এই সব সভায় সাধারণতঃ বেশী লোক জমা হয় না। কিন্তু সভা হইবার ঘণ্টাখানেক আগে জমিদার সাহেবের তিন চারজন পেয়াদা তকমাওয়ালা চাপকানের উপর জমিদারের নিজ নাম অঙ্কিত চাপরাশ ঝুলাইয়া যখন অহঙ্কারী পদক্ষেপে সভাস্থলে আসিতেছিল তখন গ্রামবাসীদের চক্ষে তাক লাগিয়া গেল। তারপর জমিদার সাহেব নিজে যখন তাঁহার তাজী ঘোড়াটায় চড়িয়া গ্রামে প্রবেশ করিলেন তখন গ্রামের কুকুরগুলির সহিত ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা তাঁহার পিছে পিছে যে ভাবে শব্দ করিয়া ছুটাছুটি করিতে লাগিল, তাহাতে গ্রামবাসীদের কৌতূহল চরমে পৌঁছিল। তাহারা দল বাঁধিয়া সভাস্থলে আসিয়া উপস্থিত হইল। জমিদার সাহেবের ঘোড়ার পিঠে সুদৃশ্য গদি, গলায় নকসী চামড়ার সঙ্গে নানা রকমের ঘুঙুর। সেই ঘুঙুর আবার ঘোড়ার নড়নে-চড়নে বাজিয়া উঠিতেছে। দেখিয়া দেখিয়া গ্রামবাসীদের সাধ মেটে না। কেহ কেহ সাহস করিয়া জমিদার সাহেবের বরকন্দাজদের সঙ্গে কথা বলিয়া নিজেকে ধন্য মনে করে। তাহারা কি সহজে কথা বলে? তিন চারটি প্রশ্ন করিলে এক কথার উত্তর দেয়। এও কি কম সৌভাগ্য? মূল জমিদার সাহেবের দিকে কেহ ফিরিয়াও তাকায় না।
কিছুক্ষণ পরে সভা আরম্ভ হইল। উকিল সাহেব দাঁড়াইয়া প্রস্তাব করিলেন, “জন-দরদী প্রজাবৎসল জমিদার মিঃ সরাজান চৌধুরী সাহেব এই সভায় তসরিফ এনেছেন। জমিদারী। সংক্রান্ত বহু জরুরী কার্য ফেলিয়া তিনি শুধু আপনাদের খেদমতের জন্যই এখানে আসিয়াছেন। আমি প্রস্তাব করি তিনি এই সভায় সভাপতির পদ অলঙ্কত করুন।”
মাওলানা সাহেব এই প্রস্তাব সমর্থন করিলেন। জমিদার সাহেব সভাপতির জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারে আসিয়া উপবেশন করিলেন।
প্রথমে মাওলানা সাহেব বক্তৃতা আরম্ভ করিলেন! গোর আজাব হইতে আরম্ভ করিয়া হজরতের ওফাত পর্যন্ত শেষ করিয়া তিনি বলিতে লাগিলেন, “ভাই সাহেবানরা! বড়ই আফসোসের কথা, আপনাদের এই গ্রামের কমিরদ্দী সরদার মুসলমান ভাইগো সঙ্গে লয়া পদ্মা নদীতে নৌকা বাইচ খেলায়। তার চায়াও আফসোসের কথা, সেই নৌকা বাইচ খেলানো হয় হিন্দুগো পূজা-পার্বণের দিনি। আরও আফসোসের কথা, কমিরদ্দী সরদার। তার বাড়িতি জারী গানের আসর বসায়। বিচার গানের বাহেজ করায়। আমার খোদাওন। তালা জাল্লেজালালুহু কোরান শরীফে ফরমাইয়াছেন, যে গানের দল বায়না করে, নৌকা বাইছ দ্যায় এমন লোককে পয়জার মাইরা শায়েস্তা করা প্রত্যেক মোমিন মুসলমানের পক্ষে ফরজ। আইজ আপনাগো এহানে আমরা আইছি দেহনের লাইগা, আপনারা এই। নাফরমানি কাজের কি বিচারডা করেন।”
এমন সময় একটি যুবক উঠিয়া বলিল, “সভাপতি সাহেব! এই সভায় আমি কিছু বলতে চাই।”
মাওলানা সাহেব সভাপতির কানে কানে বলিলেন, “ওই যুবকটি কলেজে পড়ে–কমিরদ্দী সরদারের পুত্র।”
কিন্তু সভাপতি সাহেব মাওলানা সাহেবের ইঙ্গিত বুঝিলেন না। তিনি ভাবিলেন, এই যুবক হয়ত মাওলানা সাহেবকেই সমর্থন করিবে। প্রকাশ্যে বলিলেন, “আচ্ছা! শোনা যাক যুবকটি কি বলতে চায়।”
যুবকটি এবার বলিতে আরম্ভ করিল, “ভাই সকল! ইতিপূর্বে আপনারা মাওলানা সাহেবের বক্তৃতা শুনেছেন। আমার পিতা হিন্দুর তেহারের দিন দৌড়ের নৌকাখানি নিয়া বাচ খেলান। আপনারা সকলেই জানেন, ইসলাম ধর্মের মূলনীতি হল একতা, সকলে দলবদ্ধ হয়ে থাকা! আল্লার এবাদত বন্দেগী করতেও তাই দলবদ্ধ হয়ে করার নির্দেশ। যে জামাতে যত লোক সেখানে নামাজ পড়লে তত ছওয়াব। আপনারা সকলেই ঈদের দিন মাঠে যেয়ে নামাজ আদায় করেন। সেখানে লক্ষ লোক একত্র হয়ে নামাজ পড়েন। এর। অন্তর্নিহিত কথা হল শত্রু-পক্ষীয়রা জানুক মুসলমানেরা সংখ্যায় কত–তাহাদের একতা। কত দূর। ইসলামের নির্দেশ মত লক্ষ লক্ষ লোক নামাজের সময় নীরবে ওঠে বসে। জগতের কোন জাতির মধ্যে এমন শৃঙ্খলা দেখা যায় না। আমার পিতা যে নৌকা বাইজ খেলান তাহাতেও গ্রামবাসীদের মধ্যে একতা বৃদ্ধি পায়। মুসলমান ভাইদের নিয়ে আমার পিতা যে হিন্দুর পূজা-পার্বণে নৌকা বাইজ খেলান তার পেছনেও একটা সত্য আছে। আপনারা জানেন, মাঝে মাঝে আমাদের দেশে নমু মুসলমানে দাঙ্গা হয়। ক গ্রামের লোকের সঙ্গে অপর গ্রামের লোকের দাঙ্গা হয়। আমাদের গ্রামের ইজ্জত যাতে রক্ষা হয় সেজন্য আমাদের সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হয়! সেবার দীগনগরের হাটে আমাদের গ্রামের লস্কর তালুকদার মুরালদার লোকদের হাতে মার খেয়ে এলো। পরের হাটে আমাদের লোকজন দলবদ্ধ হয়ে মুরালদার লোকদের বেদম মারপিট করে এলো। সেই হতে আমাদের গ্রামের লোকদের সবাই ভয় করে চলে। হিন্দুর পূজা-পার্বণে বহুলোক একত্র জমা হয়। সেখানে নৌকা বাচ খেলে আমার পিতা প্রতিপক্ষদের নৌকাগুলিকে হারিয়ে দিয়ে আসেন। হাজার হাজার লোক জানতে পারে, ভাজনডাঙার লোকদের শক্তি কত। তাই কেউ আমাদের বিপক্ষে দাঁড়াতে সাহস করে না। এক কালে হয়ত হিন্দু মুসলমানে রেশারেশি ছিল। তাই হিন্দুর উৎসবের দিন হাজার হাজার হিন্দুর মধ্যে মুসলমানেরা দৌড়ের নৌকা নিয়ে তাদের প্রতাপ দেখিয়ে আসত। সেই থেকে হয়ত হিন্দুর পূজা-পার্বণে মুসলমানের নৌকা বাচ খেলান রেওয়াজ হয়েছে। আমার পিতা হিন্দুর তেহারে নৌকা বাচ খেলান কিন্তু হিন্দুর পূজায় অংশ গ্রহণ করেন না। হিন্দুর প্রতিমাকে খোদা বলেও সেজদা। করেন না। বরঞ্চ হিন্দুর উৎসবে মুসলমান পয়গাম্বরদের কাহিনী গানের মাধ্যমে প্রচার। করে আসেন। আমি ত কতবার দেখেছি, আমাদের দৌড়ের নৌকা থেকে ইমাম হোসেনের জারী গান শুনে বহু হিন্দু অশ্রু বিসর্জন করেছে। আপনারা আজ যদি আমাদের গ্রামের লোকদের মধ্যে বাচ খেলানো বন্ধ করেন তবে আমাদের গ্রামের একতা নষ্ট হয়ে যাবে। গ্রামের লোকদের সঘবদ্ধ হয়ে কাজ করার ক্ষমতা কমে যাবে।”
