উঠানে দাঁড়াইয়া ডাক্তার গরীবুল্লাকে বলে, “মিঞা! আমার ভিজিটের টাকাটা দাও। রাত করে এসেছি। কুড়ি টাকা লাগবে।”
গরীবুল্লা বলে, “ডাক্তারসাব! আপনি ত ওষুধ দিলেন না? গরীবের টাহাটা ছাইড়া দেওয়া যায় না?”
ডাক্তার উত্তর করে, “সেই জন্যই ত বলেছিলাম, ভিজিটের টাকাটা আগে দাও। রাত করে এসেছি। বুঝতে পারলে ত মিঞা? রোগী মরেছে বলে কি আমার ভিজিটের টাকাটাও মরেছে নাকি?”
গরীবুল্লা বলে, “আর কইতি অবি না ডাক্তারসাব। সবই আমাগো বরাত। যোমেই যহন ছাড়ল না, তয় আপনি ছাড়বেন ক্যান?”
আজাহের ধূলা হইতে উঠিয়া বলে, “মোড়ল বাই! আমার আতালের গরুডারে নিয়া যান। ওইডা বেইচা ডাক্তাররে দ্যান। আমার মার দেনা আমি রাহুম না।”
গরীবুল্লা বলে, “আরে থাম মিঞা! আসেন ডাক্তারসাব! আমার বাড়ির ত্যা আপনার টাহা দিয়া দিবানি!” ডাক্তার চলিয়া যায়।
রাত তুই যারে যা পোষাইয়া। রাইত পোষাইয়া যায় কিন্তু শোকের রজনী শেষ হয় না। মৎস্যে গহীন গম্ভীর চেনে, পক্ষি চেনে ডাল, মায় জানে বেটার দরদ যার কলিজায় শেল। রাত প্রভাত হইলে মা কার বাড়িতে যাইবে, ওমন মধুর মা বোল বলিয়া কে তাকে ডাকিবে, মা কারে কোলে লইয়া জুড়াইবে। রাইত তুই যারে পোষাইয়া।
কাউকে ডাক দিতে হইল না। মায়ের কান্না, বাপের কান্না, ভাইয়ের কান্না বাতাসে ঘুরিয়া আল্লার আরশে উঠে। সেই কান্না ডাক দিয়া আনে গ্রামের সকল লোককে। আনন্দ ওদের জীবনে নাই। শুধু অভাব আর দুঃখ। তাই দুঃখের ডাক ওরা অবহেলা করে না। অপরের কান্দনে নিজের কান্দন মিশাইয়া দিতে সুখ পায়। ওদের সব চাইতে মধুর গান তা-ই সব চাইতে দুঃখের গান।
বাড়ির পালানে কদম গাছটির তলায় বড় যেখানে সঙ্গী-সাথীদের লইয়া খেলিত সেইখানে কবর খোঁড়া হইল।
তাম্বুলখানার হাট হইতে আতর লইয়া আস–লোবান লইয়া আস। জলদি কইরা যায় মোল্লারে খবর দাও। কাফন কেনার টাকা কোথায় পাব। কারিকর দাদা যে শাড়ীখানা দিয়া গেছে তাই চিরিয়া কাফন করিয়া দাও। গরীবের মেয়ে আল্লা সবই জানেন। সাত তবক আসমানের উপর বসিয়া এই দুস্কের কাহিনী দেখিতেছেন।
কে মেয়েকে গোছল দিবে? মোড়লের বউ। অমনি পাঁচটি মেয়েকে গোছল দিয়া যে গোরের কাফন সাজাইয়া দিয়াছে তারেই ডাক দাও। মেয়ের গায়ের বন্নক এখনো কাঁচা হলুদের মত ডুগ ডুগ করে। গায়ে পানি ঢালিতে পানি পিছলায়া পড়ে। মুখখানা যেন। হাসী-খুশীতে ভরা। রোগের যন্ত্রণা নাই, পানির পিয়াসা নাই! তাই মরিয়া ও আরও সুন্দর হইয়াছে। এমনই বুঝি সুন্দর হয় যারা না খায়া মরে, যারা দুঃখের তাড়নায় মরে। মরিয়া তাহারা শান্তি পায়।
গোছল হইল, কাফন পরানো হইল, মাথায় শাড়ী দিয়া তৈরী রঙিন টুপি, গায়ে রঙিন। শাড়ী! আতর লাগাইয়া দাও–লোবান জ্বালাইয়া দাও। “বুবুলো বুবু! তোমরা চায়া চায়া দেহ নায়া-ধুইয়া আমার বড়ু শ্বশুর বাড়ি যাইত্যাছে!” গাঁয়ের মোল্লার কণ্ঠে কোরানের সুর কান্দিয়া কান্দিয়া ওঠে।
সকলে ধরাধরি করিয়া মেয়েকে বাঁশের মাচার উপরে শোয়াইয়া দেয়। তারপর সেই মাচার চার কোণার চার উঁটি ধরিয়া লইয়া যায় কবরের পাশে। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ। কবরের পাশে আনিয়া লাশ নামায়। লোবানের সরায় ঘুরিয়া ঘুরিয়া লোবানের ধূয়া ওড়ে। কাফনের কাপড় দোলাইয়া বাতাস আতরের গন্ধ ছড়ায়। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ–লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ।
সকলে কাতারবন্দী হও–জানাজা পড়া আরম্ভ হইবে। আল্লা এই বেহেস্তের শিশুকে তুমি দুনিয়ায় পাঠাইয়াছিলা, আবার তুমি তাহাকে তোমার কাছে লইয়া গেলা। তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হোক। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ্।
আল্লা-হুঁম্মাজ আ’হা লানা ফারাতাও ওয়াজ আ’লহা লানা আজরাওঁ ওয়াযুখরাওঁ .. ওয়াজ আল্হা লানা শাফেয়া’তাও ওয়া মুশাফফায়াহ!
আল্লাহ! এর যদি কোন গুনাখাতা হইয়া থাকে তবে তারে তুমি মাফ কইর। লা-ইলাহা। ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ। পড় মিঞারা রসুলের কলেমা পড়। ভাল করিয়া ধর। গোরের ভিতরে লাশ নামাইয়া দাও। প্রথমে কে দিবে মাটি? আজাহের কই? হাতের। একমুঠি মাটি লইয়া কবরে ফেলিয়া দাও।
“মিঞারা! তোমরাও আমারে এই কবরের মধ্যে মাটি দিয়া থুইয়া যাও। আমার সোনার বডুরে এহানে থুইয়া শূন্য গরে আমি কেমুন কইরা যাব?” বছির কই, বোনের কবরে একমুঠি মাটি দাও–তারপর গরীবুল্লা মাতবর, তারপর মোকিম। একে একে সকলেই আসে। এবার ভাল মত মাটি চাপা দাও। উপরে সরষে বীজ নিয়া দাও। রাতে শেয়ালে যাহাতে খুঁড়িয়া মুর্দা না বাহির করে।
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ। ভেস্তের ধরিয়া পায়া কান্দে ফাতেমায়, বেটার দারুণ লোগ হায়রে সহন না যায়। শূন্য পৃষ্ঠে দুলদুল ফিরিয়া আসিল, সাহের বানুর পুত্র শোগে আসমান ভাঙিল। আয়রে নিমাই আয়রে। কোলে, একবার বুক জুড়া বাছা মা বোল বলিয়ে। কান্দে শচীমাতা ধূলায় গড়াগড়ি দিয়া। রসুলের মদিনা ভাইঙ্গা যায়। ফতেমার কান্দনে ভাসে সোনার বৃন্দাবন।
