তখন গ্রামের মধ্যে কে গান করে, কে সারিন্দা বাজায় তাহাদিগকে ধরিয়া আনিয়া বিচার করা হয়।
এইভাবে সভা করিতে করিতে একবার উকিল সাহেব তাহার দলবল লইয়া পদ্মানদী পার হইয়া ভাসানচর গ্রামে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সেখানে খুব উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বক্তৃতা করিয়া উকিল সাহেব যখন বসিয়া পড়িলেন, তখন গ্রামের একজন লোক বলিল, “হুজুর! আমাগো গায়ের আরজান ফকির সারিন্দা বাজায়া গান গায়।”
উকিল সাহেব উপস্থিত লোকদিগকে বলিলেন, “আপনারা কেহ যাইয়া আরজান ফকিরকে ধরিয়া আনেন।” বলা মাত্র তিন চারজন লোক ছুটিল আরজান ফকিরকে ধরিয়া আনিতে।
অস্পক্ষণের মধ্যেই বছির দেখিল সৌম্যমূর্তি একজন বৃদ্ধকে তাহারা ধরিয়া আনিয়াছে। তাহার মুখে সাদা দাড়ী। মাথায় সাদা লম্বা চুল। বৃদ্ধ হইলে মানুষ যে কত সুন্দর হইতে। পায় এই লোকটি যেন তাহার প্রতীক। মুখোনি উজ্জ্বল হাসিতে ভরা। যেন কোন বেহেস্তের প্রশান্তি সেখানে লাগিয়া আছে। সে আসিয়া বলিল, “বাজানরা! আপনারা আমারে। বোলাইছেন? দয়ালচানগো এত কাইন্দা কাইন্দা ডাহি। দেহ দেয় না। আইজ আমার, কতই ভাগ্যি দয়ালচানরা আমারে ডাইকা পাঠাইছেন।”
এমন সময় শামসুদ্দীন মাওলানা সাহেব সামনে আগাইয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমার নাম আরজান ফকির?”।
ফকির হাসিয়া বলিল, “হয় বাজান! বাপ মা এই নামই রাইখাছিল।”
মাওলানা সাহেব জিজ্ঞাসা করিলেন, “মিঞা! তুমি মাথায় লম্বা চুল রাখিয়াছ কেন?”
“আমি ত রাখি নাই বাজান! আল্লাহ রাইখাছেন!”
“আল্লার উপর ত তোমার বড় ভক্তি দেখতে পাই! আল্লাহ কি তোমাকে লম্বা চুল রাখতে বলেছেন?”
“বাজান! লম্বাও বুঝি না খাটোও বুঝি না। হে যা দিছে তাই রইছে।”
“চুল কাটো নাই কেন?”
“বাজান! হে যা দিছে তাই রাখছি। যদি কাটনের কতা ঐত, তয় হে দিল ক্যান?”
“আর শুনতে পেলাম, তুমি সারিন্দা বাজিয়ে গান কর। মরাকাঠ, তাই দিয়ে বাদ্য বাজাও।”
“কি করব বাজান? দেহ-কাঠ এত বাজাইলাম, কথা কয় না। তাই মরা লয়া পড়ছি। এহনও কথা কয় নাই। তবে মদ্দি মদ্দি কথা কইবার চায়।”
“তোমার সারিন্দা আমরা ভেঙ্গে ফেলাব।”
“কাঠের সারিন্দা বাঙবেন বাজান? বুকের মদ্দি যে আর একটা সারিন্দা আছে সেডা ভাঙবেন কেমুন কইরা? হেডা যদি ভাঙতি পারতেন তয় ত বাচতাম। বুহির মদ্দি যহন সুর গুমুইরা গুমুইরা ওঠে তখন ঘুম হয় না। খাইতি পারি ন্যা। সেইডার কান্দনে থাকপার পারি না বইলা কাঠের সারিন্দা বানায়া কান্দাই। আমার কান্দনের সঙ্গে হেও কান্দে, তাই কিছুক শান্তি পাই।”
“দেখ ফকির! তোমার ওসব বুজুরকি কথা শুনতে চাইনে। আজ তুমি আমার কাছে তোবা পড়–আর গান গাইতে পারবে না।”
“বাজান! গান বন্দ করার কলা-কৌশল যদি আপনার জানা থাহে আমারে শিহায়া দ্যান। বুকের খাঁচার মদ্দি গান আটকায়া রাখপার চাই। খাঁচা খুইলা পাখি উইড়া যায়। মানষির মনে মনে গোরে। কন ত বাজান! এ আমি কেমন কইরা থামাই?”
“ও সব বাজে কথা আমরা শুনতে চাইনে।”
“বাজান! জনম কাটাইলাম এই বাজে কথা লয়া। আসল কথা ত কেউ আমারে কইল না। আপনারা যদি জানেন, আসল কথা আমারে শিহায়া দ্যান।”
“তোমার মত ভণ্ড কোথাও দেখা যায় না।” “আমিও তাই কই বাজান! আমার মত পাপী তোক আর আল্লার আলমে নাই। কিন্তুক এই লোকগুলান তা বুঝবার পারে না। ওরা আমারে টাইনা লয়া বেড়ায়।”
“শুনতে পেলাম, তোমার কতকগুলান শিষ্য জুটেছে। তারা তোমার হাত পা টিপে দেয়। মাথায় তেল মালিশ করে। জান এতে কত গুনা হয়? আল্লাহ কত বেজার হন?”
“কি করব বাজান? ওগো কত নিষেধ করি। ওরা হোনে না। ওরা আমার ভালবাসায় পড়ছে। প্রেম-নদীতে যে সঁতার দেয় তার কি ডোবার ভয় আছে? এর যে কূল নাই বাজান! ভাইবা দেখছি, এই দেহডা ত আমার না। একদিন কবরে রাইখা শূন্য ভরে উড়াল। দিতি অবি। তাই দেখলাম, আমার দেহডারে ওরা যদি পুতুল বানায়া খেইলা সুখ পায় তাতে আমি বাদী ঐব ক্যান?”
“আচ্ছা ফকির! তুমি হাতের পায়ের নখ কাট না কেন?”
“বাজান! একদিন মানুষ হাতের পায়ের নখ দিয়াই কাইজা-ফেসাদ করত। তাই নখ রাখতো। তারপর মনের নখের কাইজা আরম্ভ ঐল। কলমের নখের কাইজা আরম্ভ ঐল। তহন আতের পায়ের নখের আর দরকার ঐল না। তাই মানষি নখ কাইট্যা ফ্যালাইল। আমার যে বাজান বিদ্যা-বুদ্ধি নাই। তাই মনের নখ গজাইল না। হেই জন্যি আতের পায়ের নখ রাখছি। মনের নখ যদি থাকতো তয় ডিগ্রীজারীতে ডিগ্রী কইরা কত জমি-জমা করতি পারতাম। কত দালান-কোঠা গড়াইতাম। মনের নখ নাই বইলা দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষা কইরা খাই। গাছতলায় পাতার ঘরে বসত করি।”
এ পর্যন্ত আরজান ফকির যত কথা বলিল, তার মুখের মৃদু হাসিটি এতটুকুও মলিন হয় নাই। মাওলানা সাহেব যতই কুপিত হইয়া তাহাকে প্রশ্ন করিয়াছেন, সে ততই বিনিত ভাবে তাহার উত্তর করিয়াছে। সভাস্থ সমবেত লোকেরা অতি মনোযোগের সঙ্গে তাহার উত্তর শুনিয়াছে।
উকিল সাহেব দেখিলেন বক্তৃতা করিয়া ইতিপূর্বে তিনি সভার সকলের মনে যে ইসলামী জোশ আনয়ন করিয়াছিলেন, আরজান ফকিরের উত্তর শুনিয়া সমবেত লোকদের মন হইতে তাহার প্রভাব একেবারেই মুছিয়া গিয়াছে। সভার সকল লোকই এখন যেন আরজান ফকিরের প্রতি সহানুভূতিশীল। তাহারা যখন অতি মনোযোগের সঙ্গে আরজান ফকিরের কথাগুলি শুনিতেছিল উকিল সাহেবের মনে হইতেছিল, তাহারা মনে মনে তাহাকে সমর্থন করিতেছে। তিনি ঝানু ব্যক্তি। ভাবিলেন, এইভাবে যদি ফকিরকে কথা বলিবার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তাঁহার আহ্বান করা সভা ফকির সাহেবের সভায় পরিণত হইবে।
