গণশার সাহায্যে বর্ণগুলির নাম সে মুখস্থ করিয়া ফেলিয়াছে। কিন্তু হরফগুলিকে চিনিতে পারিতেছে না। ক, খ, গ, ঘ, ঙ। একটার সঙ্গে আর একটা ওলট-পালট হইয়া যায়। পাঠশালার খাড়া পাতাগুলির অক্ষরের সঙ্গে বই-এর অক্ষরগুলি মিলাইয়া দেখে। খাড়া পাতার উপর কলম লইয়া হাত ঘুরায়। ঘরের মেঝেয় কয়লা দিয়া অক্ষরগুলি লিখিতে চেষ্টা করে। হাত কাপিয়া যায়। তবু সে লেখে। কচি হাতের অক্ষর আঁকিয়া বাকিয়া যায়। লিখিয়া লিখিয়া সে ঘরের মেঝে ভরিয়া ফেলে। শেষ রাত্রে মা যখন কান্দিতে বসে সে তখন কেরোসিনের কুপীটি জ্বালাইয়া বই সামনে লইয়া বসে। মায়ের মত বাপের মত তার কান্নাকে সে বৃথা যাইতে দিবে না। গল্পে সে শুনিয়াছে, এই দেশের কোন বাদশার স্ত্রী মারা যায়। বাদশা তার জন্য শুধু বসিয়া বসিয়াই কাদিল না। বাদশাজাদীর কবরের উপর এক সুন্দর ইমারত গড়িতে মনস্থ করিল। দেশ-বিদেশ হইতে শিল্পীরা আসিল। নানা দেশের নানা রঙের পাথর আনিয়া জড় করা হইল। কত মণি-মুক্তা, লাল, ইয়াকুত-জবরুত কাটিয়া নক্সা করিয়া সেই সব রঙ-বেরঙের পাথরের উপর বসাইয়া আরম্ভ হইল সৃষ্টিকার্য। মাসের পর মাস বৎসরের পর বৎসর কাটিয়া গেল। একদিন দুনিয়ার লোকে বিস্ময়ে অবাক হইয়া দেখিল, মাটির ধূলার উপরে শুভ্র-সমুজ্জ্বল সে তাজমহল। তেমনি তাজমহল সে গড়িবে। তার বোনের মৃত্যুকে সে বৃথা যাইতে দিবে না! ওই মাটির তলে ওই কদম গাছটার নীচে তার বোন বড় কবরের আবরণ ভেদ করিয়া প্রতি মুহূর্তে যেন তাকে ডাকিয়া বলিতেছে, “মিঞা বাই! তোমার কাছেই আমি নালিশ রাখিয়া গেলাম। অমনি হাতুড়ে ডাক্তারের হাতে প্রতিদিন আমারই মত শত শত জীবন নষ্ট হইতেছে! আমার মরণে সেই নিষ্ঠুরতার যেন শেষ হয়।
বোনের কবর ভূঁইয়া সে প্রতিজ্ঞা করিয়াছে যেমন করিয়াই হোক সে ডাক্তার হইবে। সেই তাজমহলের নির্মাতার মতই নানা দেশ হইতে নানা লোকের বিদ্যা সে সংগ্রহ করিবে। নানা লোকের সাহায্য লইবে। তারপর তিলে তিলে পলে পলে গড়িয়া যাইবে জীবনের তাজমহল।
পাঠশালা হইতে এখন আর বছির সকাল সকাল ফেরে না। গণশাকে লইয়া সেই জঙ্গলের মধ্যে বসিয়া পড়াশুনা করে। বাড়ি আসিয়া সামান্য কিছু খাইয়া আবার বই লইয়া বসে। সকাল বেলা ফুলী আসে। “বছির বাই! চল, ওই জঙ্গলের মদ্দি একটা গাছে কি মাকাল ফল ঐছে! আমি পাড়বার পারি না। তুমি পাইড়া দিয়্যানে।”
কিন্তু মাকাল ফল পাড়িয়া আনিয়া এখন সে কাকে দেখাইবে? কে তাকে ডানা ধরিয়া টানিয়া লইয়া যাইবে সে জঙ্গলের ভিতর। আর কি বছিরের সেই জঙ্গলে গেলে মন টেকে? বনের যে প্রতিটি গাছের তলায়, প্রতিটি ঝোঁপের আড়ালে তার বোন বড়র চিহ্ন লাগিয়া আছে। এখানটিতে খেলাইছিলাম ভাড়কাটি সঙ্গে নিয়া, এখানটি রুধে দে ভাই ময়না কাঁটা পুইতা দিয়া। সে পথ যে চিরকালের জন্য বন্ধ হইয়া গিয়াছে। বছির প্রকাশ্যে বলে, “নারে ফুলী! আমি এহন যাইতি পারব না। আমার কত পড়বার আছে।”
ফুলী অভিমানে গাল ফুলাইয়া চলিয়া যায়। বছির ডাক দেয়, “ও ফুলী! হুইনা যা। যেদিন সোনালতা আনছিলাম বড়ুর জন্যি সেই দিনই তার ভেদবমি ঐল। আমারে ডাইকা কইল, আমি ত এ গুলান লয়া খেলতি পারব না। কাইল ফুলী আইলে তারে দিও। হে গুলান দিয়া যেন আতের বয়লা গড়ায়া আতে পরে, গলার হার বানায়া গলায় পরে। এ কয়দিনের গণ্ডগোলে ইয়া তোরে দিবার পারি নাই। লতাগুলান শুকাইয়া গ্যাছে।”
বছিরের হাত হইতে লতাগুলি লইতে লইতে ফুলী বলে, “বছির বাই! এই লতার গয়না গড়ায়া আমি কারে লয়া খেলব; কারে দেহাব?” বলিতে বলিতে দুইজনেই কান্দিয়া ফেলে।
দিনে দিনে হায়রে ভাল দিন চলিয়া যায়। উড়িয়া যায় হংস পক্ষী পড়িয়া রয় ছায়া। দেশের মানুষ দেশে যায়, পড়িয়া থাকে মায়া। বড় ঘর বান্ধ্যাছাও মোনাভাই বড় করছাও আশ, রজনী পরভাতের কালে পক্ষী ছাড়ে বাসা। দিনে দিনে হায়রে ভাল দিন চইলা যায়।
আমগাছ ভরসা করি কোকিল বানায় বাসা। নলের আগায় নলের ফুলটি তাহার পরে টিয়া, এমন সোনার বোনরে কে যে গেল নিয়া। দিনে দিনে হায়রে ভাল দিন চইলা যায়।
পাঠশালার পড়া শেষ করিয়া বছির ফরিদপুরে চলিয়াছে উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে। প্রাইমারী পরীক্ষায় বৃত্তি পাইয়াছে সে। ছেলেকে বিদায় দিতে আজ আবার নূতন করিয়া মায়ের মনে মেয়ের শোক জাগে। কিন্তু মা কান্দিতে পারে না। বিদায় কালে চোখের পানি ফেলিলে ছেলের অমঙ্গল হইবে।
সমস্ত বান্ধা-ছান্দা শেষ হইয়াছে। এখনি রওয়ানা দিতে হইবে। ফুলী আসিয়া বলে, “বছির বাই! একটু দেইখ্যা যাও।” বছিরের ডানা ধরিয়া ফুলী টানিয়াই লইয়া যায়। বড়র কবরের ওই পাশে একটা বননা কুলের গাছ। সেই গাছের উপর শোভা পাইতেছে গুচ্ছ গুচ্ছ সোনালতা।
বছির বিস্ময়ে বলে, “এহানে এমুন সোনালতা ঐছে তাতো এতদিন দেহি নাই?”
ফুলী বলে, “তুমি যে সোনালতা আমারে দিছিলা না বছির বাই! বড়ুরে ছাইড়া হেই লতার গয়না বানায়া পরবার আমার মনে হইল না। তাই লতাডারে মেইলা দিলাম এই বোরই গাছটার উপরে। রোজ উয়ার উপরে পানি ডাইলা ইয়ারে বাঁচায়া তুলছি। দেখছাও না কেমন জাটরায়া উটছে?”
বছির বোঝে, এও এক রকমের তাজমহল গড়িবার প্রয়াস। ফুলীর তাজমহল গডিয়া উঠিয়াছে, কিন্তু তার তাজমহল যে আরও কতদূরে–তার জীবনের তাজমহল। কতদিনে তার গড়ন শেষ হইবে?
