আজাহের কাঁদিয়া বলে, “ম্যায়ার পানি পানি কান্দা যে সইবার পারিনা ডাক্তার বাবু।”
ডাক্তার কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া বলে, “হা! হা! মনে পড়েছে–একটা ঔষধের কথা মনে পড়েছে। এই ঔষধটা নিয়ে যাও। খুব দামী ঔষধ। কেবল তোমাকে বলে দিলাম। এই ঔষধ খাওয়ালে মেয়ে ঘুমিয়ে যাবে। আর পানি পানি করে কাঁদবে না। মনে থাকে যেন আজ বিকেলে মুড়ীর ধান দিয়ে যাবে।”
আজাহের ঔষধ লইয়া বাড়ি ফিরিল। মেয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস লইতেছে আর দমে দমে জপনা করিতেছে, ‘পানি–পানি–পানি। আমারে পানি দাও।”
আজাহের মেয়ের কাছে আসিয়া ডাকিল, “মা!”
মেয়ে জবাব দিল না কেবলই দমে দমে বলিতেছে, “পানি–পানি–পানি।” বাপ যে পানি দেয় নাই, সেইজন্য বাপের উপর মেয়ের অভিমান।
বছির বোনের কানের কাছে মুখ লইয়া বলে, “বড়ু এই যে বাজান আইছে। তোরে ডাকতাছে।”
চোখ মেলিয়া বড় বলে, “ও বাজান! পানি দাও।”
আজাহের বলে, “মারে! এই ঔষুধটুকু খায়া ফালাও। তোমার গোম আসপ্যানে।” মেয়ে ঘাড় নাড়িয়া উত্তর করে, “না বাজান! আমারে গোম পাড়াইও না। গুমাইলে আমি মইরা যাব।”
আজাহের বলে, “আমার নক্কি! আমার সুনা! ওষুধটুকু খায়া ফালাও।” মেয়ে কাঁদিয়া বলে, “না বাজান! আমারে ওষইধ দিও না–আমারে পানি দাও।” বাপ জোর করিয়া মেয়ের মুখের মধ্যে ঔষধটুকু ঢালিয়া দেয়।
মেয়ে চীৎকার করিয়া উঠে। “হায় হায়রে আমারে কি খাওয়াইলরে!”
মেয়ের চীৎকারে বাপের বুক দুরু দুরু করিয়া কাপিয়া উঠিল। মেয়ে খানিকক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। তারপর কি মনে করিয়া চোখ মেলিয়া এদিক ওদিক চাহিল। মা মেয়ের গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলে, “বড়ু! আমার বড়ু!”
মেয়ে কয়, “মা! তুমি ঘরের কেয়াড়ডা খুইলা দেও ত। ওই যে আসমান না? ওই আসমানের উপর আল্লা বইসা আছে। কে জানি আমারে কইল, তোরে ওইহানে নিয়া যাব।” মেয়ে মায়ের মুখখানা আরও কাছে টানিয়া লইয়া বলে, “মারে! আমি যদি সত্যি সত্যিই মইরা যাই, তুই আমারে ছাইড়া কেমুন কইরা থাকপি?”
মা বলে, “বালাই! বালাই! তুমি বালা অয়া যাবা। এই ওষইদে তুমি সাইরা যাবা।”
মেয়ে কয়, “আচ্ছা মা! আমাগো কারিকর দাদা আর আসপি না আমাগো বাড়ি?”
“কেন আসপি ন্যা? দুই এক মাস পরেই আসপি।”
“মা! আরও তুই কাছে আয়। কানে কানে হোন। আমি যদি মরি, তয় পানির পিয়াসেই আমি মরব। মা! মিঞা বাইরে ডাক দাও ত?”
বছির বোনের কাছে আগাইয়া আসে। “মিঞা বাই! আমি যদি মইরা যাই, মার বড় কষ্ট অবি। মার চুলায় জাল দেওয়ার কেওই থাকপি ন্যা। মা উডুম বাজার সময় খোলা দরবার কাউরে পাবি না। এই হগল কাম তুমি আমার অয়া মার জন্যি কইর।”
মা বলে, “ষাট ষাট! এ সব কতা তুই কেন কস বড়? এ যে আমি সইবার পারি না।”
মায়ের মুখের কাছে মুখ লইয়া মেয়ে বলে, “মা! চুরি কইরা একটু পানি তুমি আমার মুখে দাও।”
মা আজাহেরের মুখের দিকে চায়। আজাহেরের মুখ কঠিন পাষাণ। মন্ত্রের মত সে বারবার করিয়া আওড়াইতেছে, ডাক্তার বলিয়াছে, বিজ্ঞলোকে বলিয়াছে। পানি দিলে মেয়ে বাঁচিবে না। পানি না দিলে মেয়ে বাঁচিবে। বিজ্ঞলোকের কথা–বিদ্বান লোকের কথা। এ কোনদিন অনড় হইবার নয়।
মেয়ে গড়াইতে গড়াইতে পানির কলসীর কাছে যাইয়া হাত দিয়া কলস ধরে। “মা! এই কলসীর ত্যা পানি ডাইল্যা আমারে দাও।” বাপ সযত্নে মেয়েকে টানিয়া আনিয়া বিছানায় শোয়াইয়া দেয়। আস্তে আস্তে মেয়ের ছটফটানি থামিয়া আসিতে লাগিল। আজাহের ভাবে ঔষধে কাজ করিতেছে। এবার মেয়ে ভাল হইবে। বিদ্বান লোকের জয় হোক–জানা শুনা লোকের জয় হোক। খোদা! তুমি রহম কর। তুমি মুখ তুলিয়া চাও।
ধীরে ধীরে সমস্ত আকাশ কাল করিয়া রাত্র আসিল। মেয়ের এ-পাশে বসিয়া আজাহের, ও-পাশে বউ আর বছির। বড় আর নড়েও না, চড়েও না। আর পানি পানি করিয়াও কান্দে না। তবে কি আল্লা মুখ তুলিয়া চাহিলেন? রুগ্ন মেয়ের শিয়রে বসিয়া মা ভাবে, সুন্দলের মত হাত পা নাড়িয়া মেয়ে মায়ের সঙ্গে উঠান ঝাট দিতেছে। অন্ধকার করিয়া বৃষ্টি আসিতেছে। উঠানের ধান পাট এখনি ভিজিয়া যাইবে। মায়ের সঙ্গে মেয়েও নামিয়া গিয়াছে। উঠানের কাজে। মেয়ে ধামায় করিয়া ধান ভরিয়া দেয়। মা তাড়াতাড়ি লইয়া গিয়া ঘরের মেঝেয় ঢালিয়া দিয়া আসে। মায়ের মুড়ি ভাজা দেখিয়া মেয়ে তার ছোট হাঁড়ি লইয়া ইঁদুরের মাটি দিয়া মুড়ি ভাজার অনুকরণ করে। কতদিনের কথা, মনে হয় কালই যেন ঘটিয়াছে। আসমান ভরা মেঘ, রহিয়া রহিয়া বৃষ্টি নামিতেছে। মা ঘরের মেঝেয় কথা বিছাইয়া তাহার উপর নক্সা আঁকিতেছে। পাশে বসিয়া লাল নীল সূতো লইয়া মেয়ে তার পুতুলের জন্য ন্যাকড়ার উপর ফুল তুলিতেছে।
“মারে! এই ফুলডা যেমুন বাল ঐল না! তুমি একটু দেহায়া দ্যাও ত।”
মেয়ের হাত হইতে উঁচ সূতা লইয়া মা মেয়েরই হাসি খুশী মুখের অনুকরণে আরেকটি ফুল ন্যাকড়ার উপর বুনট করিয়া দেয়। খুশীতে মেয়ে ডুগু ডুগু হয়। ছবির পরে ছবি–আরও কত ছবি। ও-পাড়া হইতে লাল নটে শাক দুই মুঠে ভরিয়া মেয়ে বাড়ি আসিতেছে। ও-বাড়ির মোড়লের বৌ ডাকিয়া বলিল, “ওমা! কার লাল নইটা ক্ষ্যাত ঐতে এই সুন্দর পরী উইঠ্যা আইল!” কিন্তু মেয়ে কতক্ষণ ঘুমায়? রাইত যেন কত ঐল? মেয়ের নাকের কাছে মা হাত লইয়া দেখে। না, বালাই! বালাই! এই যে মেয়ে নিশ্বাস লইতেছে।
