ঘরের চালে প্রভাত কালের শুয়া পাখি ডাকিয়া গেল। চারিদিকে ঘোর কুষ্টি অন্ধকার। বনের পথে আজ জোনাকি কেন? এ যেন দুনিয়ার সকল জোনাকি সাজিয়া আসিয়াছে। রহিয়া রহিয়া ভুতুম ডাকিয়া ওঠে। দুনিয়ায় যত ঝিঁঝিপোকা আজ একসঙ্গে কাঁদিতেছে। মায়ের বুক যেন তারা কাটিয়া চৌচির করিয়া দিয়া যায়। রাত তুই ভোর হইয়া যা। কুব কুব কুব। কি একটা পাখি রহিয়া রহিয়া ডাকে। এ পাখি ত রোজই রাত্রে ডাকে। তবে আজ এই পাখির ডাকে মায়ের পরাণ এমন করে কেন? রাত তুই পোহাইয়া যা। মেয়ের হাতে পায়ে হাত দিয়া মা দেখে। হাত যেন টাল টাল মনে হইতেছে। পা ও যেন টাল টাল।
স্বামীকে বলে, “উনি একটু দেখুক ত, ম্যায়ার যেন আত পাও ঠাণ্ডা লাগত্যাছে।”
বসিয়া বসিয়া আজাহের ঝিমাইতেছিল। ধড়মড় করিয়া উঠিয়া মেয়ের পায়ে হাত দেয়, হাতে হাত রাখে। তাই ত মেয়ের হাত পা যে ঠাণ্ডা হিমের মত। নাকে হাত দিয়া দেখে, এখনও নিশ্বাস বহিতেছে।
“তুমি যাও আগুন কইর্যা আন! উয়ার আতে পায় স্যাক দিতি অবি।” তবে কি মা যা ভাবিয়াছিল তাই?
“সোনার বড়রে! একবার আখি মেইলা চাও।” মা চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া ওঠে। বাপ আগুন করিয়া লইয়া আসে। মায়ের কান্না থামে না। মা জানে এমনি হাত পা ঠাণ্ডা হইয়া তার দাদী মরিয়াছিল।
আজাহের বলে, “এ্যাহন না কাইন্দা উয়ার আত পায় স্যাক দ্যাও।”
কি দিয়া স্যাক দিবে? গরীবের ঘরে কি ন্যাকড়া আছে? রহিমদ্দী যে লাল শাড়ীখানা কাল মেয়েকে দিয়া গিয়াছিল, তাই আগুনের উপর গরম করিয়া মা আর বাপ দুইজনে মেয়ের হাতে পায়ে সেঁক দেয়। আল্লা রসুল, তুমি রহম কররহমানের রহীম! তুমি দয়া কর।
মায়ের কান্দনে সমস্ত পাড়া জাগিয়া ওঠে। গরীবুল্লা মাতবর উঠানে আসিয়া জিজ্ঞাসা করে, “বড়ু এহন কেমন আছে?”
আজাহের আসিয়া মাতবরের পা জড়াইয়া ধরিয়া কান্দিয়া ফেলে, “তারিণী ডাক্তারের ওষুধ খাওয়ায়া ম্যায়াডারে মাইর্যা ফ্যালাইলাম, বৈকাল ব্যালা যায়া কইলাম, ‘ডাক্তার বাবু, ম্যায়া যে পানি পানি কইর্যা কেবলি কান্দে। তার কান্দন যে সওয়া যায় না। ডাক্তার
তহন একটা ওষুধ দিল আর কইল এই ওষুধ খাওয়াইলি ম্যায়া গুমায়া পড়বি। আর পানি। পানি কইরা কানবি না। হেই ওষইদ আইনা খাওয়াইলাম। এহন ম্যায়া নড়েও না, কতাও কয় না। আত পা ঠাণ্ডা অয়া গ্যাছে। হায় হায়রে! আমার সোনার বডুরে আমি নিজ আতে মারলাম।”
আজাহের কান্দে আর উঠানে মাথা কোটে। মোড়ল ঘরে ঢুকিয়া বড়র গায়ে মুখে হাত দিল। এখনও রোগী তিরতির করিয়া দম লইতেছে। বাহিরে আসিয়া মোড়ল বলিল “আজাহের! তুমি উয়ার কাছে বইস। আমি কাজী ডাক্তাররে লয়া আসি।”
আজাহের কয়, “তারে যে আনবেন, টাহা দিবানি ক্যামন কইরা?”
মোড়ল উত্তর করে, “আরে মিঞা হে কতায় তোমার কাম কি? তোমার বাবির গায়ে ত কয়খান জেওর আছে।” এই বলিয়া মোড়ল বাহির হইয়া গেল।
মা আর বাপ দুইজনে বসিয়া মেয়েকে সেঁক দেয় কিন্তু ঠাণ্ডা হাত আগুনের সেঁকে গরম হয় না। কান্দিয়া কান্দিয়া ডাকে, “সোনার বড়রে! একবার মুখ তুইল্যা চা। যত পানি তুই চাস তোরে দিবানি।” ঝিনুকে করিয়া মা মেয়ের মুখে পানি দেয় কিন্তু কার পানি কে খায়! দুই ঠোঁট বহিয়া পানি গড়াইয়া পড়ে। ডানধারের তেঁতুল গাছে হুতুম আসিয়া ডাকে। একটা। কি পাখিকে যেন অপর একটি পাখি আসিয়া ধরিয়া লইয়া গেল। পাখিটির ডাকে আল্লার। দুনিয়া ফাটিয়া যায়। ওধারের পালানে আজ এত জোনাকি আসিয়াছে কোথা হইতে! এধার হইতে ঘুরিয়া তারা ওধারে যায়। ওধার হইতে ঘুরিয়া এধারে আসে। ঝি ঝি পোকার ডাকে নিশুতি রাতে নীরবতা কাটিয়া কাটিয়া গুঁড়ো হইয়া যায়। রাত তুই পোহাইয়া যা, দুঃখের রাত তুই শেষ হইয়া যা। মায়ের কান্না শুনিয়া বছির ঘুম হইতে জাগিয়া বোনের কাছে আসিয়া বসে।
গরীবুল্লা মাতবর কাজী ডাক্তারকে লইয়া আসে। ডাক্তারের আগমন মায়ের মনে। আবার আশার সঞ্চার হয়। ডাক্তার রোগী দেখিয়া গম্ভীর হইয়া উঠানে যাইয়া ভিজিটের টাকার জন্য অপেক্ষা করে। আজাহের আনুপূর্বিক সকল ঘটনা ডাক্তারকে বলে। ডাক্তার উত্তর করে, “মিঞা! পয়সা খরচ করে ডাক্তারী শিখেছি। ওই তারিণী ডাক্তার ছিল ফরিদপুরের বুড়ো শ্রীধর ডাক্তারের কম্পাউণ্ডার। তখনকার দিনে ডাক্তারদের ভুল ধারণা ছিল কলেরার রোগীকে পানি খাওয়ালে রোগীর খারাপ হয়। তাই তখনকার ডাক্তাররা। রোগীকে পানি দিত না। কিন্তু এখনকার ডাক্তারেরা গবেষণা করে বের করেছে, কলেরার। রোগীকে পানি দিলে তার ভালই হয়। পানি না দিয়েই মেয়েটাকে মেরে ফেলল।”
আজাহের বলে, “ডাক্তারসাব! কেমুন দেকলেন। আমার বড় বাল অবি ত?”
এমন সময় ঘরের মধ্য হইতে বউ চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া ওঠে, “আমার বড়র যে। নিশ্বাস বন্দ হয়া গ্যাছে।”
আজাহের ডাক্তারের পা জড়াইয়া ধরে, “ডাক্তারসাব। আর একটু দ্যাহেন।”
ডাক্তার বলে, “আর দেখে কি করব। সব শেষ।”
“ওরে বডুরে আমার!”–কাঁদিয়া আজাহের গড়াগড়ি যায়। কাঁদিয়া বউ আকাশ-পাতাল ফাটায়। “আমার বড়! ওরে আমার বড়! একবার শুধু সোনা মুহি মা বোল বইলা ডাক। আরে আমি কোথায় যায়া জুড়াবরে–আরে আমি কোথায় যায়া মার দেহা পাবরে।”
