বহুক্ষণ দুইজনে নীরবে সেই কবরের পাশে বসিয়া রহিল। দুইজনের চোখ হইতেই ফোঁটায় ফোঁটায় অশ্রু ধারা গড়াইয়া পড়িয়া কবরের মাটি সিক্ত করিতে লাগিল।
এই মূক কবরের তলা হইতে বড় যেন জাগিয়া উঠিয়া বছিরের কানে কানে বলিতেছে, “মিঞা ভাই! পানি পানি করিয়া আমি মরিয়াছি। তুমি এমন কাজ করিও, আমার মত আর কাউকে যেন এমনি পানি পানি কইরা মরতি না হয়।”
মনে মনে বছির আবার প্রতিজ্ঞা করিল, “সোনা বইন! তুমি ঘুমাও! আমি জাগিয়া রহিব। যতদিন না আমি তোমার মত সকল ভাই-বোনের দুঃখ দূর করিতে পারি ততদিন জাগিয়া থাকিব। দুঃখের অনল দাহনে নিজের সকল শান্তি সকল আরাম-আয়াস তিলে তিলে দান করিব। সোনা বইন! তুমি ঘুমাও–ঘুমাও!”
ভাবিতে ভাবিতে বছির উঠিয়া দাঁড়াইল। ফুলীও তাহার সঙ্গে সঙ্গে আসিল। ফুলী ভাবিয়াছিল, বছির ভাইকে সে সঙ্গে লইয়া বনের ধারে ডুমকুর ফল টুকাইবে। সে নিজে পাকা ডুমকুরের এক গাছ মালা গাথিয়া তাহার গলায় পরাইয়া দিবে। সেই মালা পাইয়া তাহাকে সুখী করিবার জন্য বছির গাছে উঠিয়া তাহার জন্য কানাই লাঠি পাড়িয়া দিবে। কিন্তু বছিরের মুখের দিকে চাহিয়া সে কোন কথাই বলিতে পারিল না। ধীরে ধীরে বাড়ি পৌঁছিয়া বছির তাহার বই-পুস্তক লইয়া বসিল। ফুলী অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিয়া একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়িয়া সেখান হইতে চলিয়া গেল।
দেখিতে দেখিতে গ্রীষ্মের ছুটি ফুরাইয়া আসিতেছে কিন্তু বছির একদিনও তার বই-পুস্তক ছাড়িয়া ঘরের বাহির হইল না। শহরে থাকিতে সে কত জল্পনা-কল্পনা করিয়াছ! দেশে যাইয়া এবার সে সজারুর কাটা টুকাইতে গভীর জঙ্গলে যাইবে। ঘন বেতের ঝোঁপের ভিতর হইতে বেথুন তুলিয়া আনিবে। তল্লা বাঁশের বাঁশী বানাইয়া পাড়া ভরিয়া বাজাইবে। বাঁশের কচি পাতা দিয়া নথ গড়িয়া ফুলীকে নাকে পরিতে বলিবে, কিন্তু ছুটির কয় দিন সে তার বই-পুস্তক ছাড়িয়া একবারও উঠিল না। সন্ধ্যা হইলে সামনের মাঠে যাইয়া বসে। তখনও পাঠ্যবই তার কোলের উপর।
ফুলী কতবার আসিয়া ঘুরিয়া যায়। ডুমকুর গাছ ভরিয়া কাটা। সেই কাটায় ক্ষত-বিক্ষত হইয়া ফুলী পাকা ডুমকুর তুলিয়া মালা গাঁথে। তারপর মালা লইয়া বছিরের সামনে আসিয়া অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকে। বছির একবারও তাহার দিকে ফিরিয়া চাহে না। বহুক্ষণ এইভাবে থাকিয়া সে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া চলিয়া যায়। যাইবার সময় বছিরের মা ডাকে, “ও ফুলী। এহনি যে চললি? আয়, তোর মাথার চুল বাইন্দা দেই।”
ফুলী ফিরিয়া চাহিয়া বলে, “না চাচী! আমার চুল বান্ধন লাগবি না। বাড়িতি আমার কত কাম পইড়া আছে। মা যেন আমারে কত গাইল-মন্দ করত্যাছে! আমি এহন যাই।”
যাইতে যাইতে সেই ডুমকুর গাছটির তলায় যাইয়া ফুলী সদ্য গাথা মালাগাছটিকে ছিঁড়িয়া কুটি কুটি করে। তারপর কোন সাত সাগরের পানি আসিয়া তার দুই চক্ষে ঢলিয়া পড়ে। অতটুকু মেয়ে। কি তার মনের ভাব কে বলিতে পারে!
.
৩২.
বাড়ি হইতে শহরে আসিয়া বছির অনেক খবর পাইল, কমিরদ্দী সরদারের নামে জমিদার খাজনার নালিশ করিয়াছেন। তা ছাড়া সেদিনের মারামারি উপলক্ষ করিয়া থানার পুলিশ তাহাকে ও তাহার ছেলেকে গ্রেফতার করিয়াছে। এইসব মামলার তদবির-তালাশী করিতে কমিরদ্দী সরদারকে তার এত সখের দৌড়ের নৌকাখানা অতি অল্প টাকায় বিক্রী করিতে হইয়াছে। কারণ আশে পাশের গ্রামগুলিতে উকিল সাহেবের লোকেরা প্রচার করিয়া দিয়াছেন, মুসলমান হইয়া যাহারা নৌকা বাইচ খেলাইবে তাহারা দোজখে যাইয়া জ্বলিয়া-পুড়িয়া মরিবে, আর তাহাদিগকে একঘরে করিয়া রাখা হইবে। সুতরাং মুসলমান হইয়া কে সেই বাইচের নৌকা কিনিবে? সাদীপুরের এছেম বেপারী মাত্র ষাট টাকা দিয়া এত বড় নৌকাখানা কিনিয়া সেই নৌকা লইয়া এখন পাটের ব্যবসা করিতে আরম্ভ করিয়াছে। গ্রামের লোকেরা এখন আর কমিরদ্দী সরদারের কথায় ওঠে বসে না। তাহারা নানা দলে বিভক্ত হইয়া একে অপরের ক্ষতি করিতে চেষ্টা করিতেছে। গ্রামে ঝগড়া মারামারি লাগিয়াই আছে। আজ উহার পাটের খেত ভাঙিয়া আর একজন ধান বুনিয়া যাইতেছে। কেহ লাঙল বাহিবার সময় পার্শ্ববর্তী লোকের জমির কিছুটা লাঙলের খোঁচায় ভাঙিয়া লইতেছে। এইসব উপলক্ষে বহুলোক রমিজদ্দীন সাহেবের বাসায় যাইয়া মামলা দায়ের করিতেছে। উকিল সাহেবের পশার এত বাড়িয়াছে যে এখন আর তিনি গ্রাম-দেশে নিজে যাইয়া বক্তৃতা করিবার অবসর পান না। আঞ্জুমাননে ইসলামের মৌলবী সাহেবরা এ-গ্রামে সে-গ্রামে যাইয়া যথারীতি বক্তৃতা করেন। মাঝে মাঝে উকিল সাহেব আঞ্জুমানে ইসলামের জমাত আহ্বান করেন। গ্রামের লোকদের নিকট হইতে চাদা তুলিয়া সেই টাকায়। কলিকাতা হইতে বক্তা আনাইয়া বক্তৃতা করান। চারিদিকে উকিল সাহেবের জয় জয়কার পড়িয়া যায়। ডিষ্ট্রিক্ট বোর্ডের ইলেকসনে উকিল সাহেব বহু ভোট পাইয়া মনোনীত হইয়াছেন। উকিল সাহেবের বাসায় লোকজনের আরও ভীড়।
এইসব গণ্ডগোলে বছিরের পড়াশুনার আরও ব্যাঘাত হইতে লাগিল। রাস্তার লাইট পোস্টের সামনে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া পড়াশুনা করিতে রাত্র জাগিয়া তাহার শরীর আরও খারাপ হইয়া পড়িল।
এক শনিবার বছির বাড়ি যাওয়ার নাম করিয়া সন্ধ্যাবেলা আরজান ফকিরের বাড়ি যাইয়া উপস্থিত হইল। ফকির তাহাকে সস্নেহে ধরিয়া একটি মোড়ার উপর আনিয়া বসাইল। ফকিরের বউ আসিয়া আঁচল দিয়া তাহার মুখ মুছাইতে মুছাইতে বলিল, “আমার বাজান বুঝি তার ম্যায়ারে দেখপার আইছে? ও বাজান! এতদিন আস নাই ক্যান?”
