চারিদিকের লোকজনের মধ্যে থমথমা ভাব। আরজান ফকিরের সারিন্দার কাহিনী ত সকলেরই জানা। তাহারা মনে মনে ভাবিতে লাগিল, এখানে এমন কিছু ঘটিয়া যাক। যাহাতে ফকিরের সারিন্দাটি রক্ষা পাইতে পারে। কিন্তু কেহই সাহস করিয়া কোন কথা বলিতে পারিল না।
উকিল সাহেব দেখিলেন, আরজান ফকির এই কথাগুলি বলিয়া সভার মন তাহার দিকে ফিরাইয়া লইতেছে। তিনি মাওলানা সাহেবকে বলিলেন, ”আপনি আলেম মানুষ। নায়েবে নবী। কোরান কেতাব দেখে বিচার করেন। এই ভণ্ড-ফকিরকে এসব আবোল-তাবোল বলবার কেন অবসর দিচ্ছেন?”
মাওলানা সাহেব তখন হাঁটুর সঙ্গে ধরিয়া সারিন্দাটি ভাঙিবার চেষ্টা করিলেন। সারি-কাঁঠাল কাঠের সারিন্দা। সহজে কি ভাঙিতে চাহে? সমবেত লোকেরা এক নিবাসে চাহিয়া আছে। কাহার আদরের ছেলেটিকে যেন কোন ডাকাত আঘাতের পর আঘাত করিয়া খুন করিতেছে। কিন্তু ইসলামের আদেশ-কোরান কেতাবের আদেশ। নায়েবে নবী মাওলানা সাহেব স্বয়ং সেই আদেশ পালন করিতেছেন। ইহার উপর ত কোন কথা বলা যায় না।
হাঁটুর উপর আটকাইয়া যখন সারিন্দাটি ভাঙা গেল না, তখন মাওলানা সাহেব মাটির উপর আছড়াইয়া সারিন্দাটি ভাঙিতে লাগিলেন। কসাই যেমন গরু জবাই করিয়া ধীরে ধীরে তাহার গা হইতে চামড়া উঠাইয়া খণ্ড খণ্ড করিয়া মাংসগুলি কাটিয়া লয়, সেইভাবে মাওলানা প্রথম আছাড়ে সারিন্দার খোল ভাঙিয়া ফেলিল। পাখিশুদ্ধ সারিন্দার মাথাটি সামনে মুখঠাসা দিয়া পড়িল। তবু সেই মাথা তারের সঙ্গে আটকাইয়া আছে! টান দিয়া সেই তার ছিঁড়িয়া সারিন্দার খোলের উপরে সানকুনী সাপের ছাউনি ছিঁড়িয়া মাওলানা সাহেব সারিন্দাটিকে দুই তিন আছাড় মারিলেন। সারিন্দার গায়ে নৃত্যরতা মেয়েগুলি যাহারা এতদিন হাত ধরাধরি করিয়া কোন উৎসবের শরিক হইতে সামনের দিকে আগাইয়া চলিতেছিল তাহারা এখন খণ্ড খণ্ড কাঠের সঙ্গে একে অপর হইতে চিরকালের জন্য বিচ্ছিন্ন হইয়া গেল। খুনী যেমন কাহাকে খুন করিয়া হাপাইতে থাকে, সারিন্দাটি ভাঙ্গা শেষ করিয়া মাওলানা সাহেব জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলিতে লাগিলেন।
আরজান ফকির জিজ্ঞাসা করিলেন, “বাজানরা! আমারে দিয়া ত আপনাগো কাম শেষ ঐছে। আমি এহন যাইতি পারি?”
মাওলানা সাহেব বলিলেন, “হ্যাঁ। তুমি এখন যাইতে পার।”
আরজান ফকির নীরবে সভাস্থান হইতে উঠিয়া চলিয়া গেল। সভার কার্যও শেষ হইল।
সমবেত লোকেরা একে একে যাহার যাহার বাড়ি চলিয়া গেল। কি এক বিষাদে যেন অধিকাংশ গ্রামবাসীর অন্তর ভরিয়া আছে।
রাত্রে গ্রামের মাতবর সাহেবের বাড়িতে কত রকমের পোলাও, কোর্মা, কালিয়া, কাবাব প্রভৃতি খাবার প্রস্তুত হইয়াছিল। মাওলানা সাহেব আর উকিল সাহেব নানা গাল-গল্প করিয়া সে সব আহার করিলেন। বছির সেই উপাদেয় খাদ্যের এতটুকুও মুখে দিতে পারিল না। তাহার কেবলই মনে হইতেছিল, এই সৌম্যদর্শন গ্রাম্য-ফকিরের মাথার চুল সে-ই যেন কাটিয়াছে আর তাহার সারিন্দাটি সে-ই যেন নিজ হাতে ভাঙিয়া চূর্ণবিচূর্ণ করিয়াছে।
.
২৯.
উকিল সাহেবের বাসায় ফিরিয়া আসিয়া বছিরের কিছুতেই পড়াশুনায় মন বসে না। সব সময় আরজান ফকিরের সৌম-মূর্তিখানি তাহার মনে উদয় হয়! আহা! হাতের সারিন্দাটি ভাঙিয়া ফেলায় তার যেন কতই কষ্ট হইতেছে। কি বাজাইয়া সে এখন ভিক্ষায় যাইবে। তার বাজনা শুনিয়াই ত লোকে তাহাকে দুচার পয়সা দেয়। এখন কি আর লোকে তাহাকে সাহায্য করিবে?
উকিল সাহেবের বাড়ির ভাত যেন তার গলা দিয়া যাইতে চাহে না। গ্রামে গ্রামে তাহাকে সঙ্গে লইয়া উকিল সাহেব কোরান কেতাবের দৃষ্টান্ত দিয়া বিচারের নামে যে সব অবিচার করেন, সেজন্য সে যেন নিজেই দায়ী। তাহাকে চাকরের মত খাটাইয়া রোজ দুইবেলা চারটে ভাত দেওয়া হয়। ইহাতেও গ্রাম্য সভায় যাইয়া উকিল সাহেবের কত বাহাদুরী। ছোট হইলেও সে এসব বোঝে। কিন্তু সকল ছাপাইয়া সেই গ্রাম্য-গায়ক আরজান ফকিরের কথা। কেবলই তাহার মনে হয়।
সেদিন কি একটা উপলক্ষ করিয়া স্কুল ছুটি হইয়া গেল। বছির বই-পুস্তক রাখিয়া আরজান ফকিরের বাড়ি বলিয়া রওনা হইল। লক্ষ্মীপুর ছাড়াইয়া সতরখাদা গ্রাম। তার উত্তরে পদ্মানদী। সেখানে খেয়া-পার হইলে মাধবদিয়ার চর। খেয়া নৌকায় কত লোক জমা হইয়াছে। আজ হাটের দিন। চরের লোকেরা হাট করিয়া বাড়ি ফিরিয়া যাইতেছে। সারি সারি ধামায় বাজারের সওদা রাখিয়া হাটুরে-লোকেরা গল্প-গুজব করিতেছে। কারো ধামায় ছোট্ট মাটির পাত্রে খেজুরের গুড়। দু’একটি পাকা আতা বা বেল। কেউ ইলিশমাছ কিনিয়া আনিয়াছে। বছির মনে মনে ভাবে এরা যখন বাড়ি পৌঁছিবে তখন হাটের সওদা পাইয়া এদের ছেলে-মেয়েরা কত খুশীই না হইবে। চরে ফল-ফলারির গাছ এখনও জন্মে নাই। তাই কেহ কেহ বেল কিনিয়া আনিয়াছে–কেহ খেজুর গুড় কিনিয়া আনিয়াছে। কি সামান্য জিনিস! ইহাতেই তাহাদের বাড়িতে কত আনন্দের হাট মিলিবে। যাহাদের আলতো পয়সা নাই, তাহারা শুধু তেল আর নুন কিনিয়া আনিয়াছে। হয়ত বাড়ির ছেলে-মেয়েদের কান্দাইয়া গাছের কলাগুলি, পাকা পেঁপেগুলি সমস্ত হাটে আনিয়া বেচিয়া শুধু তেল আর নুন কিনিয়াছে। শূন্য দুধের হাঁড়িগুলির মধ্যে নদীর বাতাস ঢুকিয়া হু হু করিয়া কাঁদিতেছে। দুধের অভাবে ওদের ছেলে-মেয়েদের যে কান্না–এ যেন সেই কান্না। সবাই কিছু না কিছু কিনিয়া আনিয়াছে। আহা! আরজান ফকিরের বুঝি আজ হাট হয় নাই! সারিন্দা বাজাইয়া গান করিতে পারিলে ত লোকে তাহাকে পয়সা দিবে?
