পাক ভারতে মুসলিম রাজত্ব শেষ হইবার পর একদল মাওলানা এদেশ হইতে ইংরেজ তাড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন। সহায়-সম্পদহীন যুদ্ধ-বিদ্যায় অনভিজ্ঞ সেই মুসলিম দল শুধু মাত্র ধর্মের জোরে সে যুগের ইংরেজ-রাজের অত্যাধুনিক অস্ত্র-সজ্জার সামনে টিকিয়া দাঁড়াইতে পারিল না। খাঁচায় আবদ্ধ সিংহ যেমন লৌহ-প্রাচীর ভাঙ্গিতে না পারিয়া আপন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিঁড়িয়া খাইতে চাহে, সেইরূপ এই যোদ্ধার দল নানা সংগ্রামে পরাজিত হইয়া হৃত-সর্বস্ব হইয়া ক্ষোভে দুঃখে আপন সমাজ দেহে আক্রমণ চালাইতে লাগিল। স্বাধীন। থাকিতে যে মুসলিম সমাজ দেশের চিত্রকলায় ও সঙ্গীত-কলায় যুগান্তর আনয়ন। করিয়াছিল, আজ তাহারাই ঘোষণা করিলেন গান গাওয়া হারাম-বাদ্য বাজানো হারাম, মানুষ ও জীব-জন্তুর ছবি অঙ্কন করা হারাম।
ইংরেজ আমলে উচ্চশ্রেণীর মুসলমানেরা আর্থিক অবনতির ধাপে ধাপে ক্রমেই নামিয়া যাইতেছিলেন। আর্থিক সঙ্গতি না থাকিলে মানুষের মধ্যে সঙ্গীত-কলার প্রতি অনুরাগ। কমিয়া যায়। যাহাদের ঘরে দুঃখ তাহারা অপরের আনন্দে ঈর্ষাতুর হইয়া পড়ে। তাই দেখিতে পাই, তখনকার দিনের মুসলিম শিক্ষিত সমাজ এই পরিবর্জনের আন্দোলনে পুরোধা হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন।
ইংরেজের কঠোর শাসনে ধর্ম এখন আর জেহাদের জন্য, মানবতার সেবার জন্য লোকদিগকে আহ্বান করিতে পারে না। প্রথা-সর্বস্ব ধর্ম এখন মানুষের আনন্দমুখর জীবনের উপর নিষেধের পর নিষেধের বেড়াজাল বিস্তার করিতে লাগিল। মুসলমান রাজ ত্বকালে দেশের জনসাধারণের যে অবস্থা ছিল, ইংরেজ আমলে তাহার কোনই পরিবর্তন হইল না। বরঞ্চ ইংরেজের শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রিত শাসনে তাহারা বহিঃশত্রুর হাত হইতে কিছুটা রক্ষা পাইল। সেইজন্য দেখিতে পাই, সাহিত্য-কলা-শিল্পের ক্ষেত্রে দেশের মুসলিম সাহেব? মাওলানা সাহেবরা তাহাকে প্রায়ই পান আনিতে পাঠান-সিগারেট আনিতে পাঠান। ওজুর পানি দিতে বলেন। এইসব কাজ করিয়া কিছুতেই সে তাহার পাঠ্যপুস্তকে মন বসাইতে পারে না। স্কুলে যাইয়া মাষ্টারের বকুনি খায়। রোজকার পড়া রোজ তৈরী করিয়া যাইতে পারে না। ছুটিছাটার দিনে সে যে পড়া তৈরী করিবে তাহারও উপায় নাই। তাহাকে স্বেচ্ছাসেবকের ব্যাজ পরাইয়া উকিল সাহেব মাওলানাদের সঙ্গে লইয়া এ-গ্রামে ও-গ্রামে বক্তৃতা করিতে যান।
যদিও বছির একেবারেই ছেলে মানুষ তবু উকিল সাহেবের অন্দর মহলে তাহার যাইবার হুকুম নাই। একটি ছোট্ট মেয়ে-চাকরানী টিনের থালায় করিয়া সামান্য কিছু ভাত আর ডাল তাহার জন্য দুইবেলা রাখিয়া যায়। ইঁদারা হইতে পানি উঠাইয়া একটি নিকেলের গ্লাসে পানি লইয়া বছির সেই ভাত খায়। সেই অল্প পরিমাণ ভাতে তাহার পেট ভরে না। গ্লাস হইতে পানি লইয়া সে শূন্য পেট ভরায়। বিকালে স্কুল হইতে আসিয়া তাহার এমন ক্ষুধা লাগে যে ক্ষুধার জ্বালায় তখন নিজের গা চিবাইতে ইচ্ছা করে। রাত্রের আহার আশে সেই নয়টার সময়। তখন পর্যন্ত তাহাকে দারুণ ক্ষুদা লইয়া অপেক্ষা করিতে হয়।
উকিল সাহেব যখন মাওলানাদের সঙ্গে লইয়া বক্তৃতা করিতে এ-গ্রামে গ্রামে যান তখন গ্রামের লোকেরা ভালমত খাবারের বন্দোবস্ত করে। সেখানে যাইয়া বছির পেট ভরিয়া খাইতে পায়। উকিল সাহেবের বাসায় আধপেটা খাইয়া তাহার শরীরের যেটুকু ক্ষয় হয় গ্রাম দেশে দাওয়াত খাইয়া সে তাহার ক্ষতিপূরণ করিয়া লয়।
প্রত্যেক সভায়ই উকিল সাহেবের খাস মাওলানা শামসুদ্দীন সাহেব বক্তৃতা শেষ করিয়া সমবেত লোকদিগকে বলেন, “দেখুন ভাই সাহেবরা! এই গরীব ছেলেটিকে উকিল সাহেব দয়া করিয়া বাসায় রাখিয়া খাইতে দেন। আপনারা খেয়াল করিবেন, শহরে একটি ছেলেকে খাওয়াইতে উকিল সাহেবকে কত খরচ করিতে হয়। প্রতিমাসে যদি দশ টাকা করিয়াও ধরেন তবে বৎসরে একশত কড়ি টাকা। এই ছেলে আরও বার বৎসর শহরে থাকিয়া পড়িবে। হিসাব করিয়া দেখিবেন, এই বার বৎসরে উকিল সাহেবকে এক হাজার চার শত চল্লিশ টাকা খরচ করিতে হইবে। এত বড় মহৎপ্রাণ না হইলে,–সমাজ-দরদী না হইলে আপন ইচ্ছায় তিনি এত টাকা কেন খরচ করিবেন? এই টাকা দিয়া তিনি বিবির গহনা গড়াইতে পারিতেন–নিজের বাড়ি-ঘর পাকা করিতে পারিতেন। আজ যে কত কষ্ট করিয়া উকিল সাহেব পায়ে হাঁটিয়া এখানে আসিয়াছেন, ইচ্ছা করিলে তিনি এই টাকা দিয়া মোটর গাড়ি কিনিয়া ধূলি উড়াইয়া আপনাদের এখানে আসিয়া উপস্থিত হইতে পারিতেন! এই নাদান মুসলিম সমাজের জন্য তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করিলেন, ভাই সাহেবানরা! আসুন আমরা উকিল সাহেবের জন্য আল্লার দরবারে মোনাজাত করি।”
মোনাজাত শেষ হইলে মাওলানা সাহেব বলিতেন, “ভাইসব! এবার ডিষ্ট্রিক্ট বোর্ডের ভোটের দিন আপনারা উকিল সাহেবকে ভুলিবেন না। আর শহরে যাইয়া মামলা-মোকদ্দমা করিতে সকলের আগে আপনাদের জনদরদী-বন্ধু উকিল সাহেবকে মনে রাখিবেন।”
তখন উকিল সাহেব উঠিয়া বক্তৃতা আরম্ভ করেন, “ভাইসব! ইতিপূর্বে মাওলানা সাহেব সব কিছুই বলিয়া গিয়াছেন। আমি মাত্র একটি কথা বলিতে চাই। দুনিয়া যে গাইব হইয়া যাইবে সে বিষয়ে আমার একটু মাত্রও সন্দেহ নাই। আজ আমরা কি দেখিতেছি–মুসলমানের ঘরে জন্ম লইয়া বহু লোকে গান বাজনা করে, সারিন্দা-দোতারা বাজায়, মাথায় লম্বা চুল রাখে আর রাত ভরিয়া গান করে। উহাতে আল্লাহ কত বেজার হন তাহা আপনারা মাওলানা সাহেবের মুখে শুনিয়াছেন! আপনারা খেয়াল করিবেন, দেশে যে এত বালা মুছিবাত আসে, কলেরা, বসন্তে হাজার হাজার লোক মৃত্যুমুখে পতিত হয় তাহা এই গান বাজনার জন্য। ভাইসব! আপনাদের গ্রামে যদি এখনও কেহ গান বাজনা করে তাহাকে ধরিয়া আনিয়া এই ধর্মসভায় ন্যায় বিচার করেন।” এই বলিয়া উকিল সাহেব তাহার বক্তৃতা শেষ করেন।
