নদী পার হইয়া বছির চরের পথ দিয়া হাঁটিতে লাগিল। বর্ষা কবে শেষ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু ছোট ছোট ঢেউগুলি বালুর উপর যে নকসা আঁকিয়া গিয়াছিল, তাহা এখনও মুছিয়া যায় নাই। কত রকমেরই না নকসা। কোথায় বালুর উপর এঁটেল মাটির প্রলেপ। রৌদ্রে ফাটিয়া নানা রকমের মূর্তি হইয়া আসিতেছে। তার উপর দিয়া পা ফেলিতে মন চায় না। দুএক টুকরা মাটির নকসা হাতে লইয়া বছির অনেকক্ষণ দেখিল। প্রকৃতির এই চিত্রশালা কে আসিয়া দেখিবে! হয়ত কোন অসাবধান কৃষাণের পায়ের আঘাতে একদিন এই নকসাগুলি গুঁড়ো হইয়া ধূলিতে পরিণত হইবে। সেই ধূলি আবার বাতাসে ভর করিয়া নানা নকসা হইয়া সমস্ত চর ভরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইবে। এদিকে ওদিকে ঘুরিয়া বছির পথ চলে, নকসাগুলো যাহাতে পায়ের আঘাতে ভাঙিয়া না যায়। তবুও দোমড়ানো মাটি পায়ের তলায় মড় মড় করিয়া ওঠে। মূক-মাটি যেন তাহার সঙ্গে কথা বলিতে চায়। চরের পথ ছাড়িয়া নলখাগড়ার বন। তারপর চৈতালী খেত। তার পাশ দিয়া পথ গরুর পায়ের ক্ষুরে ক্ষত-বিক্ষত। সেই পথ দিয়া খানিক আগাইয়া গেলে নাজির মোল্লার ডাঙি, তারপর মোমিন আঁর হাট। তার ডাইনে ঘন কলাগাছের আড়াল দেওয়া ওই দেখা যায় আরজান ফকিরের বাড়ি। বাড়ি ত নয়, মাত্র একখানা কুঁড়ে ঘর। উঠানে লাউ-এর জাঙলা কত লাউ ধরিয়া আছে। শিমের জাঙলায় কত শিম ধরিয়া আছে।
দুর হইতে বছির গান শুনিতে পাইল :
“যে হালে যে হালে রাখছাওরে
দয়ালচান তুই আমারে
ও আমি তাইতে ভাল আছিরে।
কারে দিছাও দালান কোঠা।
ও আল্লা আমার পাতার ঘররে।
কারে খাওয়াও চিনি সন্দেশ
ও আল্লা আমার খুদের জাওরে।
ফকির গান করিতেছে আর কাঁদিতেছে। বছির অনেকক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়াইয়া তাহার গান শুনিতে লাগিল। এ ত গান নয়। অনাহারী সমস্ত মানবতার মর্মন্তুদ আর্তনাদ। কিন্তু দুঃখে এরা শুধু কাঁদে-আল্লার কাছে মূক-মনের কথা নিবেদন করে। কাহারো প্রতি ইহাদের কোন অভিযোগ নাই। শুধু একজনের কাছে দুঃখের কথা কহিয়া শান্তি পায়। যুগ যুগ হইতে ইহারা নীরবে পরের অত্যাচার সহ্য করিয়া চলিয়াছে। সমস্ত দুনিয়ার যে মালিক সেই কম্পিত একজনকে তাহাদের দুঃখের কথা বলিয়া তাহারা হয়ত কিঞ্চিৎ শান্তি পায়। আহারে! সেই দুঃখ প্রকাশের গানও তাহাদের নিকট আজ নিষিদ্ধ হইল!
গান শেষ করিয়া ফকির বছিরকে দেখিয়া গামছা দিয়া চক্ষু মুছিয়া বলিল, “বাজান! আরও কি অপরাধের বিচার করনের আইছেন? আমার শাস্তির কি শেষ ঐল না?” এবার বছির ফুপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল। মুখ দিয়া বলিতে পারিল না, “ফকিব সাহেব! আপনার সারিন্দা যাহারা ভাঙিয়াছে আমি তাহাদের দলে নই।” ছেলেমানুষ এখনও মনের কথা গুছাইয়া বলিতে শেখে নাই। আরজান ফকির সবই বুঝিতে পারিল। বছিরকে বুকের কাছে লইয়া তার ছেঁড়া কাঁথার আসনে আনিয়া বসাইল। কিন্তু বছিরের কান্না আর কিছুতেই আসে না। ফকির গামছা দিয়া বছিরের মুখোনি মুছাইয়া বলিল, “বাজান! তোমার রূপ ধইরা আল্লা আমার গরে আইছেন। যেদিন ওরা আমার সারিন্দা বাঙল সেদিন বুঝলাম আমার দরদের দরদী এই সয়াল সংসারে কেওই নাই। আইজ তুমারে দেইখা মনে ওইল, আছে–আমার জন্যিও কান্দুইনা আছে।”
এমন সময় ফকিরের বউ আসিয়া বলিল, “আমাগো বাড়ির উনি কার সঙ্গে কতা কইত্যাছে?” দরজার সামনে যেন পটে আঁকা একটি প্রতিমা। পঞ্চাশ বৎসরের বৃদ্ধা। সমস্ত গায় চম্পকবর্ণ যেন ঝকমক করিতেছে। রাঙা মুখোনি ভরা কতই স্নেহ। দেখিয়া ‘মা’ বলিতে প্রাণ আঁকুবাকু করে?
ফকির হাসিয়া বলিল, “দেখ আইসা, আমার বাজান আইছে।”
বউ বলিল, “না, তোমার বাজান না আমার বাজান?”
বউ দুইহাত দিয়া বছিরের মুখোনি মুছিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কও ত বাজান! তুমি আমার বাজান না ওই বুইড়া ফকিরের বাজান?”
লজ্জায় বছির মাটির সঙ্গে মিশিয়া যাইতেছিল।
ফকির বলিল, “তোমার বাজান না আমার বাজান সে কথা পরে মিমাংসা করবানে। এবার বাজানের জন্যি কিছু খাওনের জোগাড় কর।”
কথাটি শুনিয়া যেন ফকির-গৃহিণীর মুখখানা কেমন হইয়া গেল। ফকির বলিল, “বউ! তুমি অত বাবছ ক্যান। জান না কেষ্ট ঠাকুর কত বড়লোকের দাওয়াত কবুল না কইরা। বিদুরের বাড়িতে খুদের জাউ খাইছিল। যা আছে তাই লয়া আস। আমি এদিকে বাজারে। গীদ হুনাই।” ফকির গান ধরিল–
“আমি কি দিয়া ভজিব তোর রাঙা পায়;
দুগ্ধ দিয়া ভজিব তোরে
সেও দুধ বাছুরিতে খায়।
চিনি দিয়া ভজিব তোরে
সেও চিনি পিঁপড়ায় লয়া যায়।”
গান শেষ হইতে না হইতেই ফকিরের স্ত্রী সামান্য খুদ ভাজিয়া লইয়া আসিল। দুইটি শাখআলু আগেই আখায় পোড়ানো হইয়াছিল। একটি পরিষ্কার নারিকেলের আচিতে ভাজা খুদ আর মাটির সানকিতে সেই পোড়া শাখআলু দুইটি আনিয়া বছিরের সামনে ধরিল। আগের মতই দুই হাত দিয়া তাহার মুখ সাপটাইয়া বলিল, “বাজান! গরীব ম্যায়ার বাড়ি আইছাও। এই সামান্য খাওয়াটুকু খাও।”
অনেক সাধ্য-সাধনা করিয়া ফকির-বউ সেই ভাজা খুদটুকু সব বছিরকে দিয়া খাওয়াইল। তারপর নিজের হাতে সেই পোড়া আলু দুইটার খোসা ছাড়াইয়া বছিরের মুখে তুলিয়া দিল। খাওয়া শেষ হইলে বছির আরজান ফকিরকে বলিল, “বেলা পইড়া যাইতাছে। আমি এহন যাই।”
ফকিরের বউ বলিস, “ক্যা বাজান! আইজ আমাগো এহানে থাকলি অয় না?” বছির বলিল, “থাকুনের যো নাই। উকিল সাহেবের কাছে না কয়া গোপনে আপনাগো এহানে আইছি। তিনি জানতি পারলি আর রক্ষা থাকপি না।”
