ফকির বলিল, “না বউ! উনারে থাকুনের কইও না। আমরা উনারে রাইখা কিবা খাওয়াব। আর কিবা আদর করব।”
বছির বলিল, “আপনারা আমারে যে আদর করলেন, এমন আদর শুধু মা-ই আমারে করছে। আমার ত ইচ্ছা করে সারা জমন আপনাগো এহানে থাহি। কিন্তুক উকিলসাব যদি শোনেন আমি আপনাগো এহানে আইছি তয় আমারে আর আস্ত রাখপি না। ফকির সাব! ওরা আপনার সারিন্দাডারে ভাইঙা ফালাইছে। আমি এই আট আনার পয়সা আনছি। আমার বাপ-মাও বড় গরীব। এর বেশী আমি দিবার পারলাম না। এই আটআনা দিয়া একটা কাঁঠাল গাছের কাঠ কিন্যা আবার সারিন্দা বানাইবেন।”
ফকির বছিরকে আদর করিয়া ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কও ত বাজান! এই পয়সা তুমি কোথায় পাইলা?”
বছির বলিল, “আমি যখন বাড়ি থইনে আসি তহন আমার মা আমারে দিছিল। আর কয়া দিছিল এই পয়সা দিয়া তোর ইচ্ছামত কিছু কিন্যা খাইস। আমি ত উকিলসাবের বাড়িই দুই বেলা খাই। আমার আর পয়সা দিয়া কি অবি? তাই আপনার জন্যি আনলাম।”
শুনিয়া ফকির কাঁদিয়া ফেলিল, “বাজান! আপনার পয়সা লয়া যান। ওরা আমার কাঠের সারিন্দা বাঙছে কিন্তুক মনের সারিন্দা বাঙতি পারে নাই। সারিন্দা বাঙা দেইখা ও-পাড়ার ছদন শেখ আমারে কাঁঠালের কাঠ দিয়া গ্যাছে। দু’এক দিনির মদ্দিই আবার সারিন্দা বানায়া ফেলাব। একদিন আইসা বাজনা শুইনা যাইবেন।”
ফকিরের নিকট হইতে বিদায় লইয়া বছির আবার সেই আঁকা-বাঁকা গেঁয়ো-পথ ধরিয়া খেয়াঘাটের দিকে চলিল। তাহার মনে কে যেন বসিয়া আনন্দের বাঁশী বাজাইতেছে। দুই পাশে মটরশুটির খেত। লাল আর সাদায় মিলিয়া সমস্ত খেত ভরিয়া ফুল ফুটিয়া আছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে মটরশুটির ফুলগুলি। প্রত্যেক ফুলের দুইটি পর সাদা! মাঝখানে সিঁদুরে রঙের বউটি যেন বসিয়া আছে। বাতাসে যখন মটরশুটির ডগাগুলি দুলিতেছিল বছিরের মনে হইতেছিল তার বোন বড় বুঝি তার হাজার হাজার খেলার সাথীদের লইয়া সেই খেতের মধ্যে লুকোচুরি খেলিতেছিল। মরিয়া সে কি এই খেতে আসিয়া ফুল হইয়া ফুটিয়া আছে?
অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া বছির এই খেতের পানে চাহিয়া রহিল। তারপর একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়িয়া সামনের দিকে আগাইতে লাগিল। এবার পথের দুই পাশে সরিষার খেত। সমস্ত খেত ভরিয়া সরিষার হলদে ফুল ফুটিয়া চারিদিকে গন্ধ ছড়াইতেছে। সমস্ত চর যেন আজ বিয়ের হলদী কোটার শাড়ীখানা পরিয়া বাতাসের সঙ্গে হেলিতেছে দুলিতেছে। ফকিরের বাড়ি যাইবার সময় বছির এই খেতের মধ্য দিয়াই গিয়াছে। কিন্তু তখন এই খেতে যে এত কিছু দেখিবার আছে তাহা তাহার মনেই হয় নাই। গ্রাম্য-ফকিরের স্নেহ-মমতা যেন তার চোখের চাহনিটিতে রঙ মাখাইয়া দিয়াছে। সেই চোখে সে দেখিতেছে, হাজার হাজার নানা রঙের প্রজাপতি ডানা মেলিয়া এ-ফুল হইতে ও-ফুলে যাইয়া উড়িয়া পড়িতেছে। তাহাদের পাখায় ফুলের রেণু মাখানো! ফোঁটা সরিষার গন্ধে বাতাস আজ পাগল হইয়াছে। সেই গন্ধ তাহার বুকে প্রবেশ করিয়া সমস্ত চরখানিতে যেন হলুদের ঢেউ খেলিতেছে। মাঝে মাঝে দমকা বাতাস আসিয়া চরের উপর দিয়া বহিয়া যাইতেছিল। সেই বাতাসে সরষে গাছগুলি হেলিয়া যাইয়া আবার খাড়া হইয়া উঠিতেছিল। বছির দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া অনেকক্ষণ এই ছবি দেখিল। বাতাস যেন হলুদ শাড়ী-পরা, চরের মেয়ের মাথায় চুলগুলিতে বিলি দিতেছে। খেতের মধ্যেও কত কি দেখিবার! দুধালী লতাগুলি সরষে গাছের গা বাহিয়া সাদা ফুলের স্তবক মেলিয়া হাসিতেছে। মাঝে মাঝে মটরের লতা, গা ভরা লাল ফুলের গহনা। সেখান দিয়া লাল ফড়িংগুলি রঙিন ডানা মেলিয়া নাচিয়া বেড়াইতেছে। দেখিয়া দেখিয়া বছিরের সাধ যেন আর মেটে না। ওদিকে বেলা পশ্চিম আকাশে হেলিয়া পড়িয়াছে। আর ত দেরী করা যায় না। আস্তে আস্তে বছির খেয়াঘাটের দিকে পা বাড়াইল। চলিতে চলিতে তার কেবলই মনে হইতেছিল, এমন সুন্দর করিয়া মাঠকে যাহারা ফুলের বাগান করিতে পারে কোন অপরাধে তারা আজ পেটের ভাত সংগ্রহ করিতে পারে না?
.
৩০.
উকিল সাহেবের বাড়ি পৌঁছিয়া বছির তাহার বইগুলি সামনে লইয়া বসিল। যেমন করিয়াই হউক পড়াশুনায় ভাল তাহাকে হইতে হইবে। সেই আট আনার পয়সা দিয়া সে একটি কেরোসিনের কুপী আর কিছু কেরোসিন তৈল কিনিয়া আনিল। তারপর উকিল সাহেব যখন নয়টার পর তার হারিকেন লণ্ঠনটি লইয়া অন্দরে চলিয়া গেলেন সে তাহার কুপী জ্বালাইয়া পড়িতে বসিল।
এইভাবে দশ বার দিন পরে তার কেনা কেরোসিন তৈল ফুরাইয়া গেল। তখন সে ভাবিতে বসিল, কি করিয়া পড়াশুনা করা যায়? সামনে রাস্তার উপর একটি বাতি জ্বলিতেছিল সে তাহার পড়ার বইখানি লইয়া রাস্তার সেই বাতিটির নিচে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া পড়িতে আরম্ভ করিল। কতদিন পড়িতে পড়িতে পা অবশ হইয়া আসে। কিন্তু শরীরের কষ্টের দিকে চাহিলে ত তাহার চলিবে না। সে পড়াশুনা করিয়া বড় ডাক্তার হইবে। দেশের। চারিদিকে নানান নির্যাতন চলিতেছে। বড় হইয়া সে এই নির্যাতন দূর করিবে। তার ত শারীরিক কষ্টের দিকে চাহিলে চলিবে না।
ইতিমধ্যে বছির ও মাওলানা সাহেবকে সঙ্গে লইয়া উকিল সাহেব আরও তিন চারটি গ্রামে যাইয়া বক্তৃতা করিলেন। ভাজন ডাঙা গ্রামে কমিরদ্দী সরদার নামডাকের লোক। তাহার অবস্থাও আশেপাশের সকলের চাইতে ভাল। উকিল সাহেব খবর পাইলেন, সে ইসলামের নিয়ম-কানুন বরখেলাপ করিয়া পদ্মা নদীতে দৌড়ের নৌকা লইয়া বাইচ খেলায় আর তার বাড়িতে গানের দল আনিয়া মাঝে মাঝে জারী গানের আসর বসায়। ইহাতে আশেপাশের যত সব মুসলমান ভাইরা গোমরাহ হইয়া যাইতেছে। সুতরাং এই গ্রামে যাইয়াই সকলের আগে উকিল সাহেব তার দীন ইসলামী ঝাণ্ডা তুলিবেন। লোক মারফত তিনি আগেই শুনিয়াছিলেন, কমিরদ্দী সরদার খুব নামডাকের মানুষ। শত শত লোক তাহার হুকুমে ওঠে বসে। তাই এবারের সফরে স্থানীয় জমিদার সরাজান চৌধুরী সাহেবকে তিনি সঙ্গে করিয়া লইলেন।
