“ভাই সব! আপনারা আর মামলা-মোকদ্দমা করিবেন না। যদিই বা করেন, এই খাকসার আপনাদের খেদমত করিবার জন্য প্রস্তুত রহিল। আমাকে যাহা দিবেন তাহাতেই আমি আপনাদের মামলা করিয়া দিব।”
.
শিক্ষিত সমাজের তেমন কোন দান নাই, অপরপক্ষে দেশের অশিক্ষিত চাষী মুসলমান সমাজে লোক-সাহিত্য ও লোকশিল্পের দান দিনে দিনে শতদলে ফুটিয়া উঠিতেছিল। গত। উনবিংশ শতাব্দিতে হিন্দু শিক্ষিত সমাজ তার সাহিত্য-কলায় ইউরোপীয় ভাবধারা আহরণ । করিয়া যে সাহিত্য-সম্পদ সৃষ্টি করিলেন, মুসলিম চাষী সমাজের লোক-সাহিত্য ও লোক-কলার দান তাহার চাইতে কোন অংশে হীন নয়। বরঞ্চ দেশের মাটির সঙ্গে ইহার যোগ থাকায় স্বকীয়তায় ইহা শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করিতে পারে। দেশের আরবী, ফারসী শিক্ষিত সমাজ ইংরেজ যুগে অর্থহীন, সম্মানহীন ও জীবিকাহীন হইয়া দারিদ্রের চরমতম ধাপে নামিয়া গেল। আগেই বলিয়াছি, যাহাদের ঘরে সুখ নাই তাহারা পরের আনন্দে ঈর্ষাতুর। হইয়া পড়ে।
দেশের তথাকথিত মোল্লা সমাজ এই অপূর্ব পল্লী-সম্পদের শত্রু হইয়া পড়িলেন। এই মোল্লা সমাজের হাতে একদিন জেহাদের অস্ত্র ছিল। আদর্শবাদের জন্য লড়াই করিবার। প্রাণ-সম্পদ ছিল। তাহা ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হইল দোজখের ভয়াবহ বর্ণনায়, কঠিন শাস্তির নিষ্ঠুর পরিকল্পনায়, আর নিষেধের নানা বেড়াজাল রচনায়। দেশের জনসাধারণ। যদিও মাওলানাদের আড়ালে-আবডালে আনন্দ-উৎসবে মাতিয়া উঠিত, কিন্তু মাওলানাদের। বক্তৃতার সভায় আসিয়া তাহারা দোজখের ভীষণতর বর্ণনার কথা শুনিয়া ভয়ে কাঁপিয়া উঠিত। তাই অশিক্ষিত মুসলিম সমাজে এই মাওলানাদের প্রভাব ছিল অসামান্য।
রমিজদ্দীন সাহেব অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া এবার এই মাওলানা সাহেবদের তাঁহার। আঞ্জুমান-সমিতির মেম্বার করিয়া লইলেন। তাহাদিগকে সঙ্গে লইয়া তিনি গ্রামে বক্তৃতা করিতে লাগিলেন। শুধুমাত্র গান গাওয়া আর বাদ্য বাজানো হারাম নয়। হাদীসের সূক্ষ্মাতি সূক্ষ আয়াতের ব্যাখ্যা করিয়া তাহার দলের মাওলানা সাহেবরা আরও অনেক নিষেধের প্রাচীর রচনা করিতে লাগিলেন। মাওলানা সাহেবদেরই মত এবার হইতে উকিল সাহেবও গ্রামবাসীদের শ্রদ্ধার ও ভক্তির পাত্র হইয়া উঠিলেন। মাওলানাদের চেষ্টায় দু’একটি। মোকদ্দমাও তিনি পাইতে লাগিলেন। দিনে দিনে তাহার বৈঠকখানা হইতে ধূলি উড়িয়া। গেল। লোকজনে বৈঠকখানা গম গম করিতে লাগিল।
পিতার সঙ্গে আসিয়া বছির রমিজদ্দীন সাহেবের বাসায় স্থান পাইল। বৈঠকখানার এক কোণে একখানা চৌকীর উপর সে তাহার বই-পত্র সাজাইয়া লইল। কিন্তু পড়িবে কখন? সব সময় কাছারী ঘরে লোকজনের কোলাহল। কোন কোন রাত্রে দূরদেশী কোন মক্কেল। আসিয়া তাহার বিছানার অংশী হয়। বছির একেবারেই পড়াশুনা করিতে পারে না। গ্রামদেশে থাকিয়া তাহার অভ্যাস। কিন্তু শহরের এই কোলাহলে রাত্রে তাহার ঘুম আসে না। জাগিয়া থাকিয়া বই পড়িবারও উপায় নাই; কারণ রাত্রে হারিকেন লণ্ঠনটি উকিল সাহেব অন্দর মহলে লইয়া যান।
বিছানায় শুইয়া বছির মায়ের কথা মনে করে পিতার কথা মনে করে। তাহাদের বাড়ির বড় আমগাছটির কথা মনে করে। সেই আমগাছের তলায় ছোট বোন বড়কে লইয়া তাহারা খেলা করিত। সেই বড় আর তাহাদের সঙ্গে খেলিবে না। বড়ুর কবরে বসিয়া বছির প্রতিজ্ঞা করিয়াছিল, লেখাপড়া শিখিয়া সে বড় ডাক্তার হইবে। কিন্তু পড়াশুনা না। করিলে কেমন করিয়া সে ডাক্তার হইবে! রোজ সকাল হইলে তাহাকে বাজার করিতে : যাইতে হয়। বাজার করিয়া আসিয়া দেখে তাহার চৌকিখানার উপর তিন চারজন লোক বসিয়া গল্প করিতেছে। তাহারই পাশে একটুখানিক জায়গা করিয়া লইয়া সে পড়িতে বসে। অমনি উকিল সাহেব এটা ওটা কাজের জন্য তাহাকে ডাকিয়া পাঠান। শুধু কি উকিল শুনিয়া শ্রোতারা সকলেই সায় দেয়। উকিল সাহেব এ-গ্রামে যান-ও-গ্রামে যান। সকলেরই এক কথা। এবার মামলা করিতে হইলে আপনাকেই আমরা উকিল দিব। কিন্তু মামলা করিতে আসিয়া তাহারা রমিজদ্দীন সাহেবকে উকিল নিযুক্ত করে না। ও-পাড়ায় সেনমশায়-দাসমশায়–মিত্তিরমশায়–ঘোষমশায় কত বড় বড় উকিল। তাহাদের বৈঠকখানায় মক্কেলে গম গম করে। রমিজদ্দীন সাহেবের বৈঠকখানায় রাশি রাশি ধূলি তাহার দীর্ঘ নিশ্বাসের প্রতীক হইয়া বাতাসে উড়িয়া বেড়ায়। তাহারই একপাশে বসিয়া বহুদিনের পুরাতন খবরের কাগজখানা সামনে লইয়া উকিল সাহেব বৃথাই মক্কেলের জন্য অপেক্ষা করিয়া বসিয়া থাকেন।
বিষয় সম্পত্তি হারাইয়া খুনী মোকদ্দমার আসামী হইয়া যাহারা মামলা করিতে শহরে আসে তাহারা উকিল নির্বাচন করিতে হিন্দু মুসলমান বাছে না। নিজেদের বিপদ হইতে উদ্ধার পাইবার জন্য তাহারা ভাল উকিলেরই সন্ধান করে। সব চাইতে ভাল উকিল হয়ত সব সময় তাহারা নির্বাচন করিতে পারে না। কিন্তু কোন উকিলের পশার ভাল তাহা তাহারা জানে। সেই পশার দেখিয়াই তাহারা উকিল নির্বাচন করে। ডাক্তার বা উকিল নির্বাচনে তাই সাম্প্রদায়িক বক্তৃতা কোন প্রভাব বিস্তার করিতে পারে না। যে লোক খুনী মোকদ্দমার আসামী, সে চায় এমন উকিল যে তাহাকে জেল হইতে ফাঁসী-কাষ্ঠ হইতে বাঁচাইতে পারিবে। সে তখন নিজের অর্থ-সামর্থ অনুসারে উপযুক্ত উকিল বাছিয়া লয়। যার ছেলে মৃত্যু শয্যায় সে ক্ষণেকের জন্যও চিন্তা করে না তাহার ডাক্তার হিন্দু না মুসলমান। গ্রামে গ্রামে বহু বক্তৃতা দিয়াও উকিল সাহেব তাই কিছুতেই তার পশার বাড়াইতে পারিলেন না। তখন তিনি মনে মনে আরও নতুন নতুন ফন্দি-ফিকির আওড়াইতে লাগিলেন।
