তাই তিনি হঠাৎ চেয়ার হইতে উঠিয়া বক্তৃতার সুরে বলিতে লাগিলেন, “ভাইসব! ভেবেছিলাম, আমাকে আর কিছু বলতে হবে না। এই ভণ্ড-ফকিরের কথা শুনে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। ইহার কথা আপনাদের কাছে আপাততঃ মিষ্ট হইতে পারে। ভাইসাবরা! একবার খেয়াল করে দেখবেন, শয়তান যখন আপনাদের দাগা দেয় এইরূপ মিষ্টি কথা বলেই আপনাদের বশে আনে। আপনারা আগেই আলেমদের কাছে শুনেছেন, গান গাওয়া হারাম! যে কাঠ কথা বলতে পারে না সেই কাঠে বাদ্য বাজানো হারাম। এই ভণ্ড-বেশী ফকির সারিন্দা বাজিয়ে গান করে। এই গান আসমানে সোয়ার হয়ে আল্লার আরশে যেয়ে পৌঁছে আর আল্লার আরশ কুরছি ভেঙে খানখান হয়। বিরাদারানে ইসলাম! এই ভণ্ড-ফকিরের মিষ্টি কথায় আপনারা ভুলবেন না। আমাদের খলিফা হযরত ওমর। (রাঃ) বিচার করতে বসে আপন প্রিয়-পুত্রকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন, মনসুর হাল্লাজকে শরীয়ত বিরোধী কাজের জন্য পারস্যের অপর একজন খলিফা তার অর্ধ অঙ্গ মাটিতে পুঁতে প্রস্তর নিক্ষেপ করে মারার হুকুম দিয়াছিলেন। ভাই সকল! এখন দীন ইসলামী সময় আর নাই। নাছারা ইংরেজ আমাদের বাদশা। এই ফকির যা অপরাধ। করেছে তাকে হত্যা করা হাদীসের হুকুম। কিন্তু তা আমরা পারব না। কিন্তু বিচার আমাদিগকে করতেই হবে। ভাই সাহেবরা! মনে রাখবেন, আপনারা সকলেই আজ কাজীর আসনে বসেছেন। খোদার কছম আপনাদের, কাজীর মতই আজ বিচার করবেন। আপনাদের প্রতিনিধি হয়ে মাওলানা সাহেব এই ফকিরের প্রতি কি শাস্তি হতে পারে তা কোরান কেতাব দেখে বয়ান করবেন। আপনারা ইহাতে রাজী?”
চারিদিক হইতে রব উঠিল, “আমরা রাজী।” তখন উকিল সাহেব মাওলানা সাহেবের কানে কানে কি বলিয়া দিলে মাওলানা সাহেব কোরান শরীফ হইতে একটি ছুরা পড়িয়া বলিলেন, “আল্লার বিচার মত এই ফকিরের মাথার লম্বা চুল কাইটা ফেলতি হবি। আর তার সারিন্দাটাও ভাইঙ্গা ফেলতি হবি।”
উকিল সাহেব বক্তৃতা শেষ করিলেন। দুই তিনজন লোক ছুটিল আরজান ফকিরের সারিন্দা আনিতে। এখন সমস্যা হইল কে ফকিরের মাথায় চুল কাটিবে। গ্রামের লোক কেহই তাহার চুল কাটিতে রাজী হয় না। কি জানি ফকির কি মন্ত্র দিবে। তাহাদের ক্ষতি হইবে। অবশেষে মাওলানা সাহেব নিজে ফকিরের মাথার চুল কাটিবার জন্য আগাইয়া আসিলেন। এমন সময় সভাস্থ দু’একজন লোক আপত্তি করিয়া উঠিল। একজন বলিয়া উঠিল, “আমরা জীবন গেলিও ফকির সাহেবের মাথার চুল কাটবার দিব না।”
আরজান ফকির মৃদু হাসিয়া বলিল, “বাজানরা! বেজার অবেন না। মাওলানা সাহেবের ইচ্ছা ঐছে আমার মাথার চুল কাটনের। তা কাটুন তিনি। খোদার ইচ্ছাই পূরণ হোক। বাজানরা! তোমরা গোসা কইর না। চুল কাটলি আবার চুল ঐব। আল্লার কাম কেউ রদ করতি পারবি না।”
মাওলানা সাহেব কাঁচি লইয়া আরজান ফকিরের মাথার চুল কাটিতে লাগিলেন। সেই কঁচির আঘাত যেন অশিক্ষিত গ্রামবাসীদের বুকের কোন সুকোমল স্থানটি কাটিয়া কাটিয়া খণ্ডিত বিখণ্ডিত করিতেছিল। কিন্তু কোরান হাদীসের কালাম যার কণ্ঠস্থ সেই মাওলানা সাহেবের কাজে তাহারা কোন বাধা দিতে সাহস করিল না। যতক্ষণ চুলকাটা চলিল, আরজান ফকিরের হাসি মুখোনি একটুকুও বিকৃত হইল না। কি এক অপূর্ব প্রশান্তিতে যেন তার শুক্র-শশ্রুভরা মুখোনি পূর্ণ।
এমন সময় দুই তিনজনে আরজান ফকিরের সারিন্দাটি লইয়া আসিল। কাঁঠাল কাঠের সারিন্দাটি যেন পূজার প্রতিমার মত ঝকমক করিতেছে। সারিন্দার মাথায় একটি ডানা-মেলা পাখি যেন সুরের পাখা মেলিয়া কোন তেপান্তরের আকাশে উড়িয়া যাইবে। সেই পাখির গলায় রঙ-বেরঙের পুঁতির মালা। পায়ে পিতলের নূপুর আর নাকে পল্লী-বধূদের। মত একখানা নথ পরানো। সারিন্দার গায়ের দুই পাশে কতকগুলি গ্রাম্য-মেয়ে গান গাহিতে গাহিতে নাচিয়া নাচিয়া কোথায় চলিয়াছে।
এই সারিন্দাটি আনিয়া তিন চারজন লোক মাওলানা সাহেবের হাতে দিল! সারিন্দাটির দিকে একবার চাহিয়া দেখিয়া আরজান ফকিরের মুখোনি হঠাৎ যেন কেমন হইয়া গেল। ফকির দাঁড়াইয়া উঠিয়া বলিল, “বাজানরা! আপনারা যা বিচার করলেন, আমি মাথা পাইত্যা নিলাম। কিন্তু এই মরা কাঠের সারিন্দা আপনাগো কাছে কোন অপরাধ করে নাই। এর উপরে শাস্তি দিয়া আপনাগো কি লাভ? আমার মাথার চুল কাটলেন। এত লোকের মদ্দি আমার বাল-মন্দ গাইলেন। আরও যদি কোন শাস্তি দিবার তাও দ্যান? কিন্তু আমার সারিন্দাডারে রেহাই দ্যান।”
মাওলানা সাহেব বলিলেন, “মিঞা! ও সকল ভণ্ডামীর কথা আমরা কেউ শুনবো না। কোরান কেতাব মত আমাকে কাজ করতি হবি। তোমার ওই সারিন্দা আমি ভাইঙ্গা ফ্যালব।”
ফকির আরও বিনীতভাবে বলিল, “বাজান! আমার এই বোবা সারিন্দাডারে ভাইঙ্গা আপনাগো কি লাভ ঐব? আমার বাপের আতের এই সারিন্দা। মউত কালে আমারে ডাইকা কইল, দেখরে আরজান! টাকা পয়সা তোর জন্যি রাইখা যাইতি পারলাম না। আমার জিন্দিগীর কামাই এই সারিন্দাডারে তোরে দিয়া গেলাম। এইডারে যদি বাজাইতি পারিস তোর বাতের দুঃখ ঐব না। হেই বাপ কতকাল মইরা গ্যাছে। তারির আতের এই সারিন্দাডারে বাজায়া বাজায়া দুঃখীর গান গাই। পেরতমে কি সারিন্দা আমার সঙ্গে কতা। কইত? রাইত কাবার কইরা দিতাম, কিন্তুক সারিন্দা উত্তর করত না। বাজাইতি বাজাইতি। তারপর যহন বোল দরল তহন সারিন্দার সঙ্গে আমার দুঃখীর কতা কইতি লাগলাম। আমার মতন যারা দুঃখিত তারা বাজনা শুইনা আমার সঙ্গে কানত। মাওলানাসাব! আমার এই সারিন্দাডারে আপনারা ভাঙবেন না। কত সভায় গান গায়া কত মানষির তারিফ বয়া। আনছি গিরামে, এই সারিন্দা বাজায়া! হেবার রসুলপুরীর সঙ্গে মামুদপুরীর লড়াই। দুই পক্ষে হাজার হাজার লাইঠ্যাল। কতজনের বউ যে সিন্তার সিন্দুর আরাইত, কতজনের মা যে পুত্ৰ লোগী ঐত সেই কাইজায়। কি করব, দুই দলের মদ্দিখানে যায়া সারিন্দায় সুর দিলাম। দুই দলের মানুষ হাতের লাঠি মাটিতি পাইতা সারিন্দার গান শুনতি লাগল। মাওলানাসাব! আমারে যে শাস্তি দিবার দ্যান, কিন্তু আমার সারিন্দাডারে বাঙবেন না।” এই কথা বলিয়া আরজান ফকির গামছা দিয়া চোখের পানি মুছিল।
