যুবকটির বলিবার ভঙ্গী এমনি চমৎকার যে সভায় লোক নীরবে তার কথাগুলি শুনিতেছিল। উকিল সাহেব ধূর্তলোক। দেখিলেন, এই যুবকের বক্তৃতায় সভার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হইয়া যায়। তিনি মাওলানা সাহেবের কানে কানে কি বলিলেন। মাওলানা সাহেব যুবকটিকে থামাইয়া দিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “মিঞা, যে এত বক্তৃতা করতাছাও, মুহির দাড়ি কাইটা ত এহেবারে নমশূদ্রের মত দেখতি ঐছ। আর ইংরাজী বাঙলা নাছারা কিতাব ত অনেক পড়ছাও। কোরান কিতাবের কোন খবরনি রাহ? মিঞাসাবরা! এই বেদাড়ি নাছারার ওয়াজ কি আপনারা হুনবেন?”
যুবকটি কি বলিতে যাইতেছিল। সভাপতি সাহেব তাহাকে থামাইয়া বলিলেন, “চুপ কর, তুমি বেয়াদপ। ময়মুরব্বী চেন না। মাওলানা সাহেবকে বলতে দাও।”
মাওলানা সাহেব আরম্ভ করিলেন, “ভাই সাহেবানরা! আমার খোদা কইছেন, এমন দিন আইব যহন আলেম-ওস্তাদের কথা লোকে শুনব না। নাছারা লোকের কথায় মানষি কান দিব। কিন্তু আপনাগো কয়া যাই, আইজ যদি আপনারা এই কমিরদ্দী সরদারের বিচার না করেন তয় এহানে আমি জান কবজ কইরা দিব। আল্লার কোরান আগুনে পুড়াইয়া দিব, সগল মুসলমানগো আপনারা কি এমনি গোমরাহ হয়া থাকতি বলেন? আমাগো হুজুর জমিদার সাহেব! তানির কাছেও আমি বিচারডা সঁইপা দিয়া এই আমি বইলাম। কমিরদ্দী সরদারের বিচার যতদিন না অবি, রোজ কেয়ামত পর্যন্ত আমি এহানে বয়া থাকপ।”
মাওলানা সাহেব আসন গ্রহণ করিলে জমিদার সাহেব কমিরী সরদারকে ডাকিয়া বলিলেন, “মিঞা! তোমার দৌড়ের নৌকাখানা তুমি আজ নিজ হাতে ভাঙবে কিনা সেই কথা বল?”
কমিরদ্দীন বলিলেন, “আমার পুলাপানরে যেমুন আমি বালবাসি তেমনি বালবাসি আমার নাওখানা। আমার জান থাকতি এই বাইচের নৌকা ভাঙবার দিব না।”
জমিদার সাহেব তখন বললেন,”মিঞা! মনে থাকে যেন তোমার কাছে আমি বছরে পঁচিশ টাকা খাজনা পাই। সে খাজনা নালিশ না করে নেব না। তোমার ভিটায় যেদিন ঘুঘু চরবে সেদিন তোমার খাজনা চাব! বেশ, তোমার বাইচের নৌকা তুমি কেমন করে চালাও তাই আমি দেখব।”
মাওলানা সাহেব বলিয়া উঠিলেন, “হুজুর! অতদুর যাওনের দরকার নাই। আপনার পেয়াদাগো একটা হুকুম দ্যান। কমিরীকে বাইন্দা ফেলাক। দেহি এর শরীয়তে বিচার। করতি পারি কিনা?”
জমিদার সাহেবকে হুকুম দিতে হইল না। তিন চারজন পেয়াদা কমিরদ্দী সরদারকে আসিয়া আক্রমণ করিল। সরদার হাতের লাঠিখানায় এক ঘুরান দিয়া তাহাদিগকে ফেলিয়া দিল। তখন গ্রামের দুই দলে মারামারি আরম্ভ হইল! গ্রামে যাহারা কমিরদ্দী সরদারের ঐশ্বর্য দেখিয়া ঈর্ষা করিত তাহারা জমিদার সাহেবের পক্ষ লইল। বাড়ি বাড়ি হইতে বোঝায় বোঝায় সড়কি লাঠি আনিয়া এ-দলে ও-দলে তুমুল দাঙ্গা চলিল। ইতিমধ্যে মাওলানা সাহেব তাহার কেতাব কোরান বগলে করিয়া পালাহঁয়া জান বাঁচাইলেন। জমিদার সাহেব থানায় খবর দিবার ওজুহাতে ঘোড়ায় সোয়ার হইয়া চলিলেন। উকিল সাহেব বহুপূর্বেই বছিরকে সঙ্গে লইয়া সভাস্থল ত্যাগ করিয়াছেন।
ইহার পর দুই দলের মধ্যে সদর কোর্টে মামলা চলিতে লাগিল। উকিল সাহেবের বৈঠকখানা বহু লোকের সমাগমে পূর্বের চাইতে আরও সরগরম হইতে লাগিল।
এই ঘটনার পর উকিল সাহেব কিছুদিনের জন্য গ্রাম দেশে সভা-সমিতি করিতে আর বাহির হইলেন না। তাহার প্রয়োজনও ছিল না। কারণ তাহার বৈঠকখানায় লোকজনের আনাগোনা দেখিয়া প্রতিদিন দুএকজন মামলাকারী আসিয়া তাহাকে উকিল নিযুক্ত করিতে লাগিল।
এই সব ঝামেলার মধ্যে বছিরের পড়াশুনার বড়ই ব্যাঘাত হইতে লাগিল। এখন আর উকিল সাহেব গ্রামদেশে বক্তৃতা করিতে যান না বলিয়া তাহার ভাগ্যে প্রতি রবিবারে যে ভাল খাবার জুটিত তাহা বন্ধ হইয়া গেল। দুই বেলা সামান্য ডাল ভাত খাবার খাইয়া তাহার শরীর দিনে দিনে কৃশ হইতে লাগিল। স্কুলের ছুটির পর এমন ক্ষুধা লাগে। তখন সে নিকটস্থ পানির কল হইতে এক গ্লাস পানি আনিয়া ঢোক ঢোক করিয়া গেলে। তাহাতে উপস্থিত পেটের ক্ষুধা নিবারণ হয় বটে, কিন্তু খালি পেটে পানি খাইয়া মাঝে মাঝে বেশ। পেটে ব্যথা হয়। সন্ধ্যাবেলা বই-পুস্তক সামনে লইয়া বসে আর ঘড়ির দিকে চাহে। কখন। নয়টা বাজিবে। কখন উকিল সাহেব অন্দরে ঢুকিবেন। বাড়ির চাকর যখন অল্প পরিমাণ ভাত আর সামান্য ডাল লইয়া তার ঘরে ঢোকে তখন তার মনে হয় কোন ফেরেস্তা যেন তাহার জন্য বেহেস্তী খানা লইয়া আসিয়াছে। সেই ডালভাত সম্পূর্ণ খাইয়া সে টিনের থালাখানা ধুইয়া যে পানিটুকু পায় তাহাও খাইয়া ফেলে।
কতদিন রাত্রে ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া স্বপ্নে দেখে কোথায় যেন সে গিয়াছে। তাহার মায়ের মতই দেখিত একটি মেয়ে কত ভাল ভাল খাবার নিজ হাতে তুলিয়া তাহাকে খাওয়াইতেছে। ঘুম ভাঙিলে সে মনে মনে অনুতাপ করে, আহা! আর যদি একটু ঘুমাইয়া থাকিতাম তবে আরও কিছুক্ষণ ধরিয়া সেই ভাল ভাল খাবারগুলি খাওয়ার আনন্দ পাইতে পারিতাম। শহরের কোথাও মিলাদ হইলে সে সুযোগ পাইলেই রবাহূত ভাবে সেখানে যায়। তার নিজ গ্রামে কোথাও মিলাদ হইলে সমবেত লোকদিগকে ভুরীভোজন করানো হয়। শহরের মিলাদে সেরূপ খাওয়ানো হয় না। কোথাও শ্রোতাদিগের হাতে মাত্র চার পঁচখানা বাতাসা বা একখানা করিয়া জিলাপী দেওয়া হয়। শুধু এই সামান্য দু’একখানা বাতাসা বা জিলাপীর লোভেই সে মিলাদে যায় না। ওয়াজ করিবার সময় মৌলবী সাহেব যখন বেহেস্তের বর্ণনা করেণ সেই বেহেস্তে গাছে গাছে সন্দেশ, রসগোল্লা ধরিয়া আছে। ইচ্ছামত পাড়িয়া খাও। হাত বাড়াইলেই বেহেস্তী মেওয়ার গাছের ডাল নামিয়া আসে। কত আঙ্গুর, বেদানা, ডালিম! মানুষে আর কত খাইবে। এই সব বর্ণনা শুনিতে তার ক্ষুধার্ত দেহ কোথাকার যেন তৃপ্তিতে ভরিয়া যায়। বোধ হয়, এই জন্যই গ্রামের অনাহারী লোকদের। কাছে মিলাদের ওয়াজ এত আকর্ষণীয়।
