.
২৭.
তবুও আজাহেরকে আবার মাঠে যাইতে হয়। আবার মাঠে যাইয়া হাল বাহিতে হয়। মাঠের কাজে একদিন কামাই দিলে সামনের বছর না খাইয়া থাকিতে হইবে। বাইনের সময় বাইন করিতে হইবে। নিড়ানের সময় খেত নিড়াইয়া দিতে হইবে। একদিনও এদিক ওদিক। করিলে ফসল ভাল হইবে না। মাঠের কাজে অবহেলা চলে না।
বউকে আবার কেঁকিতে উঠিয়া ধান ভানিতে হয়। কিন্তু পা যে চলে না। কে তার ধান। আলাইয়া দিবে। কে ছোট্ট কলাটি লইয়া মায়ের সঙ্গে ধান ঝাড়িবার অনুকরণ করিবে? ধান পারাইতে পারাইতে কাড়াইল দিয়া খোঁচাইতে খোঁচাইয়া মা নোটের ধান নাড়িয়া দেয়। কিন্তু ইহাতে কাজ আগায় না। বছির তার পড়ার বই ফেলিয়া আসিয়া বলে, “মা! আমি তোমার বারা আলায়া দেই।”
মা বলে, “না বাজান! তুমি পড় গিয়া।” দিনে দিনে হায়রে ভাল দিন চইলা যায়। শুকনা ডালের পরে বইসা ডাকে কাগ। ভাজন বেটা মইরা গেলে মার কলিজায় দাগা। বছর শেষ হইয়া আম্ব গাছে আবার আম্ব ফল ধরে–জাম্বগাছ কালো করিয়া জাম্বফল পাকে কিন্তু পন্থের দিকে মা চায়া থাকে। তার বড় ত ফিরিয়া আসে না। নানা কাজের মধ্যে সারাদিন মা ডুবিয়া থাকে। কিন্তু রাত যে তাহার কাটে না। রাতের অন্ধকারের পরদায় মায়ের সকল কাহিনী কে যেন জীবন্ত করিয়া আঁকিয়া তুলে।
মা যেন স্বপন দেখে : “মেয়ের বিবাহ হইয়াছে। সাজিয়া-গুঁজিয়া ভিন দেশ হইতে বর আসিয়া মেয়েকে লইয়া গেল। ময়নার মায়ে কান্দন করে গাছের পাতা ঝরে, আমি আগে যদি জানতামরে ময়না তোরে নিবে পরে, আমি নোটের বারা নোটে রাইখা তোরে লইতাম কোলে। কতদনি মেয়ে আসে না। মার জন্য তার যেন মন কেমন করিতেছে। গাঙে নতুন পানি আসিয়াছে। ওগো তুমি যাও–নৌকার উপর কঞ্চি বাঁকাইয়া তার উপর হোগলা বিছাইয়া ছই বানাও। আমার বড়ুরে লইয়া আইস। বড় আসপি! আইজ আমার বড় আসপি। কত পিঠা তৈরী করে মা! যে পিঠা মেয়ে পছন্দ করিত মনের মত করিয়া সেই পিঠা মা বানায়। নতুন করিয়া সিকা বুনায়। কাঁথার উপরে রঙিন সূতা ধরিয়া ধরিয়া নক্সা আঁকে, আমার বড়ুরে বেবার দিব।”
দিন যেন শেষ হইতেছে! মায়ের আর ধৈর্য মানে না। সন্ধ্যাবেলায় পানি আনিবার অজুহাতে গাঙের ঘাটে যাইয়া মা মেয়ের জন্য অপেক্ষা করে। লাল নীল পাল উড়াইয়া কত নৌকা যায় কত নৌকা আসে। আমার বড়ুরে লইয়া ত আমাগো নাও আসিল না। ওই যে দেখা যায় হোগলা ঘেরা ছই। শাড়ী কাপড় দিয়া ছই-এর আগা পিছা ঢাকা। ওই আমার বড় আসত্যাছে। হয়ত ছই-এর কাপড় উদলা করিয়া বাপ-ভাইর দ্যাশ দেখত্যাছে। এই ত নাও ঘাটে আসিয়া ভিড়িল। আমার বড় বাইর ঐল না কেন? মেয়ের বুঝি অভিমান ঐছে। মায় যায় তারে ড্যানা দইরা আনবি। তবে ত মেয়ে নামবি। মা তাড়াতাড়ি যাইয়া ছই-এর কাপড় খুলিয়া চীৎকার করিয়া ওঠে। একি আমার বড় যে কাফন পইরা শুইয়া আছে। ও বডুরে–আমার বড়ুরে! কোন দ্যাশে যায়া আমি এ বুক জুড়াব। মায়ের কান্দনে পাড়ার লোকেরা জাগিয়া ওঠে।
একে অপরকে বলে, ওই দুখিনী মা কানত্যাছে। ও-পাড়ার মহিমের মা উঠিয়া মহিমের কবরের উপর যাইয়া আছড়াইয়া পড়ে। পাড়ার জানকীর মা তার জানকীর জন্য শুশান-ঘাটে যাইয়া ডাক ছাড়িয়া কান্দিয়া ওঠে। রাইত তুই যারে যা পোষাইয়া। শোকের রাত তুই পোষাইয়া যা। রাত পোষাইয়া যা। শোকের রাত পোষায় না। সে যে কবে পোষাইবে তাহাও কেহ বলিতে পারে না।
.
বছিরও পাঠশালায় যায়। ছুটির পরে গণশা বলে, “ক্যানরে বছির! তোর মুকটা য়্যাত ব্যাজার কিসিরে?”
বছির বলে, “আমার একটা মাত্তর বইন ছিল। কাইল মারা গ্যাছে।”
গণশা কিছুই বলিবার ভাষা পায় না।
বছির বলে, “আমার বইন পানি পানি কইরা মরছে। হাতুইড়া ডাক্তার তারে পানি খাইবার দেয় নাই। সেই জন্য মরছে। দেখ গণশা! আমি পইড়া-শুইনা ডাক্তার অব–খুব বড় ডাক্তার অব।”
গণশা বলে, “হে তো অনেক পাশ দিতি অবি। আর খরচও অনেক। তুই কেমুন কইরা পারবি?”
বছির উত্তর করে, “যেমনি ওক, আমি ডাক্তার অবই, এহন ত্যা তুই আমারে পড়াবি। আমার কেলাসের যা পড়া তুই আমারে শিহায়া দিবি।”
গণশা বলে, “ধ্যেৎ! আমি কি মাষ্টারী করবরে। আমি নিজেই কিছু জানি না।”
বছির অনুরোধের সুরে বলে, “দেখ গণশা! তুই আমারে না বলিস না। আমার যা বই। তুই তা আমারে পড়াইত পারবি।”
দুই বন্ধুতে ঠিক হইল পাঠশালার ছুটির পর গহন জঙ্গলের মধ্যে গণশার সেই গোপন জায়গায় যাইয়া তাহারা লেখাপড়া করিবে।
বাড়িতে মা কান্দে, বাপ কান্দে। তারা শুধুই কান্দে আর কিছু করে না। বোনের জন্য বছিরও কান্দে কিন্তু সেই কান্দন বুকে করিয়া সে এমন কিছু করিবে যার জন্য তার হতভাগিনী বোনের মত হাতুড়ে ডাক্তারের কবলে আর কেউ অকালে জীবন দিবে না। সে ডাক্তার হইবে–সব চাইতে বড় ডাক্তার–যে ডাক্তার চীনা জেঁকের মত গরীব রোগীদের চুষিয়া খাইবে না–যে ডাক্তার হইবে গরীবের বন্ধু–আর্তের আত্মীয়, কিন্তু কেমুন করিয়া সে ডাক্তার হইবে। সামনে সীমাহীন সুদীর্ঘ পথ! কেমন করিয়া সেখানে যাইবে তা সে জানে না। তবু সে সেখানে যাইবে। বর্ণ পরিচয়ের বইখানা সামনে লইয়া বছির বসে। এই তার সাধনার স্থান। অক্ষরগুলির দিকে চাহিয়া চাহিয়া বলে, “তোমরা আমার সঙ্গে কথা কও–তোমরা আমার পরিচিত হও।”
