পায়!
ফকিরনীর এই রকম ভাব-সাব দেখিয়া বছিরের বড়ই লজ্জা করে। সে বুঝিতে পারে না, তাহাকে উপলক্ষ করিয়া তাহারা এরূপ করে কেন? ফকিরনী নিজে বছিরের হাতমুখ ধোয়াইয়া আঁচল দিয়া তাহার মুখ মুছিয়া দিল। তারপর তাহারা দুইজনে খাইতে বসিল।
ইতিমধ্যে ও-পাড়া হইতে ফকিরের দুই তিনজন শিষ্য আসিল, সে-পাড়া হইতে জয়দেব বৈরাগী তাহার বৈষ্টমীকে সঙ্গে করিয়া আসিল। জয়দেবের কাঁধে একটি দোতারা। সে আসিয়াই দোতারায় তার যোজনা করিতে লাগিল। ফকির হাতমুখ ধুইয়া তাহার সারিন্দা লইয়া বসিল। সারিন্দার তারগুলি টানিয়া ঠিক করিতে করিতে তাহার শিষ্যদিগকে বলিল, “আইজ আমার শ্বশুর আইছে গান হুনবার। তোমরা বাল কইরা গীদ গাইও।”
জয়দেব বছিরের লাবণ্য ভরা শ্যামল মুখোনির দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া বলিল, “আপনার শ্বশুর কিন্তু আমার কাছে আমার কেষ্ট ঠাকুর। আইজ বৃন্দাবন ছাইড়া আইছে। আমাগো বজ্রবাসীগো অবস্থা দেখপার জন্যি। দেখছেন না, কেমন টানা টানা চোখ ঠাকুরের। আর গায়ের রূপে যেন তমাল লতার বন্নক। এবার হাতে একটা মোহন বাঁশী থাকলেই একেবারে সাক্ষাৎ কেষ্ট ঠাকুর হৈত! মানুষের মধ্যেই ত রূপে রূপে বিরাজ করেন তিনি। যারে দেইখ্যা বাল লাগে তারির মদ্দিই ত আইসা বিরাজ করেন ঠাকুর।”
ফকির বলিল, “এবার তবে আমার শ্বশুরকে গান শুনাই।” প্রথমে বন্দনা গান গাহিয়া ফকির গান ধরিল,
কে মারিল ভাবের গুলি
আমার অন্তর মাঝারে,
এমন গুলি মাইরা চইলা গ্যাল
একবার দেখল না নজর করে।
জগাই বলে ওরে মাধাই ভাই!
শিকার খেলিতে আইছে গয়ুর নিতাই;
আমার এত সাধের পোষা পাখি
নিয়া গ্যাল হরণ করে।
গান গাহিতে গাহিতে ফকির আর গাহিতে পারে না। হাতের সারিন্দা রাখিয়া অঝোরে কান্না করে। সঙ্গের শিষ্যেরা একই পদ বার বার করিয়া গাহে,
জগাই বলে ওরে মাধাই ভাই!
শিকার খেলিতে আইছে গয়ূর নিতাই;
আমার এত সাধের পোষা পাখি
নিয়া গ্যাল হরণ করে।
তারপর ফকির গান ধরিল,
ও দীন বন্ধুরে
আমি ভাবছিলাম আনন্দে যাবে দিন।
বাল্যকাল গ্যাল ধূলায় খেলায়
আমার যৈবুন গ্যাল হেলায় ফেলায়,
এই বৃদ্ধকালে ভাঙল দিনের খেলারে।
জঙ্গলে জঙ্গলে ফিরি,
আমি আইলা ক্যাশ নাহি বান্দি হে;
আমি তোরো জন্যে হইলাম পাগলিনীরে।
শুনেছি তোর মহিমা বড়,
তুমি পাতকী তরাইতে পার হে;
আমার মতন পাতক কেবা আছে ভবেরে।
এই গান শেষ করিয়া ফকির আরও কতকগুলি গান গাহিল।
আমার ফকিরের বাড়ি নদীর ওপারে। এ-পারে বসিয়া আমি তাহার জন্য কান্দিয়া মরি। হাতে আসা বগলে কোরান সোনার খড়ম পায়ে দিয়া আমার ফকির হাঁটিয়া হাঁটিয়া যায়–তার মুখে মৃদু মৃদু হাসি। সকলে বলে আমার দয়াল কেমন জনা। আন্ধার ঘরে যেমন কাঞ্চা সোনা জ্বলে, কাজলের রেখার উপর যেমন চন্দনের ছটা, কালিয়া মেঘের আড়ে যেমন বিজলির হাসি তেমনি আমার দয়াল চান। তার তালাশে আমি কোন দেশে যাইব?
চাতক হইয়া আমি মেঘের দিকে চাহিয়া থাকি। মেঘ অন্য দেশে ভাসিয়া যায়। আশা করিয়া আমি বাসা বাধিলাম। আমার আশা বৃক্ষের ডাল ভাঙিয়া গেল।
গান গাহিতে গাহিতে ফকির আর গাহিতে পারে না। তাহার সমস্ত অঙ্গ কি এক ভাবাবেশে দুলিতে থাকে। জয়দেব বৈরাগী তখন গান ধরিল,–
আমি বড় আশা কইরা দয়াল ডাকিরে তোরে,
আমি বড় আফসোস কইরা দয়াল ডাকিরে তোরে।
হাপন যদি বাপ মা হইতারে দয়াল চান!
ও লইতা ধূল ঝাইড়া কোলেরে।
কোলের ছেলে দূরে না ফেইলারে দয়াল চান!
তুমি রইলা কোন দ্যাশেরে।
যেনা দেশে যাইবা তুমিরে দয়াল চান!
আমি সেই দেশে যাবরে।
চরণের নূপুর হয়ারে দয়াল চান!
ও তোমার চরণে বাজিবরে।
