ফুলী জিজ্ঞাসা করে, “আচ্ছা বছির বাই! হুনছি শবেবরাতের রাইতে সগল মুদারা কবরে ফির্যা আসে। আগামী শবেবরাতের রাইতে বড় যদি এহানে আসে তবে হে এই বোরই গাছটার উপর সোনালতাগুলান দেখতি পাবি না?”
বছির অন্যমনস্ক হইয়া বলে, “হয়ত দেখতে পাবি।”
“আর আমি যে তার দেওয়া সোনালতাডা এই বোরই গাছে বাঁচায়া রাখছি তাও সে জানতে পারবি, না বছির বাই?”
বাড়ি হইতে আজাহের ডাকে, “ও বছির! ব্যালা বাইড়া গ্যাল, রইদ উঠলি খুব কষ্ট অবি। শীগগীর আয়, রওয়ানা দেই।”
মা আজ বারবার ছেলের মুখের দিকে চায়। ছেলেকে দেখিয়া তবু যেন সাধ মিটে না। মায়ের গলা জড়াইয়া ধরিয়া ছেলে আর ঘুমাইবে না। মায়ের বিছানার ওইখানটা আজ শূন্য হইয়া থাকিবে।
যাইবার সময় মা ছেলের মাথায় তেল মাখাইয়া দেয়। বাপ বলে, “তেল দিলে রইদে মাথা গরম অয়া যাব্যানে, কি যে কর।”
তেল দিবার অছিলায় মা ছেলের গায়ে-মুখে হাত বুলাইয়া দেয়। ছেলে বলে, “দাও মা! বাল কইরা মাইখা দাও।” মায়ের হাতের স্পর্শ আর কতদিন পাইবে না ছেলে।
চিড়া কুটিয়া মা গামছায় বাঁধিয়া রাখিয়াছে। মা বলে, “সঙ্গে নিয়া যা, সকালে সন্ধ্যায় নাস্তা করিস। আর এই দুই হ্যাঁন পাটি সাপটা পিঠা, নিবিরে? পথের মদ্দি খাইস।”
বাপ বলে, “বাজা-পুড়া অযাত্রা, সঙ্গে দিও না।”
কিন্তু ছেলে বলে, “তুমি দাও মা!” মাকে খুশী করিবার জন্য সে যেন আজ যা কিছু করিতে পারে! ছেলেকে সঙ্গে করিয়া আজাহের রওয়ানা হয়। মা পথের দিকে চাহিয়া থাকে। যাইতে যাইতে ছেলে বারবার পিছন ফিরিয়া চায়। মাকে যেন সে জন্মের মত ফেলিয়া যাইতেছে। কিন্তু তাকে যাইতেই হইবে। তাজমহল গরিবার পাথর সংগ্রহ করিয়া। আনিতে হইবে–দেশ-বিদেশের বিদ্যা লুণ্ঠন করিয়া আনিতে হইবে।
মুরালদার পথের উপর গণশা দাঁড়াইয়া আছে। “এই যে গণশা বাই! তুমি এহানে কি কর?” বছির জিজ্ঞাসা করে।
গণশা উত্তর দেয়, “তুই আজ চইল্যা যাবি। হেই জন্যি পথের মদ্দি খাড়ায়া আছি। তোরে দুইডা কতা কয়া যাই।” গণশা এখনো পাঠশালায় সেই একই ক্লাশে পড়িতেছে।
বছির বলে, “গণশা বাই! তোমার জন্যিই আমি বাল মত পড়া শুনা করতি পারলাম। তুমিই আমার পরথম গুরু। তুমি যদি ওমন যত্তন কইরা আমারে ক,
খ-র বই পড়ায়া না দিতা তয় আমি পাশ করবার পারতাম না। আচ্ছা গণশা বাই! ইচ্ছা করলি তুমিও ত বালমত পড়াশুনা করতি পার?”
গণশা বলে, “ও কতা আর কত কবি? পড়াশুনা আমার অবি ন্যা। বই দেখলিই আমার মাষ্টার মশার ব্যাতের কতা মনে অয়।”
এ কথার আর বছির কি জবাব দিবে? ছোট্ট ছেলেমানুষ বছির। এখনো জানে না, জোর করিয়া মারিয়া ধরিয়া পড়াইতে যাইয়া গণশার শিক্ষক পড়াশুনাটাকে তার কাছে এমন ভয়াবহ করিয়া তুলিয়াছে।
বাপ আগাইয়া যায়। গণশা বছিরের আরও কাছে আসিয়া বলে, “দেখ বছির! তুই ত শহরে চললি, দেহিস সেহানে কেউ এমন কোন মন্তর যদি জানে যা পড়লি মাষ্টারের ব্যাতের বাড়ি পিঠে লাগে না, আমারে খবর দিস। আমি যায়া শিখ্যা আসপ।”
“য়্যা গণশা-বাই! তোমারে মাষ্টার মশায় আইজ আবার মারছে নাকি?” বলিয়া বছির সমবেদনায় গণশার পিঠে হাত রাখে।
“নারে, সে জন্যি না। মাষ্টার মশার মাইর ত আমার গা-সওয়া হয়া গ্যাছে। উয়ার জন্যি আমি ডরাই না। পাঠশালার আর সগল ছাত্রগো মাষ্টার মশায় মারে, ওগো কান্দন আমি সইবার পারি ন্যা। তেমুন একটা মন্তর জানতি পারলি আমি ওগো শিখাইয়া দিতাম, ওগো গায়ে মাষ্টারের ব্যাতের বাড়ি লাগত না। এমন মন্তর জানা লোক পাইলি তুই আমারে খবর দিস?”
বছির বলে, “আইচ্ছা।”
গণশা আগ্রহে বছিরের আরো কাছে আসে, “আর হোন বছির! তুই ত লেহাপড়া শিহা। খুব বড় ডাক্তার অবি। যখন তোর অনেক টাহা অবি, আমাগো গিরামে আইসা এমুন একটা পাঠশালা বানাবি সেহানে মাষ্টাররা ছাওয়াল-পান গো মারবি ন্যা। তুই আমার গাও ছুঁইয়া : কিরা কাইটা এই কতাডা আমারে কয়া যা।”
বছির গণশার গা ছুঁইয়া প্রতিজ্ঞা করে। তার ভবিষ্যৎ জীবনের সাফল্যের উপর গণশার এমন বিশ্বাস দেখিয়া বছিরের বড় ভাল লাগে।
গণশা বলে, “তবে আমি যাই, বছির! এই কতা কইবার জন্যিই আমি এতদূর আইছিলাম।”
.
২৮.
ফরিদপুর আসিয়া বছির স্থান পাইল রমিজদ্দীন উকিলের বাসায়। লাকড়ি বেচিতে আসিয়া আজাহের রমিজদ্দীন সাহেবের সঙ্গে পরিচিত হয়। তাহাকে বলিয়া কহিয়া অনেক কাকুতি-মিনতি করিয়া ছেলে বছিরকে তাহার বাসায় রাখিবার অনুমতি পাইয়াছে।
রমিজদ্দীন সাহেব ফরিদপুরের নতুন উকিল। তাঁহার বাড়িতে মামলাকারী মক্কেল বড় আসে না। শূন্য বৈঠকখানায় বসিয়া তিনি মক্কেল ধরিবার নানা রকম ফন্দি-ফিকির মনে মনে আওড়ান। তখনকার দিনে মুসলমান বলিতে কয়েকজন জুতার দোকানদার (হিন্দুরা তখন জুতার ব্যবসা করিত না। কিন্তু জুতা পরিত) কলা কচুর বেপারী আর অফিস আদালতের জনকতক পিওন-চাপরাসী ছাড়া ফরিদপুর শহরে আর কোন মুসলমানের বাস ছিল না। ইহাদিগকে লইয়া উকিল সাহেব একটি আঞ্জুমান-এ-ইসলাম প্রতিষ্ঠান গঠন করিলেন। এই সমিতির পক্ষ হইয়া তিনি মাঝে মাঝে শহরের নিকটবর্তী মুসলমান প্রধান গ্রামগুলিতে যাইয়া বক্তৃতা করিতেন। শহরের সব কিছুই হিন্দুদের অধিকারে। বড় বড় দোকানগুলি হিন্দুরা চালায়। অফিস আদালতের চাকরিগুলি সব হিন্দুরা করে। গরীব মুসলমান ভাইরা শুধু চাহিয়া চাহিয়া দেখে। শহরের উকিল মোক্তার সবই হিন্দু। হিন্দু হাকিম–হিন্দু ডেপুটি হিন্দু জজ। মুসলমানেরা জমা-জমি লইয়া মামলা মোকদ্দমা করে। ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ করিয়া শহরে যাইয়া বিচার চায়। নিজেদের কষ্টের উপার্জিত টাকা তাহারা শহরে যাইয়া হিন্দু উকিল মোক্তাদিগকে ঢালিয়া দিয়া আসে।
