এই মেয়েটির কথায় যেন স্নেহের শতধারা বহিয়া যাইতেছে। তাহার মা বড়ই লাজুক। ছেলেকে আড়াল-আবডাল হইতে ভালবাসে। এই মেয়েটির মত এমন মিষ্টি করিয়া কথা বলিতে পারে না। আজ এমন স্নেহ-মমতার কথা শুনিয়া বছিরের চোখ হইতে পানি গড়াইয়া পড়িতে চাহে।
ফকির বলিল, “বাজানরে ক্যাবল মিঠা মিঠা কতা শুনাইলিই চলবি না। এত দূরের পথ হাঁইটা আইছে। কিছু খাওনের বন্দোবস্ত কর।”
“তাই ত! আমার ত মনেই পড়ে নাই। বাজান! তুমি বইয়া ফকিরের লগে কথা কও। আমি আইত্যাছি!”
তাড়াতাড়ি ফকিরের বউ এক বদনা পানি আনিয়া দিল হাত পা ধুইতে। তারপর সাজিতে করিয়া কিছু মুড়ি আর একটু গুড় আনিয়া বলিল, “বাজান খাও।” যতক্ষণ বছির খাইল ফকিরের বউ এক দৃষ্টিতে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। সুন্দর শ্যামল মুখোনি বছিরের। কচি ধানপাতার সমস্ত মমতা কে যেন সেখানে মাখাইয়া দিয়াছে। ফকিরের সন্তান হয় নাই। কিন্তু এই কিশোর বালকটিকে ঘিরিয়া কোন স্নেহের শতধারায় যেন তার সমস্ত অন্তর ভরিয়া যাইতেছে। ঘরে ত বিশেষ কিছু খাবার নাই। সামান্য কিছু আতপ চাউল আর গুড় যদি থাকিত, তবে সে মনের মত করিয়া কত রকমের পিঠা তৈরী করিয়া এই কিশোর-দেবতাটির ভোগ দিত। টাটকা মুড়ি চিবাইতে চিবাইতে বছিরের মুখে যে শব্দ হইতেছিল; একান্তে বসিয়া ফকির-বউ সেই শব্দ শুনিতে লাগিল। ফকিরের সারিন্দা বাজানও বুঝি কোনদিন তার কাছে এমন মিষ্টি লাগে নাই।
খাওয়া শেষ হইলে ফকিরের বউ বলিল, “বাজান! তোমারে কিবা খাওয়াইমু। যার লগে আমারে বিয়া দিছিলা হে আমারে বালুর চরায় ঘর বাইন্দ্যা দিছে। একটা ঢেউ আইসাই ঘর ভাইঙ্গা যাবি। কি ঠগের লগেই আমারে জুইড়া দিছিলা, শিশিরের গয়না দিল গায়–না দেখতেই সে গয়না উইবা গেল। কুয়াশার শাড়ী আইন্যা পরাইল, গায়ে না জড়াইতেই তা বাতাসে উড়ায়া নিল। শুধু সিন্তার সিন্দুরখানিই কপাল ভইরা আগুন জ্বাইলা রইল।”
এই বলিয়া ফকির-বউ গান রিল। ফকিরও সারিন্দা বাজাইয়া তাহার সঙ্গে যোগ দিল।
কে যাসরে রঙিলা নার মাঝি!
সামের আকাশরে দিয়া,
আমার বাজানরে কইও খবর,
নাইওরের লাগিয়ারে।
গলুইতে লিখিলাম লিখন সিস্তার সিন্দুর দিয়া,
আমার বাপের দেশে দিয়া আইস গিয়া
–রে রঙিলা নার মাঝি!
আমার বুকের নিশ্বাস পালে নাও ভরিয়া,
ছয় মাসের পন্থ যাইবা ছয় দণ্ডে চলিয়া,
–রে রঙিলা নার মাঝি!
গান গাহিতে গাহিতে ফকির আর ফকিরনী কাঁদিয়া আকুল হইতেছিল। মাঝে মাঝে গান থামাইয়া ফকির সারিন্দা বাজাইতেছিল আর ফকিরনী চোখের পানি ফেলিতেছিল।
পরের ছেলের সঙ্গে বাজান আমায় দিলা বিয়া,
একদিনের তরে আমায় না দেখলা আসিয়া।
এই গান শেষ করিয়া ফকিরনী বলিল, “বাজান! একদিনও ত ম্যায়ারে দেখতি আইলা । আমি যে কত পন্থের দিকে চায়া থাহি।” ফকিরী-কথার যে অন্তনিহিত ভাব বছির তাহা বুঝিতে পারে না কিন্তু গানের সুরের কি এক মাদকতা তাহাকে যেন পাইয়া বসিল।
বছিরকে কোলের কাছে বসাইয়া ফকিরনী আবার গান ধরিল,
ও তুমি আমারে বারায়া গেলারে
কানাই রাখাল ভাবে।
তোরো মা যে নন্দ রানী,
আজকে কেন্দে গোপাল পাগলিনীরে;
–কানাই রাখাল ভাবে।
এখন ক্ষুধার হয়েছেরে বেলা,
তুমি ভেঙে আইস গোঠের খেলারে;
–কানাই রাখাল ভাবে।
কতদিন যে নাহি শুনি।
তোরো মুখে মা বোল ধ্বনিরে,
–কানাই রাখাল ভাবে।
এই গানের পিছনে হয়ত কত গভীর কথা লুকাইয়া আছে তাহা বছির বুঝিতে পারে না। কিন্তু গানের সুরে সুরে এই পুত্র-হীনা মেয়েটির সমস্ত অন্তর স্নেহের শতধারা হইয়া তাহার দেহে-মনে বর্ষিত হইতেছে তাহা যেন আবছা আবছা সে বুঝিতে পারে।
গান শেষ করিয়া ফকিরনী বলিল, “বাজান! আইজ তুমি আমাগো এহানে বেড়াও। রাত্তিরে আরও অনেক লোক আসপ্যানে। তোমারে পরান বইরা গান শুনাবানে।”
ফকিরনীর কথায় এমন মধুঢ়ালা যে বছির না বলিতে পারিল না। ফকির তার সারিন্দায়। নতুন তার লাগাইতে বসিল। বছির উঠানে দাঁড়াইয়া এ-দিক ওদিক দেখিতে লাগিল। ছোট্ট একখানা বাকা দুইচালা ঘর ফকিরের। তার সঙ্গে একটি বারান্দা। সেখানে সাত আটজন লোক বসিতে পারে। সামনে ছোট্ট উঠানখানা সুনিপূণ করিয়া লেপা-পোছা। তারই পাশে লাউ কুমড়ার জাঙলা। কত লাউ ধরিয়াছে। ওধারে জাঙলা ভরিয়া কনে-সাজানী শিমলতা লালে-নীলে মেশা রঙে যেন সমস্ত উঠানখানি আলো করিয়া আছে। ওধারে শিমূল গাছে কত ফুল ফুটিয়া ঝরিয়া পড়িতেছে। গাছের ডালে ডালে কুটুম পাখি, বউ কথা কও পাখি, ডাকিয়া ডাকিয়া এইসব ফুলের রঙ যেন গানের সুরে ভরিয়া মহাশূন্যের উপর নক্সা আঁকিতেছে। বাড়ির সামনে দিয়া গ্রাম্য-হালটের পথ দূরের মাঠ পার হইয়া আকাশের কোলে কালো কাজল রেখা আঁকা অজানা কোন গ্রামে মিশিয়া কোথায় উধাও হইয়া গিয়াছে। কেউ পথের উপর এখানে সেখানে গরুর পাল লইয়া রাখাল ছেলেরা নানারূপ শব্দ করিয়া ঘরে ফিরিতেছে। কোন কোন রাখাল গ্রাম্য-যাত্রায় গাওয়া কোন বিলম্বিত লয়ের গানের একটি কলি বার বার গাহিয়া গোধূলীর উদাস মেঘেভরা সমস্ত আকাশখানিকে আরও উদাস করিয়া দিতেছে। গরুর পায়ের খুরের শব্দ সেই গানের সঙ্গে যেন তাল মিলাইতেছে। পিছনে যে ধূলী উড়িয়া বাতাসে ভাসিতেছে তাহার উপরে সন্ধ্যার রঙ পড়িয়া কি এক উদাস ভাব মনে জাগাইয়া দিতেছে। বছির মনে মনে ভাবে, ফকিরের এই গ্রামখানার মাঠ, ঘাট, পথে, বাড়ি-ঘর, ফুল-ফলের গাছ সকলে মিলিয়া যেন বৃহত্তর একটি সারিন্দা-যন্ত্র। এই যন্ত্র সকালে বিকালে রাত্রে প্রভাতে এক এক সময় এক এক সুরে বাজিয়া সমস্ত গ্রামের মর্মকথাটি যেন আকাশে বাতাসে ছড়াইয়া দেয়। তারই ক্ষুদ্র প্রতীক করিয়া গ্রাম্য-ফকির তাহার সারিন্দাটি গড়িয়া লইয়াছে। তাহার সুরের মধ্যেও গ্রামের প্রাণ-স্পন্দন শোনা যায়।
